আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক ২০২৬ প্রতিবেদনে বৈশ্বিক অর্থনীতির র্যাঙ্কিংয়ে ভারতের অবস্থান পরিবর্তন নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ২০২৪ সালে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি থাকলেও ২০২৫ ও ২০২৬ সালে দেশটি এক ধাপ পিছিয়ে ষষ্ঠ স্থানে নেমে এসেছে। এই পরিবর্তনের ফলে পঞ্চম অবস্থানে উঠে এসেছে যুক্তরাজ্য।
র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে পড়ার কারণ কী:
ভারতের অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখলেও র্যাঙ্কিংয়ে এই পরিবর্তনের পেছনে মূলত দুটি কারণকে চিহ্নিত করেছে আইএমএফ। প্রথমত, মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির দ্রুত অবমূল্যায়ন এবং দ্বিতীয়ত, জিডিপি হিসাবের জন্য নতুন ভিত্তিবছর নির্ধারণ।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ডলারের বিপরীতে রুপির গড় মান ছিল ৮৪.৬, যা গত বছরে কমে দাঁড়িয়েছে ৮৮.৪৮-এ। চলতি বছরে এটি আরও কমে ৯২.৫৯ পর্যন্ত নেমে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে ব্রিটিশ পাউন্ড তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে থাকায় যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির ডলারে মূল্যমান বেড়েছে, যা তাদের র্যাঙ্কিং উন্নত করতে সহায়তা করেছে।
নতুন জিডিপি হিসাবের প্রভাব:
ভারত ২০২২-২৩ অর্থবছরকে ভিত্তিবছর ধরে নতুন জিডিপি সিরিজ চালু করেছে। এর ফলে অর্থনীতির আকার আগের হিসাবের তুলনায় কিছুটা কম দেখাচ্ছে। ২০২৫ অর্থবছরে নতুন সিরিজ অনুযায়ী জিডিপি আগের হিসাবের চেয়ে ৩.৮ শতাংশ কম ছিল। একই প্রবণতা ২০২৪ অর্থবছরেও দেখা গেছে।
নতুন হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ অর্থবছরে ভারতের নামমাত্র জিডিপি ছিল ২৮৯.৮৩ ট্রিলিয়ন রুপি, যেখানে পুরোনো সিরিজে তা ছিল ৩০১.২ ট্রিলিয়ন রুপি। ২০২৫ অর্থবছরে এটি আরও কমে ২৬১.১৭ ট্রিলিয়ন রুপি নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের তুলনায় ২.৯ শতাংশ কম।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারতের অর্থনীতির আকার দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪.১৫ ট্রিলিয়ন ডলারে। ২০২৭ সালে এটি বেড়ে ৪.৫৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে দেশটি আবারও পঞ্চম স্থানে ফিরতে পারে। আরও দীর্ঘমেয়াদে, ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করে জাপান ও যুক্তরাজ্যকে ছাড়িয়ে চতুর্থ অবস্থানে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এমনকি ২০৩১ সালে ৬.৭৯ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি নিয়ে ভারত তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
র্যাঙ্কিংয়ে পরিবর্তন হলেও ভারত এখনও বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল বড় অর্থনীতিগুলোর একটি। ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৭.৬ শতাংশ এবং ২০২৭ অর্থবছরে ৬.৯ শতাংশ। অন্যদিকে আইএমএফ কিছুটা সংযত পূর্বাভাস দিয়ে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা জানিয়েছে।
নতুন ভিত্তিবছর ধরে হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে ভারতের জিডিপি দাঁড়াতে পারে ৩৪৫.৪৭ ট্রিলিয়ন রুপি এবং ২০২৭ অর্থবছরে ৩১৮.০৭ ট্রিলিয়ন রুপি। এই নতুন সিরিজে অর্থনীতির আকার আগের তুলনায় কিছুটা কম প্রতিফলিত হচ্ছে।
ভারতের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ভি অনন্ত নাগেশ্বরন জানিয়েছেন, বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৭ অর্থবছরে দেশটির অর্থনীতি ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করতে পারে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির তালিকায় ভারতের অবস্থান এবং সময় নির্ভর করবে বিনিময় হার ও অন্যান্য দেশের প্রবৃদ্ধির গতির ওপর।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই র্যাঙ্কিং পরিবর্তনকে অতিরিক্ত উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। তাদের যুক্তি, ডলারের হিসাবে আকার কিছুটা কমলেও ভারতের অর্থনীতির ভিত্তি এখনো শক্তিশালী। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, রুপির দ্রুত অবমূল্যায়ন দীর্ঘমেয়াদে কিছু চাপ তৈরি করতে পারে।
ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা জানিয়েছেন, ২০২৫-২৬ সালে রুপির অবমূল্যায়ন আগের বছরের তুলনায় বেশি হয়েছে। বৈশ্বিক ডলার অস্থিরতা ও মূলধন প্রবাহের ওঠানামা বিবেচনায় নিয়ে প্রতি ডলারের মান ৯৪ রুপি ধরা হয়েছে, যা আগে ছিল ৮৮ রুপি।
আইএমএফের মতে, ভবিষ্যতে ভারতের অবস্থান আবার পরিবর্তিত হতে পারে। অন্যান্য দেশের প্রবৃদ্ধি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিশেষ করে ডলার–রুপি বিনিময় হার র্যাঙ্কিং নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। রুপির অবমূল্যায়ন যদি অব্যাহত থাকে, তবে ডলারের হিসাবে ভারতের অর্থনীতির আকার আরও কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

