দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে তামিলনাড়ু সব সময়ই আলাদা এক বাস্তবতার নাম। এখানে ভাষা, সংস্কৃতি, আঞ্চলিক পরিচয়, চলচ্চিত্র আর রাজনীতি বহু দশক ধরে একে অপরের সঙ্গে মিশে আছে। সেই রাজ্যেই এবার বড় ধরনের রাজনৈতিক চমক দেখালেন জনপ্রিয় অভিনেতা থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা সি জোসেফ বিজয়, যিনি ভক্তদের কাছে থালাপতি বিজয় নামে পরিচিত।
তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে বিজয়ের দল তামিলাগা ভেট্টি কাজাগাম, সংক্ষেপে টিভিকে, এককভাবে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে এসেছে। দলটি পেয়েছে ১০৮টি আসন। রাজ্যে দীর্ঘদিনের দুই প্রভাবশালী শক্তি ডিএমকে ও এআইএডিএমকে—দু দলকেই পেছনে ফেলে বিজয়ের এই উত্থান শুধু নির্বাচনী ফল নয়, বরং তামিল রাজনীতির নতুন মোড় হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
তবে ক্ষমতায় বসার পথ এখনো পুরোপুরি মসৃণ নয়। তামিলনাড়ুতে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১১৮টি আসন। টিভিকে সেই লক্ষ্য থেকে ১০ আসন দূরে আছে। ফলে সংখ্যার বিচারে বিজয় রাজনীতির দৌড়ে এগিয়ে থাকলেও সরকার গঠনের জন্য তাকে এখন অন্য দলের সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ অবস্থায় বিজয়ের সামনে মূলত দুটি পথ খোলা। তিনি চাইলে ডিএমকে নেতৃত্বাধীন সেক্যুলার প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স, অর্থাৎ এসপিএ, অথবা এআইএডিএমকে নেতৃত্বাধীন এনডিএর সমর্থন চাইতে পারেন। আবার ছোট দল বা স্বতন্ত্র বিধায়কদের সমর্থন নিয়েও তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠতার অঙ্ক মেলানোর চেষ্টা করতে পারেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিজয়ানন্দের মতে, সাধারণ নিয়মে রাজ্যপাল একক বৃহত্তম দলকে সরকার গঠনের সুযোগ দেন। সেই হিসেবে ১০৮টি আসন পাওয়া টিভিকে প্রথম ডাক পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে আমন্ত্রণ পেলেই সরকার স্থায়ী হয়ে যাবে, এমন নয়। সরকার গঠনের পর বিধানসভায় আস্থা ভোটে বিজয়ী হতে হবে। সাধারণত সেই পরীক্ষা দিতে হয় ৭ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে। টিভিকে যদি সেখানে ব্যর্থ হয়, তাহলে রাজ্যপাল দ্বিতীয় বৃহত্তম জোটকে ডাকতে পারেন।
এর মধ্যেই টিভিকে জানিয়েছে, আগামীকালই শপথ নেবেন বিজয়। এই ঘোষণা রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ শপথের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে—সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণে বিজয় কাদের পাশে পাবেন?
শুধু তারকা-আলো নয়, দীর্ঘ প্রস্তুতির ফল
বিজয়ের এই সাফল্যকে কেবল চলচ্চিত্র জনপ্রিয়তার ফল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে তারকারা আগেও এসেছেন। কেউ সফল হয়েছেন, কেউ হারিয়ে গেছেন। কিন্তু বিজয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা, কারণ তার রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি ছিল।
বিজয় বহু বছর ধরে তামিল চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ। তার ভক্তসংখ্যা বিশাল, কিন্তু সেই ভক্তগোষ্ঠী শুধু সিনেমা হল, উৎসব বা প্রচারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার ভক্ত ক্লাবগুলো সামাজিক কাজে যুক্ত হতে শুরু করে। রক্তদান, দুর্যোগে সহায়তা, গরিব শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো, স্থানীয় সমস্যায় সহায়তা—এসব কাজের মাধ্যমে বিজয়ের ভক্তরা সমাজের ভেতরে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেন।
এই সামাজিক কাজগুলো দেখতে সাধারণ মনে হলেও রাজনৈতিক দৃষ্টিতে এগুলো ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে বিজয়ের নামে একটি বিশ্বাসভিত্তিক নেটওয়ার্ক তৈরি হয়। মানুষ তাকে শুধু পর্দার নায়ক হিসেবে নয়, বাস্তব জীবনে সহায়তার সঙ্গে যুক্ত এক মুখ হিসেবেও দেখতে শুরু করে।
ফ্যান ক্লাব থেকে তৃণমূল সংগঠন
বিজয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার তৃণমূলভিত্তি। অনেক তারকার জনপ্রিয়তা থাকে শহরকেন্দ্রিক বা বিনোদননির্ভর। কিন্তু বিজয়ের সমর্থকেরা গ্রাম, জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের সংগঠিত করে ফেলেছিল অনেক আগেই।
