বিমার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বছরের পর বছর গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ না হওয়ায় দেশের বিমা খাতে আস্থার সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এই অচলাবস্থা কাটিয়ে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধে এবার আর্থিকভাবে দুর্বল বিমা কোম্পানিগুলোর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আইনি বাধা, সম্পদের সঠিক মূল্য নির্ধারণ এবং বাজার পরিস্থিতির কারণে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হবে না।
আইডিআরএর সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ৮১টি জীবন ও সাধারণ বিমা কোম্পানির কাছে গ্রাহকদের মোট বকেয়া দাবি দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৭৭৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৩৬টি জীবনবিমা কোম্পানির কাছে আটকে আছে ৪ হাজার ৪১০ কোটি ১২ লাখ টাকা। অন্যদিকে ৪৫টি সাধারণ বা নন-লাইফ বিমা কোম্পানির কাছে বকেয়া রয়েছে ৩ হাজার ৩৬৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, মোট বকেয়া দাবির বড় অংশ কয়েকটি আর্থিকভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানের কাছে কেন্দ্রীভূত। বিশেষ করে মাত্র সাতটি কোম্পানির কাছেই প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার দাবি আটকে রয়েছে। এ কারণে প্রথম ধাপে এসব প্রতিষ্ঠানকে ঘিরেই বিশেষ কর্মপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
আইডিআরএর চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, বিমা খাতে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে সবার আগে গ্রাহকদের বকেয়া দাবি দ্রুত পরিশোধ নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর মতে, গ্রাহক সময়মতো পাওনা ফিরে পেলে ধীরে ধীরে খাতটির প্রতি মানুষের হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাসও পুনরুদ্ধার হবে।
এই লক্ষ্য সামনে রেখে গত দুই সপ্তাহে সবচেয়ে সংকটাপন্ন সাতটি বিমা কোম্পানির মালিক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছে আইডিআরএ। বৈঠকে কোম্পানিগুলোর জমি, ভবন, বিনিয়োগ, নগদ প্রবাহ এবং সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতা পর্যালোচনা করা হয়েছে। কোনো সম্পদের মূল্য নিয়ে সন্দেহ থাকলে তা স্বাধীনভাবে মূল্যায়নেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিক্রিযোগ্য জমি ও ভবন, ভালো ব্যাংকে সংরক্ষিত স্থায়ী আমানত (এফডিআর), সরকারি ট্রেজারি বন্ডসহ নগদে রূপান্তরযোগ্য অন্যান্য বিনিয়োগ বিক্রি করে অর্থ পৃথক ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হবে। প্রতিটি কোম্পানির জন্য আলাদা হিসাব পরিচালিত হবে এবং পুরো কার্যক্রম নিরীক্ষকের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হবে। পরে ‘ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট’ নীতিতে আগে দাবি জমা দেওয়া গ্রাহকদের আগে অর্থ পরিশোধ করা হবে। আর দুর্বল ব্যাংকে আটকে থাকা আমানত উদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে একাধিক জটিলতা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য, অতীতে অনেক কোম্পানি প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে জমি ও ভবন কিনেছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে একই গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে লেনদেনের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে সম্পদের মূল্যও বাড়ানো হয়েছে। ফলে বর্তমানে সম্পদ বিক্রি করতে গেলে নথিভুক্ত মূল্য এবং বাজারদরের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা দিচ্ছে। এ ছাড়া অনেক সম্পত্তি ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখা, মালিকানা নিয়ে বিরোধ বা আদালতে মামলা চলমান থাকায় বিক্রির প্রক্রিয়াও জটিল হয়ে উঠছে।
জেনিথ লাইফ ইনস্যুরেন্স পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম নুরুজ্জামান বলেন, গ্রাহকের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বর্তমান বাজারমূল্যেই সম্পদ বিক্রি করে হলেও বকেয়া দাবি পরিশোধ করা উচিত। একই সঙ্গে অতীতে অনিয়মের মাধ্যমে সম্পদ কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক মো. মাইনউদ্দিনের মতে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সময় লাগবে। কারণ বাজারে যখন জানা যাবে কোনো কোম্পানি বাধ্য হয়ে সম্পদ বিক্রি করছে, তখন সম্ভাব্য ক্রেতারা স্বাভাবিকভাবেই কম দামে সম্পদ কিনতে আগ্রহী হবেন। এতে সম্পদের ন্যায্য মূল্য পাওয়া কঠিন হতে পারে।
বর্তমান বীমা আইন, ২০১০ অনুযায়ী আইডিআরএ সরাসরি কোনো বিমা কোম্পানির সম্পদ বিক্রির ক্ষমতা রাখে না। এ জন্য আদালতের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে দেউলিয়া ঘোষণা এবং অবধায়ক নিয়োগসহ দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে আইডিআরএ ইতোমধ্যে ‘বিমাকারীর রেজল্যুশন অধ্যাদেশ’-এর খসড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠিয়েছে।
প্রস্তাবিত আইন কার্যকর হলে আর্থিকভাবে দুর্বল বিমা কোম্পানিকে একীভূত করা, পরিচালনা পর্ষদের নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন আনা এবং প্রয়োজন হলে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ব্যক্তিগত সম্পদ ব্যবহার করেও গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের সুযোগ তৈরি হবে।

