হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে গত ২৪ ঘণ্টায় যে নাটকীয় পালাবদল ঘটেছে, তা কেবল আঞ্চলিক উত্তেজনার খবর নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কূটনীতির জন্যও বড় সতর্কসংকেত। গত শুক্রবার রাত পর্যন্ত যে দৃশ্যপট কিছুটা স্বস্তির ছিল, শনিবার তাতেই আবার ফিরে এসেছে আশঙ্কা, অবিশ্বাস এবং যুদ্ধের গন্ধ। এমন দ্রুত পরিবর্তন সাধারণত তখনই দেখা যায়, যখন আলোচনার টেবিলের ভাষা আর সামরিক শক্তি প্রদর্শনের ভাষা একে অপরকে অতিক্রম করতে শুরু করে।
শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ঘোষণা দিয়েছিলেন, জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া হয়েছে। এই ঘোষণাকে তাৎক্ষণিকভাবে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তখন প্রকাশ্যে সন্তোষ দেখিয়ে ইরানকে ধন্যবাদ জানান। বাজারও দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ১০ শতাংশ কমে যায়। অর্থাৎ, বাজার ধরে নিয়েছিল যে অন্তত আপাতত বড় ধরনের জ্বালানি সংকট হয়তো এড়ানো যাচ্ছে।
কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ টেকেনি। ইরানের ভেতর থেকেই আরাগচির বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম সমালোচনা করে জানায়, প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণায় জাহাজ চলাচলের শর্ত এবং কার্যপদ্ধতি নিয়ে অনেক অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। এই অস্পষ্টতাই মুহূর্তে পরিস্থিতিকে আবার অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। কারণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুধু মৌখিক ঘোষণা যথেষ্ট নয়; দরকার পরিষ্কার শর্ত, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং বাস্তব প্রয়োগের ইঙ্গিত। যখন সেগুলো অনুপস্থিত থাকে, তখন বাজার, নৌপরিবহন খাত এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলো দ্রুতই সন্দিহান হয়ে পড়ে।
এর পরেই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরও কঠোর হয়ে ওঠে। ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তির শতভাগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ বহাল থাকবে। এখানেই মূল সংকটটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে ইরান প্রণালি খুলে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, অবরোধ তুলে নেওয়ার মতো পর্যায়ে এখনো কিছু পৌঁছায়নি। ফলে যে সাময়িক আশাবাদ জন্মেছিল, তা ভেঙে পড়ে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই।
শনিবার চিত্র আরও বদলে যায়। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানায়, তারা আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত নৌ-অবরোধকেই তারা এর কারণ হিসেবে তুলে ধরে। এক বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, কোনো জাহাজ প্রণালির কাছাকাছি গেলে তা শত্রুকে সহযোগিতা হিসেবে বিবেচিত হবে, এবং সে ধরনের জাহাজের ওপর হামলাও চালানো হতে পারে। এই ভাষা নিছক সতর্কবার্তা নয়; এটি এক ধরনের সামরিক বার্তা, যার উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে চাপ দেওয়া, বাণিজ্যিক জাহাজকে ভীত করা, এবং আন্তর্জাতিক মহলকে বোঝানো যে ইরান এখনো এই জলপথে বড় প্রভাব রাখে।
এই জায়গাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ। এখানে সামান্য অস্থিরতাও বৈশ্বিক তেলের বাজারে বড় প্রভাব ফেলে। তাই প্রণালি খোলার খবর যেমন সরবরাহ বাড়ার আশা তৈরি করেছিল, আবার বন্ধের ঘোষণা সেই আশাকে প্রায় মুহূর্তেই মুছে দিয়েছে। বাজারের ভাষায় এটি শুধু সরবরাহের প্রশ্ন নয়; এটি অনিশ্চয়তার মূল্য। আর সেই মূল্য প্রায় সব সময়ই বিশ্ব অর্থনীতিকে বাড়তি চাপের মুখে ঠেলে দেয়।
শনিবার ইরানের সামরিক বাহিনী আবারও জানায়, যত দিন মার্কিন নৌ-অবরোধ বহাল থাকবে, তত দিন প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এর মধ্যেই নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ়ভাবে দেখাতে ওমান উপকূল থেকে ২০ মাইল দূরের দুটি জাহাজে হামলার খবর আসে। ক্ষতিগ্রস্ত একটি ট্যাঙ্কারের ক্যাপ্টেনের দাবি, প্রথম হামলাটি হয়েছে ইরানের সশস্ত্র গানবোট থেকে। এই ঘটনা শুধু উত্তেজনা বাড়ায়নি, বরং একটি বড় বার্তাও দিয়েছে—সংকট এখন আর কেবল বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বাস্তব সমুদ্রপথের নিরাপত্তাকেও সরাসরি প্রভাবিত করছে।
এদিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শত্রুদের পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ দিতে ইরানের নৌবাহিনী প্রস্তুত। এই ভাষা আক্রমণাত্মক, প্রতীকী এবং রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এর অর্থ হলো, ইরান আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করতে চাইছে না, কিন্তু একই সঙ্গে দুর্বলতার ছাপও দিতে রাজি নয়। বিপরীতে ট্রাম্পও স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের ব্ল্যাকমেইল বা হুমকির কাছে নতি স্বীকার করবে না। তবে একই সঙ্গে তিনি আবারও জানিয়েছেন, আলোচনার প্রস্তুতি এগোচ্ছে। অর্থাৎ, দুই পক্ষের বক্তব্যে একসঙ্গে দুটি সুর শোনা যাচ্ছে—একটি সংঘাতের, অন্যটি সমঝোতার।
এই দ্বৈত সুরই বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে জটিল অংশ। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, দুই পক্ষই যেন একই সঙ্গে যুদ্ধও চায়, আবার আলোচনাও চায়। বাস্তবে বিষয়টি আরও সূক্ষ্ম। উভয় পক্ষই সম্ভবত আলোচনায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে সামরিক চাপ, অবরোধ, হুঁশিয়ারি এবং কৌশলগত বার্তার মাধ্যমে। কিন্তু এমন খেলায় ঝুঁকিও অনেক। কারণ ভুল হিসাব, ভুল বার্তা, বা ভুল বোঝাবুঝি খুব দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
দ্বিতীয় দফা আলোচনায় বসার তৎপরতা এখনো আশার শেষ রেখা হয়ে আছে। ইরানের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করছে। ইরানি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহে দ্বিতীয় দফা আলোচনার আশা করা হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তা নিশ্চিত করেনি। এর অর্থ হলো, কথোপকথনের পথ পুরোপুরি বন্ধ নয়, কিন্তু সেটি এখনো নিশ্চিতও নয়। আর এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই আগামী মঙ্গলবার, অর্থাৎ ২১ এপ্রিল, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা।
এই সময়সীমা পুরো সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, মেয়াদ বাড়ানো হবে কি না, তা তিনি জানেন না। গত শুক্রবার তিনি বলেছিলেন, তিনি হয়তো মেয়াদ বাড়াবেন না; সে ক্ষেত্রে অবরোধ বহাল থাকবে, এবং দুর্ভাগ্যবশত আবারও বোমা বর্ষণ শুরু হতে পারে। এই বক্তব্য কূটনৈতিক ভাষার চেয়ে অনেক বেশি চাপ সৃষ্টিকারী ভাষা। এর লক্ষ্য সম্ভবত ইরানকে দ্রুত সিদ্ধান্তে ঠেলে দেওয়া। কিন্তু অন্যদিকে ইরানের প্রতিক্রিয়াও দেখাচ্ছে, তেহরান এখন পিছু হটার অবস্থানে নেই।
শনিবার দেশটির শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল মোহাম্মদ নাকদি বলেন, যুদ্ধ আবার শুরু হলে তারা মে মাসে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করবে। অর্থাৎ, নতুন প্রযুক্তির, সর্বাধুনিক সক্ষমতার অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইরান চাইলে তেল উৎপাদন বন্ধ করে দিতে পারে, কিন্তু বিশ্বজুড়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে চায় না বলেই এত দিন ধৈর্য ধরেছে। এই বক্তব্যের মধ্যে দুটি বার্তা আছে। প্রথমত, ইরান দেখাতে চাইছে যে তাদের হাতে এখনো বড় ধরনের প্রতিশোধমূলক সামর্থ্য রয়েছে। দ্বিতীয়ত, তারা নিজেদের এমনভাবে তুলে ধরতে চাইছে যেন এখনো তারা সংযম দেখাচ্ছে, যদিও চাইলে পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পারত।
ওয়াশিংটনের দিকেও সমান তৎপরতার ইঙ্গিত মিলছে। শনিবার বিকেলে জরুরিভিত্তিতে হোয়াইট হাউসে শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তাদের উপস্থিতি দেখিয়েছে, পরিস্থিতিকে যুক্তরাষ্ট্রও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইনের উপস্থিতি স্পষ্ট করে যে বিষয়টি শুধু কূটনৈতিক আলোচনার স্তরে নেই; সামরিক এবং গোয়েন্দা মূল্যায়নও সমান্তরালে চলছে।
সব মিলিয়ে এখন হরমুজ প্রণালির প্রশ্নটি আর শুধু জাহাজ চলাচল চালু বা বন্ধ থাকার প্রশ্ন নয়। এটি হয়ে উঠেছে আস্থা ও অবিশ্বাসের লড়াই, অবরোধ ও প্রতিরোধের লড়াই, আর একই সঙ্গে আলোচনার টেবিল ও যুদ্ধের ময়দানের মধ্যকার টানাপোড়েনের প্রতীক। গত ২৪ ঘণ্টায় দৃশ্যপট যেভাবে উল্টে গেছে, তাতে স্পষ্ট—এখানে একটি বিবৃতি বাজারে স্বস্তি আনতে পারে, আবার আরেকটি বিবৃতি মুহূর্তে সেই স্বস্তিকে উড়িয়ে দিতে পারে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—আগামী কয়েক দিন কোন দিকে যাবে পরিস্থিতি? যদি দ্বিতীয় দফা আলোচনা দ্রুত শুরু হয় এবং উভয় পক্ষ অন্তত অস্থায়ীভাবে উত্তেজনা কমাতে রাজি হয়, তবে সংকট কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। কিন্তু যদি যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ২১ এপ্রিল শেষ হওয়ার পরও অবরোধ, পাল্টা হুঁশিয়ারি এবং সামুদ্রিক হামলার ধারা অব্যাহত থাকে, তাহলে হরমুজ প্রণালি আবারও পুরো বিশ্বকে নতুন অস্থিরতার মুখে ঠেলে দিতে পারে।
এই মুহূর্তে তাই হরমুজের জলপথ শুধু জাহাজের পথ নয়, এটি হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ, বিশ্ব তেলের বাজার, এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর পরীক্ষাক্ষেত্র। গত ২৪ ঘণ্টার ঘটনাপ্রবাহ অন্তত সেটাই প্রমাণ করেছে।

