যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে জনসমর্থনের ওঠানামা নতুন কিছু নয়। কিন্তু কোনো প্রেসিডেন্ট যখন দীর্ঘ সময় ধরে জনপ্রিয়তার নিম্নস্তরে আটকে যান, তখন সেটি শুধু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সংকট নয়; বরং তার দল, নীতি এবং আসন্ন নির্বাচনের জন্যও বড় সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়ায়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান অবস্থাও ঠিক তেমন এক সংকটের দিকে ইঙ্গিত করছে।
সিএনএনের জরিপ-গড় অনুযায়ী ট্রাম্পের গড় অনুমোদন হার এখন ৩৫ শতাংশে নেমেছে। এই অবস্থান তাকে এমন এক রাজনৈতিক অঞ্চলে নিয়ে গেছে, যেখানে আধুনিক মার্কিন রাজনীতিতে খুব কম প্রেসিডেন্ট দীর্ঘ সময় অবস্থান করেছেন। জিমি কার্টারের পর জর্জ ডব্লিউ বুশই ছিলেন এমন প্রেসিডেন্ট, যিনি দীর্ঘ সময় ধরে মাঝামাঝি ৩০ শতাংশ বা তার নিচে জনসমর্থনের চাপে ছিলেন। এখন ট্রাম্পও সেই ঝুঁকিপূর্ণ পরিসরের খুব কাছে চলে এসেছেন।
এই পতন হঠাৎ করে হয়নি। ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর ১৫ মাসের বেশি সময় ধরে তার জনসমর্থন ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়েছে। শুরুতে তার অবস্থান তুলনামূলক শক্তিশালী ছিল। ২০২৫ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে কিছু জরিপে তার অনুমোদন ৫০ শতাংশের ওপরে দেখা যায়। কিন্তু সেই রাজনৈতিক মধুচন্দ্রিমা খুব অল্প সময়েই শেষ হয়ে যায়। ক্ষমতায় ফেরার পরপরই একের পর এক একতরফা সিদ্ধান্ত, বিতর্কিত ক্ষমা ঘোষণা এবং সরকারি কর্মী ও সেবায় কাটছাঁটের মতো পদক্ষেপ তাকে দ্রুত চাপের মুখে ফেলে।
প্রথম বড় ধাক্কা আসে প্রায় ক্ষমতায় বসার পরপরই। ৬ জানুয়ারি ২০২১ সালের ক্যাপিটল হামলার সঙ্গে যুক্ত প্রায় সব অভিযুক্তকে ক্ষমা করার সিদ্ধান্ত ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। বিশেষ করে যারা পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন, তাদের ক্ষেত্রেও ক্ষমা প্রদানের সিদ্ধান্ত অনেক ভোটারের কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সরকারি কর্মী ও সেবায় অগোছালো কাটছাঁট, যা ইলন মাস্কের নেতৃত্বে পরিচালিত সরকারি দক্ষতা বিভাগকে ঘিরে আরও বিতর্ক তৈরি করে।
এরপর আসে শুল্কনীতি। ২ এপ্রিল ট্রাম্প তার তথাকথিত বড় শুল্ক ঘোষণা দেন, যা কার্যত বিশ্বের অধিকাংশ দেশের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের দরজা খুলে দেয়। শুরুতে কিছু ভোটার শুল্কনীতির প্রতি আগ্রহী থাকলেও পরে তারা দ্রুত এর বিপক্ষে সরে যান। ঘোষণার সময় ট্রাম্পের গড় অনুমোদন ছিল ৪৫ শতাংশ। এক মাসের মধ্যে তা নেমে ৪১ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ বাণিজ্যনীতির এই কঠোর অবস্থান তার জনসমর্থনে সরাসরি আঘাত করে।
পরবর্তী প্রায় ছয় মাস পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও ভেতরে ভেতরে অসন্তোষ জমতে থাকে। কংগ্রেসে রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের আলোচিত এজেন্ডা বিল পাস করলেও সেটি সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায়নি। একই সময়ে বিচার বিভাগের এপস্টাইন-সংক্রান্ত নথি ব্যবস্থাপনা নিয়েও সমালোচনা তৈরি হয়। ২০২৫ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা নিউ জার্সি ও ভার্জিনিয়ার গভর্নর নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয় পায়। এই ফলাফল দেখিয়ে দেয়, ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের নিয়ে অস্বস্তি বাড়ছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে জানুয়ারিতে। অভিবাসনবিরোধী কঠোর অভিযানের অংশ হিসেবে মিনিয়াপোলিসে ফেডারেল এজেন্টদের হাতে রেনে গুড ও অ্যালেক্স প্রেট্টির নিহত হওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। প্রশাসন দ্রুত তাদের দায়ী করার চেষ্টা করে এবং এমনকি দেশীয় সন্ত্রাসবাদের ইঙ্গিতও দেয়। কিন্তু অধিকাংশ আমেরিকান সেই ব্যাখ্যা মেনে নেয়নি। যদিও এই ঘটনার পর ট্রাম্পের জনসমর্থন খুব বেশি কমেনি, তবে ধারণা করা হয়, প্রশাসন দ্রুত সবচেয়ে আক্রমণাত্মক কৌশল থেকে সরে আসে এবং নেতৃত্বে পরিবর্তন আনে বলেই বড় পতন ঠেকানো সম্ভব হয়।
