পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় ধরনের পালাবদল ঘটেছে। দীর্ঘদিন ধরে যে রাজ্য তৃণমূল কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল, সেখানে এবার প্রথমবারের মতো একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পথে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় সোমবার রাত পর্যন্ত পাওয়া ফলাফলে বিজেপি ২০৬টি আসনে জয় পেয়েছে।
অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেস জয় পেয়েছে ৭৮টি আসনে এবং আরও তিনটি আসনে এগিয়ে ছিল। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৪৮ আসন। ফলে এই ফল শুধু সংখ্যার দিক থেকে বড় নয়, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসেও এটি এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। মূল প্রতিবেদনের তথ্যের সঙ্গে নির্বাচন কমিশন ও ভারতীয় গণমাধ্যমের ফলাফলও বিজেপির ২০৬ আসন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভবানীপুরে পরাজয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
এই নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের আসন ভবানীপুরে পরাজয়। বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর কাছে তাঁর হার তৃণমূলের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা। ভবানীপুর বহু বছর ধরে মমতার নিরাপদ আসন হিসেবে দেখা হতো। তাই এই আসনে তাঁর পরাজয় শুধু একজন প্রার্থীর হার নয়; এটি তৃণমূলের সাংগঠনিক দুর্বলতা, ভোটভিত্তির পরিবর্তন এবং বিজেপির নির্বাচনী কৌশলের সাফল্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে। নির্বাচন কমিশনের ফলাফলে ভবানীপুরে শুভেন্দু অধিকারী ৭৩,৯১৭ ভোট পেয়ে জয়ী হন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পান ৫৮,৮১২ ভোট। ব্যবধান ছিল ১৫,১০৫ ভোট।
ফলাফল ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের ধন্যবাদ জানান। তিনি এ জয়কে জনগণের রায় হিসেবে তুলে ধরেন এবং রাজ্যের উন্নয়নে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন। বিজেপি নেতৃত্বের বক্তব্যে এই বিজয়কে শুধু একটি রাজ্য জয়ের ঘটনা হিসেবে নয়, বরং পূর্ব ভারতে দলের প্রভাব বিস্তারের বড় ধাপ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, অন্তত ১০০ আসনে অনিয়ম হয়েছে। তাই ফলাফল ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি।
ভোট গণনা শুরু হয় সোমবার সকাল ৮টায়। রাজ্যজুড়ে ৭৭টি গণনাকেন্দ্রে ভোট গণনা করা হয়। শুরুতে তৃণমূল ও বিজেপির ব্যবধান খুব বেশি ছিল না। কিন্তু সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিজেপির আসনসংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ফলাফল এমন জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে বিজেপির সরকার গঠন প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়। সিপিএম একটি এবং কংগ্রেস দুটি আসনে জয় পেয়েছে। কয়েকটি আসনে স্বতন্ত্র বা অন্য দলের প্রার্থীরা এগিয়ে ছিলেন। চব্বিশ পরগনার ফলতা আসনে ভোট গণনা হয়নি; সেখানে পুনর্নির্বাচন হবে।
এই নির্বাচনের পেছনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন। বিরোধীদের অভিযোগ, এই সংশোধনের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী বিবেচনাধীনসহ প্রায় এক কোটি ভোটার বাদ পড়েন। আবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে ভোটার তালিকা সংশোধনকে বিতর্কিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং সংখ্যালঘু ভোটারদের ওপর এর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সরকার ও বিজেপি অবশ্য এমন অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রভাব বেশি পড়েছে বলে বিবেচিত ৯৪টি আসনে তৃণমূল বড় ধাক্কা খেয়েছে। ২০২১ সালে এসব এলাকায় তৃণমূল পেয়েছিল ৭২টি আসন। এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩০টিতে। অন্যদিকে বিজেপি গত নির্বাচনের ২২ আসন থেকে বেড়ে ৬৩ আসনে পৌঁছেছে। এই পরিবর্তন দেখায়, ভোটার তালিকা সংশোধন শুধু প্রশাসনিক বিষয় ছিল না; এটি সরাসরি নির্বাচনী ফলাফলেও বড় প্রভাব ফেলেছে বলে বিরোধীরা দাবি করার সুযোগ পাচ্ছে।
