১৭ই মার্চ ভোর ৩টার সময় আমাদের বাড়ির কাছে বোমাগুলো পড়েছিল। আগের রাতে বৃষ্টি আর ঠান্ডার কারণে আমি উঠোনে জন্মানো ফুসফুসের সমস্যাযুক্ত তিনটি বিড়ালছানাকে ভেতরে আসতে দিয়েছিলাম। বিস্ফোরণের ধাক্কায় আমি বিছানা থেকে ছিটকে পড়ি। আমি চিৎকার করার সিদ্ধান্ত নিইনি; আমার শরীরই তা করে দিয়েছিল।
আমি ছুটে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম, চিৎকার করতে করতে বিড়ালছানাগুলোকে খুঁজতে লাগলাম। আমি ওদের দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমার শোবার ঘরের জানালাটা এত জোরে কেঁপে উঠল যে হাতলটা মট করে ভেঙে গেল। পাশের ঘরের কাচও চুরমার হয়ে গেল।
১৮ দিনের যুদ্ধে এর আগেও আমাদের কাছে বোমা পড়েছে এবং প্রতিবারই আমি মনে মনে মুসলিম শাহাদা উচ্চারণ করে বলেছি, “আমি কী করতে পারি?”, আর নিজের কাজে ফিরে গেছি।
চা পান করা। বই পড়া। ঘুমানোর চেষ্টা করা। আর কিছু করার ছিল না। কিন্তু এটা ছিল অন্যরকম। মনে হচ্ছিল যেন একটা ভূমিকম্প ফেটে পড়ছে। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে এটা প্রতিবেশীর বাড়িতে আঘাত হেনেছে, আর পরেরটা হবে আমাদের বাড়িতে। যখন এটা থামল, আমি চলে যাওয়ার কথা ভাবলাম। তারপর বিড়ালছানাগুলোর কথা মনে পড়ল।
অন্য কেউ তাদের খাওয়াতো না। আমি ভাবলাম, চলে গেলে কী কী জিনিস সঙ্গে নেওয়া উচিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো ছিল আমার ফটো অ্যালবামগুলো, মায়ের সঙ্গে তোলা আমার ছোটবেলার ছবিগুলো।
কিন্তু তার জামাকাপড়ের কী হবে? তার জিনিসপত্রের? দুদিন পর আমি জানতে পারলাম যে, আরেকটি বিড়াল প্লাস্টিক দিয়ে ঢাকা ভাঙা জানালা দিয়ে ঢুকে শোবার ঘরের আলমারিতে বাচ্চা প্রসব করেছে। এখন আমার আরও বিড়ালছানা হলো। আরও দায়িত্ব। আর বোমা পড়তেই থাকল।
প্রত্যাবর্তন
গাজা গণহত্যার ছয় মাস পর আমি জানতাম, ইসরায়েলও ইরানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। আমি তথাকথিত ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’-এর মানচিত্রগুলো দেখেছিলাম। আমি কেনাকাটা সেরে ফিরছিলাম। আমি আমার পাড়ার দিকে তাকালাম—যেখানে আমি বড় হয়েছি, যেখানে আমি ৩০ বছর ধরে বাস করেছি, যেখানে আমার মায়ের সাথে আমার কত স্মৃতি এবং ভাবলাম: যদি যুদ্ধ শুরু হয়, আমি পৃথিবীর যেখানেই থাকি না কেন, আমি ইরানে ফিরে যাব।
যদি আমার এলাকাটাও গাজার মতো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়, তবে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এর সাথে আমাকে এখানেই থাকতে হবে। কিন্তু সেই রাতের পর—বোমা, ভাঙা কাচ, আর আর্তনাদ—যখন আমি তখনও না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, তখন আমাকে নিজেকেই প্রশ্ন করতে হলো, কেন।
তখন আমি দেখলাম আমি একা নই। ইরানি পরিবারগুলো তুরস্ক, জার্মানি, আমেরিকা থেকে ফিরছিল। তারা যুদ্ধে যাওয়ার জন্য আহূত যুবক ছিল না—ইরান সরকার তাদের সম্মুখ সমরে যাওয়ার জন্য ডাকেনি। তারা ছিল সাধারণ মানুষ। মধ্যবয়সী দম্পতি। সেইসব পরিবার, যারা বিদেশের স্কুল থেকে তাদের সন্তানদের ছাড়িয়ে নিয়ে দেশে ফিরে বোমার সম্মুখীন হয়েছিল।
তেহরান ও ইসফাহানে যখন বিক্ষোভে বোমা হামলা হয়েছিল, তখন মানুষ পালিয়ে যায়নি। তারা আরও জোরে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে চিৎকার করছিল। আমি এক মহিলার একটি ছবি দেখেছিলাম—তার কাছে একটি বোমা পড়েছিল। তিনি মাথাও ঘোরাননি। তার চোখ কোরআনের ওপর স্থির ছিল।
তাহলে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথেই ইউক্রেনীয়রা কেন এমন মরিয়া হয়ে ট্রেনে ভিড় জমিয়েছিল যে কৃষ্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক ছাত্ররা পেছনে পড়ে গিয়েছিল? আর সিরীয়রাই বা কেন ইউরোপে পৌঁছানোর জন্য ভূমধ্যসাগরে ডুবে মরার ঝুঁকি নিয়েছিল? ইরানি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে এমন কী ভিন্নতা আছে, যার জন্য বোমা বর্ষণের সময় তারা থেকে যায়, বা এমনকি ফিরে আসে?
