মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির উত্থান এখন আর শুধু একটি আঞ্চলিক বিদ্রোহী আন্দোলনের গল্প নয়। এটি ধীরে ধীরে এমন এক রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে, যেখানে যুদ্ধ, প্রশাসন, জনসমর্থন এবং ভূরাজনৈতিক হিসাব একসঙ্গে কাজ করছে। সাম্প্রতিক দুটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্ব যে বক্তব্য দিয়েছে, তাতে স্পষ্ট হয়েছে—আরাকান আর্মি আপাতত অস্ত্র নামানোর পথে হাঁটছে না। বরং তারা যুদ্ধের ময়দান ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ—দুই ক্ষেত্রেই নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে চায়।
১০ এপ্রিল সংগঠনটির ১৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় প্রধান কমান্ডার তুন মিয়াত নাইং তাদের পুরোনো কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ স্লোগান আবার সামনে আনেন—“লড়াই করতে করতে গড়ে তোলা, আর গড়তে গড়তেই লড়াই।” এই বাক্যটি শুধু একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি আরাকান আর্মির বর্তমান পথচলার সারাংশ। তারা একদিকে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছে, অন্যদিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রশাসনিক কাঠামো, শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, আরাকান আর্মি কেবল সামরিক জয় চায় না। তারা রাখাইন অঞ্চলে বাস্তব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে চাইছে। অর্থাৎ তাদের কাছে যুদ্ধ এবং রাষ্ট্রগঠন আলাদা বিষয় নয়; বরং একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। যেখানে তারা সামরিকভাবে শক্তিশালী হচ্ছে, সেখানে প্রশাসনিক ব্যবস্থাও গড়ে তুলছে। আবার যেখানে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে, সেখানে সামরিক শক্তিও আরও দৃঢ় হচ্ছে।
সংগঠনটির উপপ্রধান কমান্ডার নিও তুন আউংও একই ধরনের বার্তা দিয়েছেন। পার্শ্ববর্তী রাজ্যের মিত্র সংগঠন অন্তর্বর্তী চিন জাতীয় পরামর্শ পরিষদের পঞ্চম বার্ষিকীতে তিনি বলেন, জনগণের মুক্তির জন্য শক্তিশালী সেনাবাহিনী থাকা জরুরি। এই বক্তব্য আরাকান আর্মির রাজনৈতিক চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। তারা মনে করে, নিজেদের জনগোষ্ঠী ও ভূখণ্ড রক্ষার জন্য শুধু রাজনৈতিক দাবি যথেষ্ট নয়; এর পেছনে শক্তিশালী সশস্ত্র সক্ষমতাও থাকতে হবে।
যদিও আরাকান আর্মি এখনও ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের অংশ, তাদের অবস্থান ধীরে ধীরে উত্তর শান রাজ্যের কিছু মিত্র সংগঠনের পথ থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। কারণ রাখাইনের বাস্তবতা ভিন্ন। উত্তর শান রাজ্যের অনেক সংগঠনের ওপর চীনের প্রভাব তুলনামূলক বেশি। কিন্তু আরাকান আর্মির কার্যক্রম চীন সীমান্ত থেকে দূরে। ফলে বেইজিং সরাসরি তাদের ওপর সামরিক চাপ তৈরি করতে পারে না। এটাই আরাকান আর্মির জন্য বড় কৌশলগত সুবিধা।
চীন মিয়ানমারের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হলেও রাখাইনে তার প্রভাব সীমাহীন নয়। বিশেষ করে আরাকান আর্মির ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা চীনের জন্য সহজ নয়। এই কারণেই তারা অন্য কিছু জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনের তুলনায় বেশি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। চীনের অনুরোধে তারা আলোচনায় বসতে পারে, কিন্তু সেই আলোচনা থেকে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতি হবে—এমন সম্ভাবনা খুব শক্তিশালী নয়।
এর বড় কারণ হলো, আরাকান আর্মির প্রধান লক্ষ্য এখনও পূর্ণ হয়নি। রাখাইনের গুরুত্বপূর্ণ শহর সিত্তে, কিয়াউকফিউ এবং মানাউং দ্বীপ এখনও সামরিক জান্তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই এলাকাগুলো শুধু প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে না; এগুলোর সামরিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বও অনেক। সিত্তে রাখাইনের কেন্দ্রীয় শহর হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। কিয়াউকফিউ কৌশলগতভাবে আরও সংবেদনশীল, কারণ এটি সমুদ্রবন্দর ও আঞ্চলিক বাণিজ্যিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। তাই এসব এলাকা নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত আরাকান আর্মির জন্য লড়াই থামানো কঠিন।