মুসলিম অধ্যুষিত আসনগুলোতেও এবার বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম ভোট দীর্ঘদিন তৃণমূলের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। রাজ্যের ২৯৪ আসনের মধ্যে ৫৪টি আসন মুসলিম অধ্যুষিত হিসেবে ধরা হচ্ছে। ২০২১ সালে এসব আসনে তৃণমূলের অবস্থান ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু এবার তৃণমূল এসব অঞ্চলে আগের তুলনায় পিছিয়েছে। বিজেপি এখানে ২০২১ সালের ১টি আসন থেকে এবার ১২টি আসনে পৌঁছেছে। তৃণমূলের আসন কমে ৫২ থেকে ৩৬ হয়েছে। এটি তৃণমূলের জন্য বড় সতর্কবার্তা।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলও এবারের ফলাফলে বড় ভূমিকা রেখেছে। পশ্চিমবঙ্গের এই অঞ্চলের ১১৯টি আসনের মধ্যে বিজেপি ১০২টিতে এগিয়ে ছিল। তৃণমূল এগিয়ে ছিল মাত্র ১৭টিতে। এই অঞ্চলেই মূল ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এর অর্থ হলো, বিজেপির জয় শুধু শহরকেন্দ্রিক বা সীমান্তকেন্দ্রিক ছিল না; বরং রাজ্যের বড় ভৌগোলিক অঞ্চলে দলটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
মতুয়া ভোটব্যাংকও বিজেপির পক্ষে স্থিতিশীল থেকেছে। মতুয়া অধ্যুষিত ১১টি আসনের মধ্যে বিজেপি আগের মতোই ১০টি আসন ধরে রেখেছে। পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৭ শতাংশ মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ। নাগরিকত্ব, পরিচয়, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে এই সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিজেপি এই ভোটভিত্তি ধরে রাখতে পেরেছে, যা তাদের সামগ্রিক ফলাফলে সহায়ক হয়েছে।
তৃণমূলের পরাজয়ের আরেকটি বড় কারণ হিসেবে নারী নিরাপত্তা ইস্যুকে সামনে আনা হচ্ছে। গত এক দশকে তৃণমূল নারী ভোটারদের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প চালু করেছিল। কন্যাশ্রীসহ নানা কর্মসূচি মমতার নারী ভোটভিত্তি গঠনে সাহায্য করেছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বিজেপি নারীর নিরাপত্তাকে বড় রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। বিশেষ করে আরজি কর মেডিকেল কলেজে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাটি প্রচারে গুরুত্ব পেয়েছে। বিজেপি নারীদের জন্য মাসিক আর্থিক সহায়তা, বাসে বিনামূল্যে যাতায়াত, সরকারি চাকরিতে ৩৩ শতাংশ কোটা এবং আলাদা নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতি নারী ভোটারদের একটি অংশকে প্রভাবিত করেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির বিরুদ্ধে ‘বহিরাগত’ তত্ত্ব ব্যবহার করেছেন। তাঁর দল দাবি করত, বিজেপি বাংলার সংস্কৃতি, ভাষা ও খাদ্যাভ্যাস বোঝে না। এমনকি বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাঙালির জীবনযাপনে হস্তক্ষেপ করতে পারে—এমন প্রচারণাও ছিল। তবে বিজেপি এবার এই অভিযোগ মোকাবিলায় ভিন্ন কৌশল নেয়। দলের নেতারা বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা দেখাতে চেষ্টা করেন। মাছ, ঝালমুড়ি, মন্দির, স্থানীয় উৎসব—এসব প্রতীককে নির্বাচনী প্রচারে ব্যবহার করা হয়। এতে বিজেপি একটি বার্তা দিতে চেয়েছে যে তারা বাংলার সংস্কৃতির বিরোধী নয়, বরং তার অংশ হতে চায়।