টিভিকে আনুষ্ঠানিকভাবে দল হিসেবে যাত্রা শুরুর আগেই বিভিন্ন এলাকায় সমন্বয় কমিটি গড়ে ওঠে। এসব কমিটি শুধু ভক্তদের একত্র করত না; তারা স্থানীয় সমস্যা, সামাজিক সহায়তা, জনসংযোগ এবং নেতৃত্ব তৈরির কাজও করত। ফলে দল ঘোষণা করার সময় বিজয়ের হাতে একেবারে শূন্য থেকে সংগঠন গড়ার প্রয়োজন হয়নি।
বরং বলা যায়, রাজনৈতিক দল গঠনের আগেই মাঠ প্রস্তুত ছিল। টিভিকে সেই প্রস্তুত মাঠে শুধু আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক রূপ দিয়েছে।
২০২১ সালের স্থানীয় নির্বাচন ছিল প্রথম পরীক্ষা
বিজয়ের রাজনৈতিক শক্তির প্রথম বাস্তব পরীক্ষা দেখা যায় ২০২১ সালের স্থানীয় নির্বাচনে। তখন তার আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল ছিল না। তবু তার সমর্থকেরা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেন এবং উল্লেখযোগ্য সাফল্য পান।
এই ফল অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের চোখ খুলে দেয়। কারণ তখন বোঝা যায়, বিজয়ের জনপ্রিয়তা শুধু সিনেমার টিকিট বিক্রি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সমর্থনে আটকে নেই। তার জনপ্রিয়তা ভোটে রূপ নেওয়ার ক্ষমতাও রাখে।
এই স্থানীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা টিভিকের জন্য এক ধরনের পরীক্ষামূলক মহড়া হয়ে দাঁড়ায়। কোন এলাকায় সংগঠন শক্তিশালী, কোথায় নেতৃত্ব দরকার, কোথায় জনসমর্থন আছে—এসব বোঝার সুযোগ তৈরি হয়। পরে বিধানসভা নির্বাচনের সময় সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হয়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
টিভিকে গঠনের সময় বিজয় একা ছিলেন না
টিভিকে যখন আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে, তখন সেটি কাগজে-কলমে নতুন দল হলেও বাস্তবে এর ভেতরে পুরোনো সামাজিক কাঠামো কাজ করছিল। দীর্ঘদিনের ভক্ত ক্লাব, জেলা পর্যায়ের সংগঠন, স্থানীয় কর্মী এবং সামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত মানুষ—সবাই মিলে দলটির ভিত্তি তৈরি করে।
এ কারণে টিভিকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে পারে। নতুন দল হিসেবে তাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল—মানুষ আগে থেকেই বিজয়ের নাম জানত, আর তার সংগঠনের অনেক কর্মী আগেই এলাকায় পরিচিত ছিলেন।
নতুন রাজনৈতিক দলের সাধারণ সমস্যা হলো পরিচিতি তৈরি করা। কিন্তু বিজয়ের ক্ষেত্রে পরিচিতির সংকট ছিল না। বরং চ্যালেঞ্জ ছিল সেই পরিচিতিকে বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক বিকল্পে রূপ দেওয়া। নির্বাচনের ফল বলছে, সেই কাজটি অনেকটাই সফল হয়েছে।

জনপ্রিয়তা থেকে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি
বিজয়ের কৌশলকে তিনটি ধাপে বোঝা যায়।
প্রথম ধাপ ছিল তারকা জনপ্রিয়তা। দীর্ঘদিনের চলচ্চিত্রজীবনে তিনি মানুষের ঘরে ঘরে পরিচিত হন। তার সংলাপ, চরিত্র, সামাজিক বার্তা—সব মিলিয়ে তিনি তরুণ ভোটারদের কাছেও প্রভাবশালী মুখ হয়ে ওঠেন।
দ্বিতীয় ধাপ ছিল সামাজিক কাজের মাধ্যমে আস্থা তৈরি। ভক্তদের সংগঠন মানুষের পাশে দাঁড়াতে শুরু করলে বিজয়ের ভাবমূর্তি শুধু বিনোদন জগতের তারকা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সেখানে যোগ হয়েছে সামাজিক দায়বদ্ধতার ধারণা।
তৃতীয় ধাপ ছিল সেই নেটওয়ার্ককে রাজনৈতিক কাঠামোয় রূপান্তর করা। টিভিকে সেই কাজটিই করেছে। ফলে বিজয়ের সমর্থকেরা শুধু আবেগপ্রবণ ভক্ত হিসেবে থাকেননি; তারা হয়ে উঠেছেন সংগঠিত রাজনৈতিক কর্মী।
এই জায়গাটিই বিজয়ের সাফল্যের মূল রহস্য। তিনি জনপ্রিয় ছিলেন—এটা সত্য। কিন্তু শুধু জনপ্রিয়তা দিয়ে ১০৮টি আসন জেতা যায় না। তার জন্য দরকার ভোটকেন্দ্রভিত্তিক সংগঠন, স্থানীয় নেতৃত্ব, বার্তা পৌঁছানোর ক্ষমতা এবং নির্বাচনী হিসাব বোঝার দক্ষতা। টিভিকে সেই কাঠামো তৈরি করতে পেরেছে বলেই ফলাফলে বড় সাফল্য এসেছে।
পুরোনো দুই শক্তির বিরুদ্ধে নতুন বার্তা
তামিলনাড়ুর রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে ডিএমকে ও এআইএডিএমকের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ভোটাররা বহু বছর ধরে মূলত এই দুই ধারার রাজনীতির মধ্যেই পছন্দ নির্ধারণ করেছেন। বিজয়ের উত্থান সেই দ্বিদলীয় ভারসাম্যে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