বর্তমানে আরাকান আর্মি শুধু ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের ভেতরেই নয়, পুরো মিয়ানমারের জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলোর মধ্যেও অন্যতম শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে উঠে এসেছে। তাদের যোদ্ধা সংখ্যা ৫০ হাজারের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়। এই সামরিক শক্তি তাদের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়িয়েছে। শুধু তা-ই নয়, তাদের পেছনে বড় ধরনের জনসমর্থনও রয়েছে।
রাখাইন জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও আরাকান আর্মির শক্তির একটি বড় ভিত্তি। যেখানে কোকাং বা তা’আং জনগোষ্ঠীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম, সেখানে রাখাইনের জনসংখ্যা প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ। এই বড় জনভিত্তি আরাকান আর্মিকে শুধু যোদ্ধা সংগ্রহে নয়, প্রশাসনিক বৈধতা তৈরিতেও সহায়তা করছে। একটি সশস্ত্র সংগঠন তখনই দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে, যখন তার পেছনে সামাজিক সমর্থন, রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ থাকে। আরাকান আর্মি এই তিন ক্ষেত্রেই এগিয়ে আছে।
ভূগোলও তাদের পক্ষে কাজ করছে। রাখাইন রাজ্যের সমুদ্রপথে সংযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে। এই অবস্থান আরাকান আর্মিকে কৌশলগত সুবিধা দেয়। অন্যদিকে এমএনডিএএ ও টিএনএলএ অনেকটাই ভূমিবেষ্টিত এবং চীনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্তে বাইরের চাপ বেশি কাজ করে। কিন্তু আরাকান আর্মি তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাধীন কৌশল নিতে পারে।
তবে এই শক্তির মধ্যেও একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আরাকান আর্মিসহ মিয়ানমারের অনেক জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনের লক্ষ্য মূলত নিজ নিজ অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে। তারা সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে লড়াই করলেও এখনও পুরো মিয়ানমারের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পারেনি। দ্য ইরাবতীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তুন মিয়াত নাইং নিজেও স্বীকার করেছেন, আরাকান আর্মি এখনও জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়।
এই স্বীকারোক্তি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দেখায়, আরাকান আর্মি নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝে। তারা এখন রাখাইনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ, সামরিক ক্ষমতা ও প্রশাসনিক কাঠামোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। জাতীয় রাজনীতিতে বড় ভূমিকা নেওয়ার আগে তারা নিজেদের ঘাঁটি আরও শক্ত করতে চায়। এই বাস্তববাদী অবস্থান তাদের কৌশলকে আরও দীর্ঘমেয়াদি করে তুলেছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, আরাকান আর্মির লড়াই দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাদের সামনে এখনও অসম্পূর্ণ সামরিক লক্ষ্য আছে। গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো জান্তার হাতে রয়েছে। তাদের জনসমর্থন শক্তিশালী, যোদ্ধা সংখ্যা বড়, ভৌগোলিক অবস্থান সুবিধাজনক এবং চীনের সরাসরি চাপ তুলনামূলকভাবে সীমিত। এসব কারণ মিলিয়ে তারা এখন এমন অবস্থানে আছে, যেখানে যুদ্ধবিরতি তাদের জন্য লাভজনক না-ও হতে পারে।
আরাকান আর্মির বর্তমান পথ তাই স্পষ্ট—তারা যুদ্ধের মধ্যেই প্রশাসন গড়বে, আর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়েই যুদ্ধের শক্তি বাড়াবে। রাখাইনের ভবিষ্যৎ রাজনীতি এই দ্বৈত কৌশলের ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তার জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ, আর আঞ্চলিক রাজনীতির জন্যও এটি এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
সিভি/এইচএম

