মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা শুধু সামরিক নয়, বরং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এক ধরনের ‘নীরব যুদ্ধ’ তৈরি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন—তার মতে, তেহরানের হাতে এখনো এমন কিছু কৌশলগত ‘কার্ড’ রয়েছে, যা পুরোপুরি ব্যবহার করা হয়নি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে তার বেশ কিছু শক্তি প্রয়োগ করে ফেলেছে।
রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিশ্লেষণে তিনি মূলত একটি অর্থনৈতিক সমীকরণ তুলে ধরেন। এই সমীকরণের একদিকে রয়েছে ইরানের সরবরাহভিত্তিক শক্তি, আর অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদাভিত্তিক কৌশল। গালিবাফের যুক্তি অনুযায়ী, এই দুই শক্তির ভারসাম্যই ভবিষ্যতের জ্বালানি রাজনীতির দিক নির্ধারণ করবে।
ইরানের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন কৌশলগত সমুদ্রপথগুলোকে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি, বাব এল-মান্দেব প্রণালি এবং আঞ্চলিক তেলের পাইপলাইন নেটওয়ার্ক—যেগুলো বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, এসব ‘কার্ড’ এখনো পুরোপুরি ব্যবহার করা হয়নি, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে ব্যবহৃত হলেও অন্য গুরুত্বপূর্ণ পথগুলো এখনো কার্যত অক্ষত রয়েছে। অর্থাৎ, প্রয়োজনে ইরান চাইলে সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলকে তিনি ‘চাহিদাভিত্তিক’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এর মধ্যে রয়েছে কৌশলগত তেল মজুত থেকে সরবরাহ বাড়ানো, বাজারে চাহিদা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এবং দামের সমন্বয়। তবে গালিবাফের দাবি, এসব পদক্ষেপ ইতিমধ্যেই আংশিক বা পুরোপুরি ব্যবহার হয়ে গেছে, ফলে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নতুন চাপ প্রয়োগের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত।
এই বিশ্লেষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও তুলে ধরা হয়—যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি চাহিদা। গ্রীষ্মকালীন ছুটির মৌসুমে দেশটিতে জ্বালানির চাহিদা বাড়ে, যা তাদের অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণ বা সরবরাহ নিশ্চিত করা তাদের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য কেবল একটি রাজনৈতিক বার্তা নয়, বরং একটি কৌশলগত সতর্কবার্তা। ইরান বোঝাতে চাইছে, তারা এখনো সব শক্তি প্রয়োগ করেনি এবং প্রয়োজন হলে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সব মিলিয়ে, এটি স্পষ্ট যে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই—এটি রূপ নিয়েছে জ্বালানি, অর্থনীতি ও কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের এক জটিল প্রতিযোগিতায়। আর সেই প্রতিযোগিতায় কে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে থাকবে, তা নির্ভর করবে কে কতটা দক্ষভাবে নিজেদের ‘কার্ড’ ব্যবহার করতে পারে তার ওপর।