টিভিকে নিজেকে নতুন রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তাদের বার্তায় ছিল পরিবর্তনের আহ্বান, তরুণদের অংশগ্রহণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান, সাধারণ মানুষের স্বার্থ এবং তামিল পরিচয়ের গুরুত্ব। পুরোনো দলগুলোর বিরুদ্ধে ক্লান্ত ভোটারদের একটি অংশ এই বার্তায় সাড়া দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের কাছে বিজয়ের গ্রহণযোগ্যতা বড় ভূমিকা রেখেছে। যারা তাকে চলচ্চিত্রে দেখেছেন, তারা রাজনীতিতেও তার মধ্যে এক ধরনের নতুনত্ব খুঁজেছেন। তবে শুধু আবেগ নয়, মাঠপর্যায়ের সংগঠন সেই আবেগকে ভোটে রূপ দিয়েছে।
কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক: বিজয়ের রাজনৈতিক অবস্থানের বড় ভিত্তি
বিজয়ের রাজনৈতিক বক্তব্যে তামিলনাড়ুর স্বার্থ, ভাষা, শিক্ষা ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার বিষয়টি বারবার এসেছে। তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে মতপার্থক্য নতুন নয়। ভাষা নীতি, রাজস্ব বণ্টন, শিক্ষানীতি এবং ফেডারেল অধিকারের প্রশ্নে রাজ্যটি দীর্ঘদিন ধরেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে এসেছে।
এই ঐতিহাসিক বাস্তবতার ভেতরেই বিজয়ের রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি হয়েছে। তিনি বারবার বলেছেন, তামিলনাড়ুর শিক্ষা, ভাষা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে রাজ্যের নিজস্ব মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। কেন্দ্র থেকে চাপিয়ে দেওয়া নীতি তামিল মানুষের স্বার্থের সঙ্গে মেলে না—এমন বক্তব্যও তার রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ হয়ে ওঠে।
নরেন্দ্র মোদি সরকারের প্রতি বিজয়ের সমালোচনামূলক অবস্থানও এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত। এটি কোনো একক ঘটনার ফল নয়। বরং তামিল আঞ্চলিক রাজনীতি, কেন্দ্র-রাজ্য ক্ষমতার টানাপোড়েন এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেকে আলাদা করে তোলার কৌশল—সব মিলেই এই অবস্থান গড়ে উঠেছে।
ভাষা ও শিক্ষানীতি নিয়ে অবস্থান
দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি পরিচয়, আত্মমর্যাদা এবং রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্ন। তামিলনাড়ুতে কেন্দ্রীয় ভাষানীতির প্রতি সন্দেহ দীর্ঘদিনের। নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি এবং ভাষা প্রয়োগের প্রশ্নেও দক্ষিণ ভারতের অনেক রাজনৈতিক শক্তির আপত্তি আছে।
বিজয়ের অবস্থান ছিল—তামিল ভাষা ও স্থানীয় সংস্কৃতির মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। শিক্ষা ও প্রশাসনে রাজ্যের বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত যদি স্থানীয় সংস্কৃতি বা ভাষার ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে সেটি রাজনৈতিক প্রতিরোধের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
এই অবস্থান বিজয়কে আঞ্চলিক স্বার্থরক্ষার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছে। তামিল ভোটারদের একটি বড় অংশের কাছে এ ধরনের বক্তব্য আবেগ ও বাস্তবতার দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।
কৌশলগত দিকও উপেক্ষা করা যায় না
বিজয়ের কেন্দ্রবিরোধী বা সমালোচনামূলক অবস্থান শুধু আদর্শিক নয়, কৌশলগতও। তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে আঞ্চলিক পরিচয়ের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। এখানে কেন্দ্রীয় প্রভাবের বিরুদ্ধে অবস্থান অনেক সময় ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়।
টিভিকে নিজেকে প্রচলিত জাতীয় রাজনীতির বাইরে একটি রাজ্যকেন্দ্রিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে। এতে দলটি একদিকে ডিএমকে ও এআইএডিএমকের পুরোনো রাজনীতির বাইরে নতুন জায়গা তৈরি করতে চেয়েছে, অন্যদিকে জাতীয় দলগুলোর প্রভাব থেকেও দূরত্ব দেখিয়েছে।
এই কৌশল ভোটের ফলাফলে কতটা কাজ করেছে, তা নিয়ে বিশ্লেষণ চলবে। তবে ১০৮টি আসন পাওয়া প্রমাণ করে, বিজয়ের বার্তা ভোটারদের একটি বড় অংশের কাছে পৌঁছেছে।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: সরকার কীভাবে গড়বেন বিজয়?