ভবানীপুরে শুভেন্দু অধিকারীকে প্রার্থী করা বিজেপির বড় কৌশলগত পদক্ষেপ ছিল। শুভেন্দু একসময় মমতার ঘনিষ্ঠ নেতা ছিলেন। পরে দল বদলে বিজেপিতে যোগ দেন। তাঁকে মমতার নিজের আসনে দাঁড় করিয়ে বিজেপি মমতাকে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে ঠেলে দেয়। এর ফলে মমতাকে নিজের আসন রক্ষায় বেশি সময় দিতে হয়েছে। এতে রাজ্যের অন্য আসনে প্রচারণায় তাঁর সময় ও শক্তি কমে গেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাও এবারের বিপর্যয়ের পেছনে কাজ করেছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে দলের ভেতরে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষোভ, দুর্নীতির অভিযোগ, প্রার্থী নিয়ে অসন্তোষ এবং প্রশাসনিক ক্লান্তি তৈরি হয়েছিল। অনেক এলাকায় তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ জমা ছিল। বিজেপি সেই ক্ষোভকে সংগঠিত ভোটে রূপ দিতে পেরেছে।
ফলাফল প্রকাশের পর রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় উত্তেজনা ছড়িয়েছে। কোথাও তৃণমূল প্রার্থীর ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে, কোথাও দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের খবর এসেছে। ব্যারাকপুর, বর্ধমান, কাঁথি, জামুরিয়া ও বারাবনিসহ বেশ কিছু এলাকায় সহিংসতার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তৃণমূল নেতারা অভিযোগ করেছেন, তাঁদের কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা হচ্ছে এবং পুলিশ যথাযথ সহযোগিতা করছে না। অন্যদিকে বিজেপি শিবিরে বিজয় উৎসব দেখা গেছে কলকাতা থেকে জেলা শহর পর্যন্ত।
এই ফলাফলের আরেকটি তাৎপর্য হলো, প্রায় ৫০ বছর পর পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার আসতে যাচ্ছে। স্বাধীনতার পর কংগ্রেস আমলে একসময় এমন অবস্থা ছিল। এরপর যুক্তফ্রন্ট, বামফ্রন্ট এবং তৃণমূল দীর্ঘ সময় রাজ্য শাসন করেছে। এবার বিজেপির জয়ের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত হলো। কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকারের একই রাজনৈতিক নেতৃত্ব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সুবিধা দেবে—এমন দাবি করছে বিজেপি। তবে বিরোধীদের আশঙ্কা, এতে কেন্দ্রীয় প্রভাব রাজ্যের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক চরিত্রকে চাপে ফেলতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি অন্য রাজ্যগুলোর ফলও ভারতের রাজনীতিতে নতুন বার্তা দিয়েছে। আসামে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট ১২৬ আসনের মধ্যে ৯২টিতে জয় পেয়েছে। কংগ্রেস পেয়েছে ২১টি আসন, এআইইউডিএফ পেয়েছে ২টি এবং অন্যরা ১১টি আসনে জয়ী হয়েছে। তামিলনাড়ুতে অভিনেতা থালাপতি বিজয়ের দল প্রথম নির্বাচনে বড় সাফল্য পেয়েছে। ২৩৪ আসনের মধ্যে তাঁর দল ১০৭টি আসনে জয়ী হয়েছে। ডিএমকে পেয়েছে ৭৩টি এবং এআইডিএমকে পেয়েছে ৫৩টি আসন। কেরালায় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট ১৪০ আসনের মধ্যে ৯৭টি আসনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় ফেরার পথে। পদুচেরিতে ৩০ আসনের মধ্যে ১৭টিতে জয় পেয়েছে এনডিএ জোট। ভারতীয় গণমাধ্যমের ফলাফল হালনাগাদেও এসব রাজ্যে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের কথা উঠে এসেছে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়। এটি ভোটার আচরণ, পরিচয় রাজনীতি, নিরাপত্তা ইস্যু, সাংগঠনিক কৌশল এবং দীর্ঘমেয়াদি শাসনের বিরুদ্ধে জমে থাকা অসন্তোষের সম্মিলিত ফল। তৃণমূলের জন্য এই ফল আত্মসমালোচনার বড় সুযোগ। আর বিজেপির জন্য এটি ঐতিহাসিক বিজয় হলেও সামনে চ্যালেঞ্জ কম নয়। কারণ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আবেগ, সংস্কৃতি, ভাষা, পরিচয় ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার জটিল মিশ্রণ। তাই সরকার গঠন করা যতটা বড় সাফল্য, সেই জনরায় ধরে রাখা তার চেয়েও কঠিন পরীক্ষা হবে।
সিভি/এইচএম