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চাপের জায়গা হলো ইরান যুদ্ধ। শুক্রবার প্রকাশিত এক জরিপে দেখা যায়, ৬১ শতাংশ আমেরিকান এই যুদ্ধকে “ভুল” হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্পের সামগ্রিক অনুমোদন যুদ্ধ শুরুর সময়, অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ৩৮ শতাংশ ছিল। এখন তা ৩৫ শতাংশে নেমেছে। সংখ্যা হিসেবে পতন খুব বড় মনে না হলেও রাজনৈতিকভাবে এর প্রভাব গভীর। কারণ এই যুদ্ধ এমন কিছু ভোটারকেও নড়বড়ে করেছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পের প্রতি অটল ছিলেন।
ইরান যুদ্ধ শুধু পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনীতিকেও সরাসরি প্রভাবিত করছে। গ্যাসের দাম প্রতি গ্যালনে ৪ ডলারের ওপরে ওঠায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ আরও বেড়েছে। সিএনএনের জরিপে অর্থনীতি পরিচালনায় ট্রাম্পের অনুমোদন নেমে ৩১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা তার জন্য সর্বনিম্ন পর্যায়। জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়েও তার অবস্থান দুর্বল হয়েছে। বেশিরভাগ জরিপে দেখা যাচ্ছে, এই বিষয়ে ৭০ শতাংশ বা তার বেশি মানুষ তার ওপর অসন্তুষ্ট।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমার পেছনে একটি বড় কারণ হলো অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস। তিনি এমনভাবে শাসন করেছেন যেন তার হাতে বিপুল জনসমর্থনের ম্যান্ডেট রয়েছে। বাস্তবে তিনি জনপ্রিয় ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়, বরং বহুলাংশে বিভক্ত ভোটের ওপর দাঁড়িয়ে ক্ষমতায় ফিরেছিলেন। কিন্তু তার নীতি ও সিদ্ধান্তে সেই সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন খুব কম দেখা গেছে।
অভিবাসন নীতির ক্ষেত্রেও একই বিষয় দেখা যায়। অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কার বাড়ানোর মতো কিছু নীতি নির্দিষ্ট ভোটারগোষ্ঠীর কাছে জনপ্রিয় হতে পারত। কিন্তু যখন সেই নীতি অতিরিক্ত কঠোর অভিযানে রূপ নেয়, তখন অনেক আমেরিকানের কাছে তা সীমা ছাড়ানো বলে মনে হয়। মিনিয়াপোলিসের ঘটনা সেই সীমা অতিক্রমের প্রতীক হয়ে ওঠে।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও ট্রাম্প নিজের জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছেন। দ্রব্যমূল্য আগে থেকেই বেশি ছিল। সাধারণ মানুষ ব্যয় সংকটে ভুগছিল। এমন অবস্থায় বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ এবং পরে ইরান যুদ্ধ অর্থনৈতিক উদ্বেগকে আরও তীব্র করে তোলে। ফলে মানুষ তাদের আর্থিক কষ্টের সঙ্গে সরাসরি ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে যুক্ত করতে শুরু করে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো অগ্রাধিকারের প্রশ্ন। ভোটারদের একটি বড় অংশ মনে করে, ট্রাম্প দেশের সবচেয়ে জরুরি সমস্যাগুলোর দিকে যথেষ্ট মনোযোগ দেননি। মার্চের সিএনএন জরিপে ৬৫ শতাংশ আমেরিকান বলেন, দাম কমাতে ট্রাম্প যথেষ্ট পদক্ষেপ নেননি। সিবিএস নিউজ-ইউগভ জরিপেও দেখা যায়, চার ভাগের তিন ভাগ আমেরিকান মনে করেন তিনি মূল্য কমানোর বিষয়ে যথেষ্ট মনোযোগ দেননি।
যখন ট্রাম্প অর্থনীতি নিয়ে কথা বলেন, তখন অনেক সময় তাকে আগ্রহহীন বলে মনে হয়। অথচ সাধারণ মানুষের কাছে বাজারদর, জ্বালানি খরচ, বাড়িভাড়া ও দৈনন্দিন ব্যয়ই সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয়। এই জায়গায় স্পষ্ট বার্তা দিতে না পারলে কোনো প্রেসিডেন্টের জন্য জনসমর্থন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। মার্চের সিএনএন জরিপে ৬৭ শতাংশ আমেরিকান বলেন, ট্রাম্প দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোতে যথেষ্ট মনোযোগ দেননি।