নির্বাচনী সাফল্যের পর বিজয়ের সামনে সবচেয়ে কঠিন অঙ্ক এখন সরকার গঠন। একক বৃহত্তম দল হওয়া নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু ১১৮টি আসন না থাকায় তাকে সমর্থন জোগাড় করতেই হবে।
এখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিএমকে নেতৃত্বাধীন এসপিএর সমর্থন নিলে এক ধরনের রাজনৈতিক বার্তা যাবে। এআইএডিএমকে নেতৃত্বাধীন এনডিএর দিকে গেলে অন্য বার্তা যাবে। ছোট দল বা স্বতন্ত্রদের নিয়ে সরকার গড়ার চেষ্টা করলে সেটিও ঝুঁকিমুক্ত হবে না, কারণ স্থিতিশীলতা তখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে।
সরকার গঠনের পর আস্থা ভোটে জয়ী হওয়াই হবে বিজয়ের প্রথম বড় পরীক্ষা। চলচ্চিত্রে তিনি বহুবার কঠিন পরিস্থিতি সামলানো নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। কিন্তু বাস্তব রাজনীতির বিধানসভা অনেক বেশি কঠিন। এখানে আবেগ, জনপ্রিয়তা ও জনসমর্থনের পাশাপাশি প্রয়োজন সংখ্যার নিখুঁত হিসাব।
বিজয়ের জয় তামিল রাজনীতিতে কী বার্তা দিল
বিজয়ের উত্থান কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়।
প্রথমত, তামিলনাড়ুতে চলচ্চিত্র ও রাজনীতির সম্পর্ক এখনো শক্তিশালী। তবে শুধু তারকা পরিচয় যথেষ্ট নয়; সংগঠন ও সামাজিক ভিত্তি তৈরি করতে হয়।
দ্বিতীয়ত, তরুণ ভোটার ও নতুন রাজনৈতিক ভাষ্যের চাহিদা বাড়ছে। পুরোনো দলগুলোর বাইরে নতুন বিকল্পের প্রতি মানুষের আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
তৃতীয়ত, স্থানীয় পরিচয়, ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজ্যের অধিকারের প্রশ্ন এখনো তামিল রাজনীতির কেন্দ্রে আছে। বিজয় সেই জায়গাটিকে নিজের রাজনৈতিক শক্তির অংশ করতে পেরেছেন।
চতুর্থত, সামাজিক কাজ ও দীর্ঘমেয়াদি মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি ভোটের রাজনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ভক্ত ক্লাবকে শুধু আবেগের জায়গা হিসেবে না রেখে সংগঠনে পরিণত করার কৌশলই বিজয়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
সি জোসেফ বিজয়ের রাজনৈতিক উত্থান হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘ প্রস্তুতি, সাংগঠনিক পরিশ্রম, তারকা জনপ্রিয়তা, সামাজিক কাজ এবং তামিল আঞ্চলিক রাজনীতির বাস্তবতার সম্মিলিত ফল।
টিভিকে ১০৮টি আসন জিতে তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১১৮টি আসন থেকে তারা এখনো ১০ আসন পিছিয়ে। তাই বিজয়ের সামনে এখন আনন্দের পাশাপাশি কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষা অপেক্ষা করছে।
তিনি কি জোটের অঙ্ক মেলাতে পারবেন? আস্থা ভোটে জয়ী হয়ে স্থায়ী সরকার গড়তে পারবেন? নাকি তামিলনাড়ুর রাজনীতি আবার নতুন মোড় নেবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে আগামী দিনগুলোতে। তবে একটি বিষয় এখনই স্পষ্ট—বিজয় আর শুধু পর্দার জনপ্রিয় নায়ক নন; তিনি এখন তামিলনাড়ুর ক্ষমতার রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র।
সিভি/এইচএম

