ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলে আঘাত হানা শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর দেশটিতে শোক ও উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে। উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে আরও একটি মরদেহ উদ্ধারের পর মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
সোমবার দক্ষিণাঞ্চলীয় মিন্দানাও দ্বীপে ৭.৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। শুরুতে প্রাণহানির সংখ্যা তুলনামূলক কম মনে হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় ধসে পড়া ভবন, ভূমিধস এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মানুষের তথ্য সামনে আসতে থাকে। ফলে দুই দিনের ব্যবধানে মৃতের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
সর্বশেষ উদ্ধার অভিযানে একটি সুপারমার্কেটের ধ্বংসাবশেষের নিচ থেকে ৩৯ বছর বয়সী কর্মী জোই দেলুভিওর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা তাকে জীবিত উদ্ধারের জন্য দীর্ঘ সময় চেষ্টা চালিয়েছিলেন। প্রাথমিক পর্যায়ে বিশেষ যন্ত্রে জীবনের ক্ষীণ সংকেতও ধরা পড়েছিল বলে জানা যায়। কিন্তু ধ্বংসস্তূপের গভীরে পৌঁছানোর পর আর কোনো প্রাণের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
উদ্ধারকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মরদেহটি দুটি বিশাল কংক্রিট বিমের মাঝখানে চাপা অবস্থায় ছিল। এ ধরনের পরিস্থিতি উদ্ধার কার্যক্রমকে অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ করে তোলে।
জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৪৫ বলে নিশ্চিত করা হয়েছিল। তবে পরে উদ্ধার হওয়া নতুন মরদেহটি সেই তালিকায় যুক্ত না থাকায় মোট মৃতের সংখ্যা ৪৬-এ পৌঁছেছে। একই সঙ্গে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা ৪ থেকে বেড়ে ১৭ জনে দাঁড়িয়েছে, যা ভবিষ্যতে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন করে শনাক্ত হওয়া অধিকাংশ মৃতদেহ পাওয়া গেছে দাভাও অক্সিডেন্টাল প্রদেশে। সেখানে অনেক মানুষ ভূমিধসের শিকার হয়েছেন। এছাড়া বহু ভবন ধসে পড়ায় হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ভূমিকম্পের ভয়াবহতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ ছিল এর অগভীর গভীরতা। জার্মান ভূ-বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটি ভূপৃষ্ঠের মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে সংঘটিত হয়েছিল। সাধারণত অগভীর গভীরতায় সংঘটিত ভূমিকম্পের প্রভাব বেশি বিস্তৃত হয় এবং স্থাপনার ওপর ধ্বংসাত্মক চাপ সৃষ্টি করে।
ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র ছিল জেনারেল সান্তোস সিটির উপকূলবর্তী এলাকা। প্রায় সাত লাখ ২০ হাজার মানুষের এই শহর এবং আশপাশের অঞ্চলগুলোতে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক বাসিন্দা এখনও নিজেদের ঘরে ফিরতে সাহস পাচ্ছেন না। আফটারশকের আশঙ্কায় অনেকে খোলা জায়গা কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।
ফিলিপাইন বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অগ্নিবলয়ের অংশ হওয়ায় দেশটিতে প্রায়ই শক্তিশালী ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। তবে সাম্প্রতিক এই ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্পকে গত কয়েক বছরের মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ দুর্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে উদ্ধারকারী দলগুলো ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া সম্ভাব্য জীবিত ব্যক্তিদের খোঁজে দিনরাত কাজ করছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি এবং চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রমও চলছে।
যদিও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে, তবুও সময় যত গড়াচ্ছে, নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের আশা ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে। ফলে পুরো দেশ এখন শোক, উদ্বেগ এবং অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে সময় পার করছে।