পাশ্চাত্য মনোবিজ্ঞানের কাছে আমার মতো মানুষদের জন্য একটি উত্তর আছে। তারা বলবে, মাকে হারানোর পর আমি এক জটিল শোকে ভুগছি। তারা বলবে, বোমার কারণে আমার পিটিএসডি (PTSD) হয়েছে, যা আমাকে এক জায়গায় স্তব্ধ করে দিয়েছে। তাদের যুক্তি হলো, যুক্তিসঙ্গত পথ হলো পালিয়ে যাওয়া। আর এই তত্ত্বগুলো যৌক্তিক—তবে সেই পাশ্চাত্য প্রেক্ষাপটে, যেখানে এগুলো গড়ে উঠেছে।
কিন্তু আমার বেড়ে ওঠাটা ছিল ভিন্ন আঙ্গিকে—ফার্সি কবিতা আর ইরানি রহস্যবাদের মাঝে। ফেরেদুন মোশিরির ‘মাটিতে শিকড়’ কথার মাঝে। সোহরাব সেপেহরির জীবনদর্শনের মাঝে। আমি পাশ্চাত্য দৃষ্টিভঙ্গিটা বুঝি, কিন্তু তা অনুভব করি না।
দৃঢ় বিশ্বাস
যখন আমাদের পাশে বোমা পড়ে, আমরা অগত্যা ভেঙে পড়ি না। দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের ধরে রাখে। আমাদের প্রাচ্য দৃষ্টিকোণ থেকে মনস্তাত্ত্বিক, সমাজতাত্ত্বিক, দার্শনিক—গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার প্রয়োজন আছে। কিন্তু সেই গবেষণা না হওয়া পর্যন্ত, আমি আপনাদের শুধু এটুকুই বলতে পারি: ২৩ বছর আগে, আমি টেলিভিশনে আমেরিকার ইরাক আক্রমণের খবর দেখছিলাম। আমার মায়ের চোখ জলে ভরে গিয়েছিল।
তিনি আমাকে বললেন: “তুমি এখনও শিশু। স্বদেশ কাকে বলে তা তুমি এখনও জানো না।” তিনি ইরাকের জন্য কাঁদছিলেন—সেই ইরাক, যা আমাদের বিরুদ্ধে আট বছরের যুদ্ধ করেছিল। তখন তিনি ছিলেন এক তরুণী মা, বোমার মধ্যে জন্ম নেওয়া সন্তানদের বড় করেছেন, বিস্ফোরণ থেকে তাদের বাঁচিয়েছেন। কিন্তু তিনি জানতেন: আমেরিকার আগ্রাসন ইরাকি জনগণের জন্য কোনো মঙ্গল বয়ে আনবে না।
আমার মা আমাকে শিখিয়েছেন দেশকে ভালোবাসার অর্থ কী। অসুস্থ ও সংগ্রামের মধ্যেও তিনি প্রতিটি নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন, কারণ তিনি জানতেন যে ভোটাধিকার আমাদের সহজে দেওয়া হয়নি এবং তা সহজে হারানো উচিত নয়। তিনি যুদ্ধ ও হত্যার মাধ্যমে নয়, বরং ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে পরিবর্তনে বিশ্বাসী ছিলেন।
আমি তেহরানকে ভালোবাসি। এখানকার যানজট বা দূষিত বাতাস আমার ভালো লাগে না। কিন্তু এই শহরের প্রতিটি কোণায় আমার মায়ের সাথে কাটানো শৈশবের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। যে পার্কগুলোতে আমরা হাঁটতাম। সিনেমা হল, থিয়েটার। যে স্কুল আর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি পড়াশোনা করেছি।
আর এখন, আমাদের পুরোনো বাড়ির প্রতিটি কোণে, এই শহরের প্রতিটি রাস্তায় তার স্মৃতি বেঁচে আছে। ইরান শুধু আমার দেশ নয়। ইরান আক্ষরিক অর্থেই আমার মা। আর তাকে ছেড়ে যাওয়া কোনো বিকল্পই নয়।
