হঠাৎ বুকে চাপ অনুভব করছেন কিংবা পেটের ওপরের অংশে অস্বস্তি হচ্ছে? অনেকেই এমন পরিস্থিতিতে গ্যাস বা সাধারণ শারীরিক সমস্যা ভেবে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু এসব উপসর্গ কখনো কখনো হার্ট অ্যাটাকের প্রাথমিক সংকেত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হার্ট অ্যাটাকের সময় দ্রুত সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কারণ হৃদপিণ্ডে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে অল্প সময়ের মধ্যেই হৃদপেশির ক্ষতি শুরু হতে পারে।
হার্ট অ্যাটাক সবসময় তীব্র বুকব্যথা দিয়ে শুরু হয় না। অনেক ক্ষেত্রে হালকা অস্বস্তি, শ্বাসকষ্ট কিংবা অস্বাভাবিক ক্লান্তির মধ্য দিয়েও এর লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। ফলে অনেকেই সমস্যার গুরুত্ব বুঝতে দেরি করেন। অথচ এমন পরিস্থিতিতে প্রথম কয়েক মিনিটের সিদ্ধান্ত রোগীর জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা হলে সবচেয়ে আগে জরুরি চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। বাংলাদেশে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করে সহায়তা চাওয়া যায়। একই সঙ্গে আশপাশের কাউকে বিষয়টি জানানো উচিত। উপসর্গ নিজে থেকেই সেরে যাবে, এমন ধারণা নিয়ে অপেক্ষা করা বিপজ্জনক হতে পারে। রোগীকে নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা থেকেও বিরত থাকতে হবে।
উপসর্গ দেখা দেওয়ার প্রথম মিনিটেই সব ধরনের শারীরিক কাজ বন্ধ করা প্রয়োজন। হাঁটাহাঁটি, সিঁড়ি ওঠানামা কিংবা ভারী কোনো কাজ চালিয়ে যাওয়া উচিত নয়। বরং নিরাপদ স্থানে বসে বিশ্রাম নিতে হবে। জরুরি চিকিৎসাসেবা দ্রুত পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। অ্যাম্বুলেন্সে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী থাকলে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হতে পারে।
পরবর্তী দুই থেকে তিন মিনিটের মধ্যে রোগীকে যতটা সম্ভব শান্ত ও স্থির রাখার চেষ্টা করতে হবে। পিঠের পেছনে ভর দিয়ে আরামদায়ক অবস্থায় বসানো যেতে পারে। শরীরের আঁটসাঁট পোশাক ঢিলে করে দিলে স্বস্তি পাওয়া সম্ভব। বাড়িতে একা থাকলে জরুরি সহায়তার জন্য ফোন করার পর দরজা খুলে রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যাতে চিকিৎসাকর্মীরা সহজে প্রবেশ করতে পারেন।
এ সময় উপসর্গ ঠিক কখন শুরু হয়েছে, সেটিও মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট কিংবা অন্য অস্বস্তির শুরুর সময় চিকিৎসককে জানাতে পারলে দ্রুত চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হয়।
হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কায় অ্যাসপিরিন ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি সবার জন্য নিরাপদ নয়। জরুরি চিকিৎসাসেবার কর্মী বা চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্ক রোগী অ্যাসপিরিন চিবিয়ে খেতে পারেন। কারও অ্যাসপিরিনে অ্যালার্জি থাকলে, সক্রিয় রক্তক্ষরণ থাকলে কিংবা চিকিৎসক আগে থেকেই ওষুধটি খেতে নিষেধ করে থাকলে তা গ্রহণ করা উচিত নয়। অ্যাসপিরিন খাওয়ার জন্য জরুরি সহায়তা চাইতে দেরি করাও ঠিক নয়।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা এবং ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের নির্দেশনায় হার্ট অ্যাটাকের সন্দেহ হলে উপযুক্ত রোগীর জন্য ৩০০ মিলিগ্রাম অ্যাসপিরিন চিবিয়ে খাওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে ২০২৫ সালের আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজি ও আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের নির্দেশিকায় তীব্র করোনারি সিনড্রোমের প্রাথমিক চিকিৎসায় ১৬২ থেকে ৩২৫ মিলিগ্রাম অ্যাসপিরিনের কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, এসব মাত্রা চিকিৎসা নির্দেশনার অংশ। নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ গ্রহণের পরিবর্তে জরুরি চিকিৎসাকর্মীর পরামর্শ অনুসরণ করাই নিরাপদ। ১৬ বছরের কম বয়সীদের চিকিৎসকের নির্দেশনা ছাড়া অ্যাসপিরিন দেওয়া উচিত নয়।
কোনো রোগীর জন্য আগে থেকেই নির্ধারিত হৃদ্রোগের ওষুধ থাকলে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী সেটি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে অন্য ব্যক্তির ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত ওষুধ কখনো গ্রহণ করা উচিত নয়। একইভাবে গ্যাসের ওষুধ, সাধারণ ব্যথানাশক কিংবা ঘরোয়া পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে চিকিৎসা নিতে দেরি করা বিপজ্জনক হতে পারে।
হার্ট অ্যাটাকের সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে বুকের মাঝখানে চাপ, ভারী অনুভূতি কিংবা চেপে ধরার মতো ব্যথা। এই ব্যথা হাত, কাঁধ, ঘাড়, চোয়াল অথবা পিঠ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। অনেক সময় এর সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা এবং অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দেয়। কারও কারও ক্ষেত্রে হঠাৎ তীব্র অস্বস্তি বা বিপদের আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।
তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে লক্ষণ একই রকম হয় না। বিশেষ করে নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের ক্ষেত্রে বুকের তীব্র ব্যথা ছাড়াও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। তাদের শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, পিঠ বা চোয়ালে ব্যথা এবং পেটের ওপরের অংশে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। এসব উপসর্গ অনেক সময় গ্যাস বা বদহজমের সমস্যা বলে মনে হয়। ফলে চিকিৎসা নিতে দেরি হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
চিকিৎসা গ্রহণে বিলম্বের বিষয়টি উঠে এসেছে ২০২১ সালে ‘জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক রিসার্চ’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায়। ভারতের দিল্লির একটি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া গুরুতর ধরনের হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত ১৪৭ জন রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয় ওই গবেষণায়। সেখানে দেখা যায়, বুকে ব্যথা শুরুর পর হাসপাতালে পৌঁছাতে রোগীদের গড়ে ৪ দশমিক ৭ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। মাত্র ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ রোগী চার ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। আর অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করেছিলেন মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশ রোগী।
হার্ট অ্যাটাকের সময় কেউ হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হতে পারে। বিশেষ করে ব্যক্তি কোনো সাড়া না দিলে এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নিলে সেটি হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্রম হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে। এমন অবস্থায় দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবায় যোগাযোগ করে বুকের ওপর চাপ দিয়ে হৃদ্যন্ত্র পুনরুজ্জীবনের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।
প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ক্ষেত্রে বুকের মাঝখানে প্রতি মিনিটে প্রায় ১০০ থেকে ১২০ বার শক্তভাবে চাপ দিতে হয়। কাছাকাছি স্বয়ংক্রিয় বৈদ্যুতিক হৃদ্স্পন্দন পুনরুদ্ধারকারী যন্ত্র থাকলে সেটি ব্যবহার করা যেতে পারে। যন্ত্রটির নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে এবং জরুরি চিকিৎসাকর্মীরা দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত প্রয়োজন অনুযায়ী বুকের ওপর চাপ দেওয়ার প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে।
এ ধরনের জরুরি পরিস্থিতিতে কিছু প্রচলিত ভুল এড়িয়ে চলাও জরুরি। বুকের ব্যথা নিজে থেকেই কমে যাবে ভেবে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা, নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়া কিংবা ঘুমিয়ে সমস্যা কাটানোর চেষ্টা করা উচিত নয়। একইভাবে গরম পানীয়, মালিশ বা কাশি দিয়ে হার্ট অ্যাটাক সারানোর প্রচলিত ধারণার কোনো নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাগত ভিত্তি নেই। এসবের ওপর নির্ভর করলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে দেরি হতে পারে।
হার্ট অ্যাটাকের সময় হৃদপিণ্ডের কোনো অংশে রক্ত সরবরাহ কমে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে অক্সিজেনের অভাবে হৃদপেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর সাধারণত হৃদ্যন্ত্রের বৈদ্যুতিক কার্যক্রম পরীক্ষা এবং রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ, রক্তনালির বাধা দূর করার চিকিৎসা কিংবা রক্তনালিতে বিশেষ জালিকাযুক্ত নল বসানোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গেলে হৃদপেশির ক্ষতি কমানো এবং প্রাণহানির ঝুঁকি হ্রাস করা সম্ভব। তাই হঠাৎ বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট কিংবা হার্ট অ্যাটাকের অন্য কোনো সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে জরুরি চিকিৎসাসেবা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
মনে রাখতে হবে, হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর প্রথম পাঁচ মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও চিকিৎসা নেওয়ার জন্য পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করার কোনো নিয়ম নেই। সন্দেহ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জরুরি সহায়তা চাইতে হবে। দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সঠিক পদক্ষেপই এমন পরিস্থিতিতে জীবন বাঁচানোর সুযোগ বাড়িয়ে দিতে পারে।

