দেখতে একেবারেই সাধারণ লেগো সেটের মতো। রঙিন ব্লক, ছোট চরিত্র আর খেলনার মতো দৃশ্যপট কিন্তু সেই খেলনার আড়ালেই তৈরি হচ্ছে একটি তীব্র রাজনৈতিক বার্তা—যা ছড়িয়ে পড়ছে আন্তর্জাতিক তথ্যযুদ্ধের অংশ হিসেবে।
একাধিক লেগো-ধাঁচের অ্যানিমেটেড ভিডিওতে তুলে ধরা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, যেখানে ইতিহাস, যুদ্ধ ও প্রতীকী ঘটনাকে একত্র করে সাজানো হচ্ছে নাটকীয় দৃশ্য।
ভিডিওর এক পর্যায়ে দেখা যায়, চাঁদের আলোয় আলোকিত এক নির্জন প্রান্তরে ঘোড়ায় চড়ে এগিয়ে আসছেন এক আদিবাসী আমেরিকান নেতা। এরপরই দ্রুত দৃশ্যপট বদলে যায়। সেখানে ভেসে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রে নিপীড়নের শিকার বিভিন্ন গোষ্ঠীর ছবি—শৃঙ্খলবন্দি কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ এবং ইরাকের আবু গারিব কারাগারের ভুক্তভোগীরা।
পরবর্তী অংশে ইরানি সেনাদের দেখা যায়, যারা ক্ষেপণাস্ত্রে বিভিন্ন ব্যানার সংযুক্ত করছে। সেখানে লেখা—‘অপহৃত কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য’, ‘হিরোশিমা ও নাগাসাকির মানুষের জন্য’, এবং ‘ইরান এয়ার ফ্লাইট ৬৫৫-এর নিহতদের স্মরণে’। ভিডিওর শেষ দৃশ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিশাল মূর্তি ভেঙে পড়তে দেখা যায়। এরপর ভেসে ওঠে একটি বার্তা—‘সবার জন্য এক প্রতিশোধ’।
আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, এই ভিডিওটি ২৯ মার্চ প্রকাশের পর দ্রুত সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এটি ইরান-ভিত্তিক কয়েকটি গোষ্ঠীর তৈরি লেগো-স্টাইল ভিডিও সিরিজের অংশ, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বার্তা জোরালো করছে।
এই কনটেন্ট তৈরির পেছনে রয়েছে ‘এক্সপ্লোসিভ মিডিয়া’ নামের একটি দল। তারা লেগোর মতো ব্লক ও চরিত্র ব্যবহার করে কখনো গম্ভীর, আবার কখনো র্যাপ-স্টাইল ভিডিও তৈরি করছে। এসব ভিডিওতে নিয়মিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ব্যঙ্গ করা হয়। একই সঙ্গে তার বক্তব্য ব্যবহার করে তাকে ভণ্ডামি ও ইসরায়েলের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগে উপস্থাপন করা হয়।
তাদের একটি ইউটিউব চ্যানেল সহিংসতা প্রচারের অভিযোগে ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে দলের একজন প্রতিনিধি জানিয়েছেন, তারা এতে বিস্মিত নন। তার ভাষায়, পশ্চিমা বিশ্ব সত্যকে আড়াল করে এবং যে কণ্ঠ তা প্রকাশ করে, তাকে থামানোর চেষ্টা করে।
ভিডিওগুলোর ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনাতেও রয়েছে প্রতীকী বার্তা। সবুজ ও লাল রঙের ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষণীয়, যা শিয়া ঐতিহ্যের প্রতীকী অর্থ বহন করে বলে বিশ্লেষকদের মত। এখানে সবুজকে ন্যায়বিচারের প্রতীক এবং লালকে অত্যাচারের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা কারবালার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গেও যুক্ত করা হয়।
অন্যান্য দৃশ্যে ‘এপস্টিন রেজিম’, ‘লুজার’সহ নানা শব্দ ব্যবহার করে ট্রাম্প ও তার সমর্থকদের কটাক্ষ করা হয়েছে। কিছু অংশে ট্রাম্পের ‘মাগা’ টুপি পরা চরিত্র দেখিয়ে তার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগও তুলে ধরা হয়। একটি ভিডিওতে আবার লেবাননের জনগণের উদ্দেশে বার্তা দেওয়া হয়, যেখানে বলা হয় ইরানের রেভ্যুলেশনারি গার্ড তাদের পাশে থাকবে। এটি এমন সময় প্রকাশিত হয় যখন ওই অঞ্চলে তীব্র বোমাবর্ষণ চলছিল।
এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ১৯ থেকে ২৫ বছর বয়সী প্রায় ১০ জন তরুণ নির্মাতা। তারা ইন্টারনেট ব্যবহার করে কনটেন্ট তৈরি করছে, যদিও ইরানে সামাজিকমাধ্যমের ওপর ব্যাপক বিধিনিষেধ রয়েছে। তাদের দাবি, তারা স্বাধীনভাবে কাজ করে। তবে একই সঙ্গে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও তাদের কিছু কনটেন্ট কিনে সম্প্রচার করে।
এই লেগো-ধাঁচের রাজনৈতিক ভিডিও এখন শুধু একটি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ‘পারসিয়া বই’ ও ‘সাউদার্ন পাঙ্ক’র মতো আরও কয়েকটি নির্মাতা দলও একই ধরনের কনটেন্ট তৈরি করছে। এমনকি এই প্রবণতা ইরানের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে পাকিস্তান পর্যন্ত। ইসলামাবাদে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার আগে স্থানীয় কিছু নির্মাতাও অনুরূপ ভিডিও তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব ভিডিওর সবচেয়ে বড় শক্তি এর উপস্থাপনা কৌশল। ইসলামাবাদভিত্তিক বিশ্লেষক ফাসি জাকা বলেন, পশ্চিমা গণমাধ্যম দীর্ঘদিন ধরে যে বর্ণনা তৈরি করেছে, তার বিপরীতে এই ধরনের ভিডিও তথ্যযুদ্ধের নতুন একটি মাধ্যম হয়ে উঠছে। তিনি আরও মনে করেন, ভিডিওগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন—যেমন ‘এপস্টিন’ বিতর্ক বা ‘মাগা’ রাজনীতি—খুব সূক্ষ্মভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা এগুলোকে আরও কার্যকর করে তুলছে।
কাতারের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মার্ক ওয়েন জোনসের মতে, ইরান বুঝতে পেরেছে যে সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলা করা সহজ নয়। তাই জনমত গঠনই এখন তাদের প্রধান কৌশল। তার ভাষায়, এই ধরনের ব্যঙ্গাত্মক ও তীক্ষ্ণ বার্তা—যাকে তিনি ‘ট্রল প্রোপাগান্ডা’ বলেন—বর্তমান ডিজিটাল যুগে খুবই কার্যকর।
তবে তিনি এটিও মনে করেন, এসব ভিডিও আরও বেশি প্রভাব ফেলতে পারত যদি এর উৎস ইরান না হতো। পশ্চিমা দর্শকদের মধ্যে ইরান সম্পর্কে দীর্ঘদিনের সন্দেহ ও অবিশ্বাস এখনো বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে লেগোর মতো খেলনার আড়ালে তৈরি এই ভিডিওগুলো কেবল বিনোদনের অংশ নয়। এগুলো এখন পরিণত হয়েছে একটি সুপরিকল্পিত তথ্যযুদ্ধের হাতিয়ারে—যার লক্ষ্য শুধু যুদ্ধক্ষেত্র নয়, বিশ্বজনমতের দিকও প্রভাবিত করা।