গাজা গণহত্যার এক বছর পর একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। ইসরায়েল বলেছিল, তারা রাফাহ ক্রসিং খুলে দেবে যাতে গাজার বাসিন্দারা অন্য দেশে চলে যেতে পারে। আমি একজন বৃদ্ধ ফিলিস্তিনির একটি ভিডিও দেখেছিলাম। তিনি এক বছর ধরে একটি তাঁবুতে বাস করছিলেন। পানি নেই, বিদ্যুৎ নেই। তিনি নিজের চোখে গণহত্যাটি প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
কেউ তাকে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি চলে যেতে চান?” তিনি বললেন, “আমাকে জান্নাত দিলেও আমি যাব না। আমার ছেলের রক্ত এখানেই, এই মাটিতে ঝরেছে। আমি এই জায়গা থেকে নড়ব না।”
কবর অপবিত্র করা
গাজা গণহত্যার শুরু থেকেই আমি ইসরায়েলি সৈন্যদের ফিলিস্তিনি কবরস্থান অপবিত্র করার ছবি দেখে আসছিলাম। তারা মৃতদেরও রেহাই দেয়নি। তারা দেহগুলো ছিন্নভিন্ন করে পরিবারের কাছে এমনভাবে ফিরিয়ে দিত যে তাদের চেনা যেত না। আর আমার মাথায় শুধু আমার মায়ের কবরের কথাই ঘুরছিল। আমি উপলব্ধি করলাম: তাঁর হাড়ের প্রতি কেউ যাতে অসম্মান না করে, তার জন্য আমি নিজের জীবনও দিয়ে দেব।
সেই বৃদ্ধ ফিলিস্তিনি ভদ্রলোক আমাকে বুঝিয়েছিলেন যে আমরা কতটা একই রকম। আমাদের হারানো প্রিয়জনেরা আজও আমাদের কাছে কতটা প্রিয়। আমরা আমাদের মাটিকে কতটা ভালোবাসি, কারণ আমাদের প্রিয়জনেরা সেখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত।
সম্ভবত ভূমি ও মৃতদের প্রতি এই অভিন্ন ভালোবাসার কারণেই ইরানিরা ফিলিস্তিনিদের প্রতি এমন গভীর সংহতি অনুভব করে। আমরা তাদের মধ্যে কিছু একটাকে চিনতে পারি। এমন এক ভালোবাসা, যা ঝুঁকির হিসাব করে না। এমন এক ভালোবাসা যা বলে: এখানেই, অন্য কোথাও নয়। এমনকি যদি বোমাও পড়ে।
আমরা এখন যুদ্ধবিরতিতে আছি। কিন্তু তারা সম্ভবত আবার আমাদের ওপর হামলা করবে। হয়তো পরের বোমা হামলায় আমি বাঁচব না। কিন্তু আমি এটা জানি: আমি যে জীবনটা কাটিয়েছি, তা নিয়ে আমি সন্তুষ্ট। এর সমস্ত কষ্ট। জন্মের দিন থেকে আমি যে সমস্ত যুদ্ধ আর নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হয়েছি। আমি ইরান ছাড়া আর কোথাও জন্মাতে চাইতাম না।
হয়তো ফিলিস্তিন—সুন্দর ফিলিস্তিন—ও ভালোই হতো।
একবার আমি মনে মনে ভাবলাম: এই জীবনে এত কষ্ট সহ্য করার পরেও আমি ইরানের জন্য মরতে প্রস্তুত। আর সেই মুহূর্তে আমি বুঝলাম: এর কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই। একে শুধু ভালোবাসাই বলা যায়। কারণ এটা মোটেও যুক্তিসঙ্গত নয়।
ইরান আমাকে শিখিয়েছে ভালোবাসা কাকে বলে। তাই কাল যদি আমি মারাও যাই, তবুও মনে থাকবে আমার জীবনটা সার্থক হয়েছে।
- গজল তানহাই: তেহরানের শরিফ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষণা সহযোগী। সূত্র: ‘মিডল ইস্ট আই’-এর ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত।

