মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দাবি করেছে, সাম্প্রতিক মার্কিন হামলার জবাবে তারা অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ২১টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সমন্বিত হামলা চালিয়েছে। এই দাবি সত্য হলে এটি সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বড় সরাসরি সামরিক পাল্টা অভিযানের ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হবে।
বুধবার ভোরে প্রকাশিত একাধিক বিবৃতিতে ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন বিমানঘাঁটি, নৌঘাঁটি এবং সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে তেহরান স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো হামলার আরও কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
ইরানের দাবি অনুযায়ী, জর্ডানের আল আজরাক বিমানঘাঁটির চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান সংরক্ষণের হ্যাঙ্গার এবং একটি কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রও ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে জর্ডানের সেনাবাহিনী ভিন্ন তথ্য দিয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান থেকে ছোড়া পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফলভাবে প্রতিহত করেছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ মাটিতে পড়লেও কোনো প্রাণহানি বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
শুধু জর্ডান নয়, কুয়েতেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, কুয়েতে অবস্থিত আলি আল সালেম সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের ভাষ্যমতে, এটি ছিল সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের সরাসরি প্রতিক্রিয়া।
এদিকে কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, বুধবার ভোরে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কয়েকটি শত্রুতামূলক আকাশীয় লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও প্রতিহত করেছে। যদিও এসব লক্ষ্যবস্তুর প্রকৃতি বা উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করা হয়নি।
বাহরাইনেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে সতর্কতামূলক সাইরেন চালু করেছে। একই সময়ে ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, বাহরাইনে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরকে লক্ষ্য করেও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মার্কিন একটি মানববিহীন আকাশযান ভূপাতিত করার দাবি। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, তারা দক্ষিণাঞ্চলীয় বুশেহর প্রদেশের আকাশে একটি এমকিউ-৯ ড্রোন ধ্বংস করেছে। যদিও এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ ইরানের জাস্ক, সিরিক ও কেশম অঞ্চলে সাম্প্রতিক মার্কিন হামলার প্রতিক্রিয়াতেই এই বৃহৎ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তেহরানের দাবি, মার্কিন হামলায় টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো এবং পানি সরবরাহ ব্যবস্থার কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাত আড়াইটার দিকে ইরানের নৌবাহিনী মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের বিরুদ্ধে পৃথক অভিযান শুরু করেছে বলেও দাবি করা হয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সংঘাত এখনও শেষ হয়নি এবং পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে আরও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
এই ঘটনার পর কূটনৈতিক অঙ্গনেও উত্তেজনা বেড়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো হামলা বা হুমকি কখনোই জবাবহীন থাকবে না।
আরাগচির মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সক্ষমতা ও ধৈর্য পরীক্ষা করার চেষ্টা করছে। তবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সবচেয়ে আলোচিত মন্তব্যটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ করে দেওয়া তার সরাসরি বার্তা। তিনি বলেন, যদি ওয়াশিংটন নিরাপদ থাকতে চায়, তাহলে তাদের মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল থেকে সরে যাওয়া উচিত। পাশাপাশি তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে পারস্য উপসাগরের ইতিহাসে বহিরাগত শক্তিগুলোর জন্য বহুবার কঠিন পরিণতির উদাহরণ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জর্ডান, কুয়েত, বাহরাইন এবং পারস্য উপসাগরীয় অন্যান্য দেশও এখন এই উত্তেজনার সরাসরি প্রভাবের মুখে পড়ছে। ফলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
এখন পর্যন্ত দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। ফলে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে।

