মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে এক অপ্রত্যাশিত মন্তব্য করে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ।
শুক্রবার (২৭ মার্চ) ফ্লোরিডার মিয়ামিতে আয়োজিত এক বিনিয়োগ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি মজা করে হরমুজ প্রণালিকে ‘ট্রাম্প প্রণালি’ বলে উল্লেখ করেন। এই মন্তব্যে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে তাৎক্ষণিক হাসির রোল পড়ে যায়।
বক্তৃতার এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ইরানকে এই প্রণালি খুলে দিতে হবে। এরপর তিনি নিজেই কথাটি সংশোধন করে রসিকতার সুরে জানান, তিনি আসলে হরমুজ প্রণালির কথাই বলতে চেয়েছিলেন। একই সঙ্গে বিদ্রূপাত্মক ভঙ্গিতে বলেন, ভুয়া সংবাদমাধ্যম হয়তো দাবি করবে তিনি ভুল করেছেন, কিন্তু তার অভিধানে নাকি ‘ভুল’ বলে কিছু নেই।
এই মন্তব্য এমন এক সময় এসেছে, যখন হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক অর্থনীতি গভীর অনিশ্চয়তার মুখে। বর্তমানে ইরান কার্যত এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে চলাচল সীমিত করে রাখায় প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেলের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে আরও চাপ তৈরি করছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, তারা ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে বড় ধরনের আঘাত করেছে, তবুও বাস্তবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখনো সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে রয়ে গেছে।
এর আগে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যুদ্ধের সমাধানের অংশ হিসেবে তিনি এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি যৌথভাবে এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেন।
তবে এ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল কূটনৈতিক চাপ তৈরির একটি কৌশলও হতে পারে।
অন্যদিকে কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ট্রাম্প এই প্রণালির নাম পরিবর্তন করে নিজের নাম যুক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে ভাবছেন।
নিজের নামকে বিভিন্ন স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করার প্রবণতা ট্রাম্পের নতুন নয়। এর আগেও তিনি বিভিন্ন জায়গায় নিজের নাম ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন।
গত বছর ওয়াশিংটনের একটি বিখ্যাত সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নাম পরিবর্তনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, যেখানে তার নাম যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তিনি মাঝে মাঝে রসিকতার ছলে এসব বিষয়ে মন্তব্য করে থাকেন।
মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তনের ভাবনাও তিনি অতীতে প্রকাশ করেছিলেন, যা নিয়েও তখন বেশ আলোচনা তৈরি হয়েছিল।
বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনার বিষয়টি নিয়েও রয়েছে বিভ্রান্তি। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান নাকি একটি চুক্তির জন্য আগ্রহ দেখাচ্ছে এবং আলোচনায় ফিরতে চায়।
তবে তেহরান সরাসরি এই দাবি অস্বীকার করেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এদিকে ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় সম্ভাব্য হামলা স্থগিত রাখার সময়সীমা ৬ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়িয়েছেন, যা কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালির ওপর। এই পথটি নিরাপদ না থাকলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের ‘ট্রাম্প প্রণালি’ মন্তব্যটি শুধু একটি রসিকতা নয়—বরং এটি একটি রাজনৈতিক বার্তাও বহন করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যুদ্ধের গম্ভীর পরিস্থিতির মধ্যেও এই মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যেখানে রাজনীতি, কূটনীতি এবং ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং—সবকিছুই একসঙ্গে মিশে গেছে।

