ইসলামাবাদে এই সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হলো, সেটি প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। তাৎক্ষণিক ফলের হিসাবে সংলাপটি ব্যর্থ বলেই ধরা হচ্ছে। কিন্তু ঘটনাটির আরেকটি দিক এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশি আলোচিত—এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সুবিধা পেয়েছে পাকিস্তান। কারণ, ফল না এলেও এমন এক জটিল ও সংবেদনশীল আলোচনার আয়োজন করে ইসলামাবাদ বিশ্বরাজনীতিতে নিজের অবস্থান নতুনভাবে তুলে ধরতে পেরেছে।
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সব সময় চূড়ান্ত সমঝোতাই একমাত্র সাফল্য নয়। অনেক সময় কে আলোচনা টেবিল তৈরি করল, কে দুই প্রতিপক্ষকে একই শহরে আনতে পারল, কে আস্থার একটি ন্যূনতম পরিবেশ গড়ে দিল—এসবও বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই জায়গা থেকেই এবার পাকিস্তানের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ইরানবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এলিয়ট অ্যাব্রামস এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, পাকিস্তান এ ঘটনার মাধ্যমে কূটনৈতিক মানচিত্রে নিজেদের উপস্থিতি স্পষ্ট করেছে। তাঁর ভাষ্যে, ভবিষ্যতেও দেশটি বার্তা আদান-প্রদানের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতে পারে এবং এর ফলে আরও সুনাম অর্জন করতে পারে। এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, আলোচনার ফল শূন্য হলেও পাকিস্তানের জন্য দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি; বরং নতুন কিছু দরজা খুলে গেছে।
প্রশ্ন হলো, পাকিস্তান কেন এমন একটি ভূমিকায় সামনে আসতে পারল? এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। প্রথমত, ইরান ও চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে ঘনিষ্ঠ। এই সম্পর্ক তাকে অন্তত এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরে, যাকে উভয় পক্ষ একেবারে অগ্রহণযোগ্য মনে করে না। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের যেসব উপসাগরীয় দেশ এ ধরনের মধ্যস্থতায় এগিয়ে আসতে পারত, তাদের অনেকেই নিজ নিজ আঞ্চলিক টানাপোড়েন ও নিরাপত্তা-সংকটে ব্যস্ত ছিল। ফলে কূটনৈতিক শূন্যতার একটি জায়গা তৈরি হয়, আর সেই জায়গাটিই কাজে লাগাতে সক্ষম হয় ইসলামাবাদ।
তবে পাকিস্তানের এই অবস্থানে পৌঁছানো কেবল ভৌগোলিক বা কৌশলগত সুবিধার ফল নয়। ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে ইসলামাবাদ যে ধারাবাহিকভাবে ওয়াশিংটনের অনুকূলে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিংটনভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ থ্রেলকেল্ডের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের একটি নির্দিষ্ট মাত্রার দৃঢ়তা এবং শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিগত আস্থা ছাড়া পাকিস্তানের পক্ষে এমন আলোচনার আয়োজন করা সম্ভব হতো না। অর্থাৎ, এই আয়োজনের পেছনে শুধু তাৎক্ষণিক তৎপরতা নয়, বরং সম্পর্ক তৈরির দীর্ঘ প্রস্তুতিও কাজ করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যেগুলো ট্রাম্পের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ও পছন্দের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। আফগানিস্তানে ১৩ জন মার্কিন সেনা হত্যার ঘটনায় জড়িত এক চাওয়া-পাওয়া আইএস সন্দেহভাজনকে ধরতে সহায়তা করা, ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেওয়া, বাণিজ্যচুক্তিতে আগ্রহ দেখানো, তাঁর শান্তিবিষয়ক পর্ষদে যুক্ত হওয়া—এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ইসলামাবাদ স্পষ্টভাবে বার্তা দিয়েছে যে, তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন মাত্রায় নিতে আগ্রহী। এমনকি পাকিস্তানের ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টো ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানের চুক্তিও রাজনৈতিক মহলে আলাদা করে নজর কাড়ে।
থ্রেলকেল্ডের পর্যবেক্ষণ আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, এটি কোনো একক কৌশলের ফল নয়; বরং এমন এক দীর্ঘ তালিকার ফল, যেখানে পাকিস্তান ট্রাম্প প্রশাসনের মানসিকতা বুঝে ধাপে ধাপে নিজেদের অবস্থান গড়ে নিয়েছে। এই বক্তব্য পাকিস্তানের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক আচরণকে বুঝতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, ইসলামাবাদ এখানে কেবল সুযোগ নেয়নি; তারা সুযোগ আসার আগেই নিজেদের উপযোগী করে তুলেছে।
