উপসাগরীয় আরব ও ইউরোপের কয়েকজন শীর্ষ নেতা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে অন্তত ছয় মাস সময় লাগতে পারে। এই সময়ে বর্তমান যুদ্ধবিরতি আরও বাড়ানো জরুরি বলে তারা মত দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তারা জানান, নেতাদের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাদের সতর্কতা, আগামী এক মাসের মধ্যে প্রণালিটি পুনরায় কার্যকর না হলে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এরই মধ্যে এ খবরে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ ডলার ছাড়িয়েছে।
ওই কর্মকর্তারা আরও দাবি করেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর ধারণা হলো ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার পরও তাদের অবস্থান বদলায়নি। এ কারণে সম্ভাব্য কোনো চুক্তিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা থাকা উচিত বলে তারা মনে করেন।
তবে একই সঙ্গে উপসাগরীয় নেতৃত্ব নতুন করে যুদ্ধ বিস্তারের পক্ষে নয়। তারা চাইছেন, যুক্তরাষ্ট্র যেন ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রাখে। সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনের পক্ষ থেকে ব্লুমবার্গের মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৮ এপ্রিলের এক বিবৃতির কথা উল্লেখ করেছে, যেখানে ‘শর্তহীনভাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার’ আহ্বান জানানো হয়।
ওই বিবৃতিতে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছিল।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা শুরু করে। এর পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানও ইসরায়েলসহ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের বিভিন্ন শহর, বন্দর ও তেল স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। গত ৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর তেলের দাম কিছুটা কমলেও তা এখনো যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ বেশি।
লন্ডনভিত্তিক থিংক ট্যাংক চ্যাথাম হাউসের সদস্য ও ইরানে সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত রব ম্যাকিয়ার ব্লুমবার্গকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্রুত কোনো চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম। তার মতে, রাজনৈতিক ঘোষণার বাইরে মূল চ্যালেঞ্জ হলো যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়া ঠেকানো। তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও ইরানের অভ্যন্তরে নতুন করে হামলার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), অ্যালুমিনিয়াম ও সার রপ্তানি স্বাভাবিকভাবে করতে পারছে না তারা।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরান বর্তমান যুদ্ধবিরতি আরও দুই সপ্তাহ বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে। বর্তমান বিরতির মেয়াদ যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার শেষ হওয়ার কথা। এটি বাড়ানো গেলে শান্তি আলোচনার জন্য অতিরিক্ত সময় পাওয়া যাবে।
তবে স্থায়ী সমাধান নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরানের অবস্থান, পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো ইস্যুতে দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে।
ম্যাকিয়ার মনে করেন, পারমাণবিক ইস্যুতে কিছুটা সমঝোতার সুযোগ থাকলেও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার দেওয়া সম্ভব হতে পারে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আটকে থাকা অর্থ ছাড় এবং কিছু তেল বাণিজ্য শিথিল করতে পারে। তবে হরমুজ প্রণালি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রশ্নটি সবচেয়ে জটিল ইস্যু হিসেবেই থেকে যাবে।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন। যদিও এতে হিজবুল্লাহর নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। কিছু বিশ্লেষকের মতে, এই যুদ্ধবিরতি মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক পরিবেশ কিছুটা স্বাভাবিক করতে সহায়ক হতে পারে এবং ইরান ইস্যুতে আলোচনার পথও সহজ করতে পারে।

