মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপে ফেললেও ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির খবর দিয়েছে ইন্দোনেশিয়া। দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে অর্থনীতি বেড়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। গত মঙ্গলবার প্রকাশিত এই পরিসংখ্যান সরকারি পূর্বাভাসকেও ছাড়িয়ে গেছে।
জাকার্তায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে ‘স্ট্যাটিস্টিকস ইন্দোনেশিয়া’ (বিপিএস)-এর প্রধান আমালিয়া আদিনিংগার উইদিয়াসান্তি জানান, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে যেখানে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৪ শতাংশ, সেখানে নতুন এই হার আরও উন্নত অবস্থান নির্দেশ করে।
ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রবোয়ো সুবিয়ান্টোর নেতৃত্বাধীন সরকার আগামী ২০২৯ সালের মধ্যে প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। গত বছরের ৫ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধিকে ভিত্তি ধরে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে সরকারি ব্যয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ শতাংশের বেশি বেড়েছে। অর্থনীতির এই সম্প্রসারণে সরকারি ব্যয় একটি বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এই প্রবৃদ্ধির স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা। ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের এশিয়া অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ গ্যারেথ লেদার এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছেন, সরকারের নীতিগুলো ক্রমেই জনতুষ্টিমূলক ও হস্তক্ষেপনির্ভর হয়ে উঠছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব মোকাবিলায় প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে ইন্দোনেশিয়া। দেশটির অর্থমন্ত্রী এয়ারলাঙ্গা হারতার্তো গত মাসে বলেন, জ্বালানি ভর্তুকি কমানো ছাড়াই অন্তত আগামী ১০ মাস এই চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হবে। যদিও ইন্দোনেশিয়া একটি তেল উৎপাদনকারী দেশ, তবু বর্তমানে তারা নিট আমদানিকারক। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে বিপুল ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখা হচ্ছে।
আগে দেশটির মোট তেল আমদানির ২০ থেকে ২৫ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসত। তবে সম্প্রতি রাশিয়ার সঙ্গে নতুন তেল চুক্তি করেছে জাকার্তা। পাশাপাশি আফ্রিকা, যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলাকে বিকল্প উৎস হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। জ্বালানি দামের ওঠানামা ইন্দোনেশিয়ার বাজেটে বড় প্রভাব ফেলে। প্রতি ডলার দামে তেল বাড়লে জাতীয় বাজেটে প্রায় ৬ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন রুপি বা প্রায় ৪০ কোটি ডলারের অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।
২০২৬ সালের বাজেটে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলার ধরে ভর্তুকির হিসাব করা হয়েছিল। কিন্তু ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা এবং পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের কারণে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। একই সঙ্গে ডলারের বিপরীতে রুপির মানও দুর্বল হয়েছে। বাজেটে যেখানে বিনিময় হার ধরা হয়েছিল ১৬ হাজার ৫০০ রুপি, বর্তমানে তা ১৭ হাজার ৪০০ ছাড়িয়ে গেছে।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসে কিছুটা সতর্কতার ইঙ্গিত রয়েছে। বিশ্বব্যাংক গত মাসে ২০২৬ সালের জন্য ইন্দোনেশিয়ার প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। এর আগে, গত বছরের অক্টোবরে সংস্থাটি ৪ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখলেও, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ভবিষ্যতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকছে।