ইসলামাবাদের আলোচনা শেষে ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফকে ধন্যবাদ জানান। তিনি তাঁদের সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্যও করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইসলামাবাদ ছাড়ার সময় বলেন, পাকিস্তানি নেতৃত্ব অসাধারণ আতিথেয়তা দেখিয়েছে, আর আলোচনায় যে ঘাটতি ছিল, তা পাকিস্তানের কারণে হয়নি। এই ধরনের প্রকাশ্য প্রশংসা নিছক সৌজন্য নয়; আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এগুলোকে প্রায়ই রাজনৈতিক সংকেত হিসেবে দেখা হয়। বিশেষ করে যখন এমন প্রশংসা এমন এক দেশের উদ্দেশে আসে, যে দেশ দীর্ঘদিন নানা কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ওঠানামার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে গেছে।
এখানে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের ভূমিকাও আলাদা করে উল্লেখ করার মতো। ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক যে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে, তা বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে পরিষ্কার হয়েছে। ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের সময় থেকেই ট্রাম্প তাঁর প্রতি আগ্রহী হন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরে সেপ্টেম্বরে মুনির, শেহবাজ শরিফকে সঙ্গে নিয়ে ওয়াশিংটন সফরে গেলে গুরুত্বপূর্ণ খনিজসম্পদকে আলোচনার কেন্দ্রে তোলেন, যা ট্রাম্পের অগ্রাধিকার তালিকায় ছিল। এতে বোঝা যায়, পাকিস্তান শুধু নিরাপত্তা বা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রসঙ্গ তুলে যুক্তরাষ্ট্রকে কাছে টানেনি; বরং অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের জায়গাটিও স্পর্শ করেছে।
তবে এই সাফল্যের গল্পের ভেতরেও সতর্কতার জায়গা রয়েছে। কারণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া এক জিনিস, আর দীর্ঘমেয়াদি ফল এনে দেওয়া আরেক জিনিস। অবসরপ্রাপ্ত নৌ রিয়ার অ্যাডমিরাল মার্ক মন্টগোমারির পর্যবেক্ষণ সেই বাস্তবতাকেই সামনে আনে। তাঁর মতে, ইসরাইলের ক্ষেত্রে যেভাবে চাপ প্রয়োগ বা প্রভাব বিস্তার করা যায়, পাকিস্তানের পক্ষে হয়তো তেমন দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা সম্ভব নাও হতে পারে। অর্থাৎ, পাকিস্তান আলোচনা টেবিল সাজাতে পারলেও সমাধানের ভার পুরোপুরি বহন করার সক্ষমতা তার আছে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
এ কারণেই অনেক বিশ্লেষক বলছেন, পাকিস্তানের বর্তমান সাফল্যকে অতিরঞ্জিত না করে ধীরে বিচার করা উচিত। এখনো এটি একটি সম্ভাবনার মুহূর্ত, চূড়ান্ত অর্জনের নয়। তবু সম্ভাবনাটি ছোট নয়। কারণ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গ্রহণযোগ্যতা একবার তৈরি হলে পরবর্তী সংকটগুলোতেও সেই রাষ্ট্রের দরজা খোলা থাকে। একজন আরব কূটনীতিকের মন্তব্যেও সেই দিকটি উঠে এসেছে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে পাকিস্তানকে প্রকাশ্যে ধন্যবাদ জানিয়েছে এবং বিশ্বাসযোগ্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে স্বীকৃতির ইঙ্গিত দিয়েছে, তাতে ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পাকিস্তান আরও গ্রহণযোগ্য ভূমিকায় আবির্ভূত হতে পারে।
এই পুরো ঘটনাকে তাই এক বাক্যে ব্যাখ্যা করলে বলা যায়—আলোচনা ব্যর্থ হলেও পাকিস্তান হারেনি। বরং তাৎক্ষণিক ফল না এলেও ইসলামাবাদ দেখিয়ে দিয়েছে, তারা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা রাজনীতির একটি দেশ নয়; চাইলেই বড় শক্তিগুলোর মধ্যে বার্তাবাহক, সেতুবন্ধনকারী এবং আলোচনার আয়োজক হিসেবেও নিজেদের হাজির করতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে অর্থনৈতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক সংশয়ের মধ্যে থাকা পাকিস্তানের জন্য এটি নিঃসন্দেহে ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, ইসলামাবাদের এই অধ্যায় কেবল একটি ব্যর্থ সংলাপের গল্প নয়। এটি একই সঙ্গে পাকিস্তানের কৌশলী অবস্থান গ্রহণ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত, ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ ধরে রাখা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নতুন গ্রহণযোগ্যতা তৈরির গল্প। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক কোন দিকে যাবে, তা এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—এই পর্ব শেষে পাকিস্তান আগের জায়গায় নেই; কূটনীতির ময়দানে সে এখন কিছুটা হলেও উঁচুতে উঠে গেছে।

