মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও আলোচনার কেন্দ্রে—এবার তার পুরনো কিন্তু বিতর্কিত এক ইস্যু, গ্রিনল্যান্ড দখলের পরিকল্পনা ঘিরে। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই তিনি যে আগের মতোই আক্রমণাত্মক ও অপ্রচলিত কূটনৈতিক অবস্থান ধরে রেখেছেন, তার আরেকটি ইঙ্গিত মিলল সাম্প্রতিক মন্তব্যে।
০৯ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০২ এএম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, হোয়াইট হাউসে ন্যাটো প্রধান মার্ক রুটে-এর সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি সরাসরি না বললেও, গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে আনার পুরনো ইচ্ছার দিকেই আবার ইঙ্গিত করেন।
তার বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি কেড়েছে ন্যাটোর প্রতি তীব্র অসন্তোষ। ট্রাম্প লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন মিত্রদের সহায়তা চেয়েছিল, তখন ন্যাটো পাশে দাঁড়ায়নি—এবং ভবিষ্যতেও তারা নির্ভরযোগ্য হবে না। এই ক্ষোভ প্রকাশের মধ্যেই তিনি গ্রিনল্যান্ডকে “একটি বড়, খারাপভাবে পরিচালিত বরফের টুকরো” হিসেবে উল্লেখ করেন। এই ভাষা কেবল কটাক্ষ নয়, বরং একটি কৌশলগত বার্তাও বহন করে।
গ্রিনল্যান্ড শুধুই বরফে ঢাকা একটি দ্বীপ নয়; এটি উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলের একটি কৌশলগত অবস্থান। প্রাকৃতিক সম্পদ, সামরিক উপস্থিতি এবং আর্কটিক অঞ্চলে ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে এই অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই বড় শক্তিগুলোর আগ্রহের কেন্দ্র। ট্রাম্পের আগের মেয়াদেও তিনি গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা আন্তর্জাতিকভাবে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে তার সাম্প্রতিক মন্তব্যকে অনেক বিশ্লেষক দেখছেন একটি “রাজনৈতিক সংকেত” হিসেবে—যেখানে সরাসরি পদক্ষেপ না থাকলেও ভবিষ্যৎ নীতির ইঙ্গিত স্পষ্ট।
ট্রাম্পের বক্তব্যে ন্যাটোর প্রতি অবিশ্বাসের সুর নতুন নয়, তবে এবার তা আরও প্রকাশ্য ও তীব্র। তার এই অবস্থান পশ্চিমা জোটের অভ্যন্তরে বিভাজন তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে এমন এক সময়, যখন মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনিশ্চিত, তখন এই ধরনের বক্তব্য মিত্রদের মধ্যে আস্থার সংকট বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে বৈঠক শেষে মার্ক রুটে জানান, তাদের আলোচনা ছিল “খোলামেলা”—যা ইঙ্গিত দেয়, ভেতরে ভেতরে মতপার্থক্য থাকলেও কূটনৈতিক সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে অনেকেই দেখছেন চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে। গ্রিনল্যান্ড ইস্যু সামনে এনে তিনি হয়তো ন্যাটো ও ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর রাজনৈতিক ও সামরিক দায়বদ্ধতা বাড়াতে চাইছেন। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, এটি তার “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতিরই ধারাবাহিকতা—যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিশ্ব রাজনীতিকে পুনর্গঠনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের নতুন করে ইঙ্গিত দেওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি বৃহত্তর এক ভূরাজনৈতিক হিসাবের অংশ, যেখানে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের প্রভাব বিস্তারের নতুন পথ খুঁজছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি মন্তব্য হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য উত্তেজনা, কূটনৈতিক সংঘাত এবং শক্তির নতুন সমীকরণ।
বিশ্ব এখন দেখছে—এই ‘ইঙ্গিত’ কি শুধুই কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তব নীতিতে রূপ নেবে।