পররাষ্ট্রনীতিতেও তার অবস্থান দুর্বল হয়েছে। প্রথম মেয়াদে শক্তিশালী অর্থনীতি ট্রাম্পের ভাবমূর্তিকে কিছুটা রক্ষা করেছিল। অনেকেই তাকে ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ না করলেও একজন ব্যবসায়ী হিসেবে দেশ পরিচালনায় সক্ষম মনে করতেন। কিন্তু এখন সেই ধারণা প্রশ্নের মুখে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে দেখা গেছে, পররাষ্ট্রনীতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে ট্রাম্পের প্রতি মানুষের আস্থা কমেছে। শুক্রবার প্রকাশিত নতুন জরিপে অন্তত ৬০ শতাংশ আমেরিকান জানান, নির্বাহী শাখা পরিচালনা, সামরিক শক্তি বিচক্ষণভাবে ব্যবহার, ভালো পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ এবং কংগ্রেসের সঙ্গে কার্যকরভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে তারা ট্রাম্পের ওপর আস্থা রাখেন না।
এখানেই সংকট শেষ নয়। ট্রাম্পের মানসিক স্থিরতা ও বয়সজনিত সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। সাম্প্রতিক কিছু কথাবার্তার ভুল ও অসংলগ্নতা এই প্রশ্নকে আরও সামনে এনেছে। একটি সাম্প্রতিক জরিপে ৬১ শতাংশ আমেরিকান এবং ৩০ শতাংশ রিপাবলিকানও একমত হন যে ট্রাম্প বয়সের সঙ্গে আরও অস্থির হয়ে উঠেছেন।
এখন প্রশ্ন হলো, প্রেসিডেন্টের অনুমোদন হার আসন্ন নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সাধারণত প্রেসিডেন্টের ওপর এক ধরনের গণভোট হিসেবে দেখা হয়। সব সময় এটি শতভাগ সত্য নয়। ২০২২ সালে জো বাইডেন অজনপ্রিয় থাকলেও নির্বাচন তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ হয়েছিল। তবে সাধারণ নিয়ম হলো, প্রেসিডেন্ট যত বেশি অজনপ্রিয় হন, তার দল তত বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে।
ইতিহাসও সেই কথাই বলে। আধুনিক সময়ে যেসব প্রেসিডেন্টের অনুমোদন ৫০ শতাংশের নিচে ছিল, তাদের দল অনেক সময় বড় ধাক্কা খেয়েছে। ১৯৪৬ সালে হ্যারি ট্রুম্যানের দল প্রতিনিধি পরিষদে ৫৫টি আসন হারায়। ১৯৬৬ সালে লিন্ডন জনসনের দল হারায় ৪৮টি আসন। ১৯৮২ সালে রোনাল্ড রিগ্যানের দল হারায় ২৬টি আসন। ১৯৯৪ সালে বিল ক্লিনটনের দল হারায় ৫৪টি আসন। ২০০৬ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশের দল হারায় ৩০টি আসন। ২০১০ সালে বারাক ওবামার দল হারায় ৬৪টি আসন। ২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে রিপাবলিকানরা হারায় ৪২টি আসন।
অন্যদিকে, যেসব প্রেসিডেন্টের অনুমোদন প্রায় ৬০ শতাংশ বা তার ওপরে ছিল, তাদের দল সাধারণত ১০টির কম আসন হারিয়েছে, কখনও কখনও বরং অবস্থান শক্তিশালী করেছে। তাই ৩৫ শতাংশ অনুমোদন নিয়ে ট্রাম্পের সামনে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন রাজনৈতিকভাবে খুব কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের সংকটকে শুধু একটি জরিপের সংখ্যা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এটি কয়েকটি বড় সমস্যার সমন্বিত ফল। একদিকে অর্থনৈতিক চাপ, অন্যদিকে শুল্কনীতি; একদিকে অভিবাসন অভিযানের কঠোরতা, অন্যদিকে ইরান যুদ্ধ; তার সঙ্গে যোগ হয়েছে অগ্রাধিকারের বিভ্রান্তি, নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ এবং ব্যক্তিগত স্থিরতা সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান প্রশ্ন।
রিপাবলিকান পার্টির জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, ট্রাম্পের অজনপ্রিয়তা এখন শুধু তার নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি দলের প্রার্থীদের ওপরও বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র ছয় মাস আগে এমন জনমত কোনো ক্ষমতাসীন দলের জন্য শুভ সংকেত নয়। ভোটাররা যদি অর্থনীতি, যুদ্ধ ও নেতৃত্বের প্রশ্নে একই মনোভাব ধরে রাখে, তাহলে ২০২৬ সালের নির্বাচন রিপাবলিকানদের জন্য কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।
ট্রাম্প এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে তার সবচেয়ে শক্তিশালী সমর্থনভিত্তিও কিছুটা নড়বড়ে হতে শুরু করেছে। অতীতে তিনি বহু বিতর্ক পেরিয়ে টিকে গেছেন। কিন্তু এবার সংকটটি আলাদা। কারণ এবার অভিযোগ শুধু তার ভাষা বা আচরণ নিয়ে নয়; অভিযোগ মানুষের পকেট, যুদ্ধের ভয়, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে। আর এই চারটি জায়গা একসঙ্গে দুর্বল হয়ে গেলে কোনো প্রেসিডেন্টের জন্য জনসমর্থন ফিরিয়ে আনা সহজ হয় না।
সিভি/এইচএম

