ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির নতুন তথ্য সামনে এসেছে। মার্কিন সিনেটের এক শুনানিতে দাবি করা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৩৯টি সামরিক বিমান হারিয়েছে। এই তথ্য প্রকাশের পর ওয়াশিংটনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশল, যুদ্ধ পরিচালনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অবস্থান নিয়ে।
তুরস্কের সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সিনেটের শুনানিতে ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতা এড কেস এই তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, মার্কিন প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট রিপোর্ট এবং সামরিক বিশ্লেষণভিত্তিক প্রতিবেদনে যুদ্ধ চলাকালে বিমান ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
শুনানিতে উল্লেখ করা হয়, সংঘাত শুরুর পর থেকে মার্কিন বিমান বাহিনী প্রায় ১৩ হাজার ফ্লাইট পরিচালনা করেছে। এই বিশাল সামরিক অভিযানের মধ্যেই অন্তত ৩৯টি বিমান পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করা হয়। পাশাপাশি আরও ১০টি বিমান বিভিন্ন মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতির তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো একটি অত্যাধুনিক এফ-৩৫এ যুদ্ধবিমান ইরানের আকাশসীমার ভেতরে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার দাবি। এছাড়া একটি বোয়িং ই-৩ সেন্ট্রি নজরদারি বিমান ধ্বংস হওয়ার কথাও আলোচনায় এসেছে। যদিও এসব তথ্যের বিষয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর এখন পর্যন্ত বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয়নি, তবুও বিষয়টি রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক যুদ্ধ প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এত বড় ক্ষয়ক্ষতির দাবি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে এফ-৩৫-এর মতো উন্নত প্রযুক্তির বিমান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা ভবিষ্যতের সামরিক পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ এই যুদ্ধবিমানকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়।
সংঘাতের পটভূমিতে জানা যায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। জবাবে তেহরান শুধু ইসরায়েল নয়, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের বিরুদ্ধেও প্রতিক্রিয়ামূলক পদক্ষেপ নেয়। একই সময়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে বিশ্ববাজারেও বড় চাপ তৈরি করে ইরান।
প্রায় পাঁচ সপ্তাহ ধরে চলা এই সংঘাতের পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তবে আলোচনার টেবিলে স্থায়ী সমাধান না আসায় এখনো অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বাড়ালেও দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন অব্যাহত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, এই সংঘাত শুধু সামরিক নয়, বরং অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকেও বড় প্রভাব ফেলছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ এবং আঞ্চলিক মিত্রদের অবস্থান—সবকিছুই নতুন করে হিসাবের মধ্যে চলে এসেছে।
এদিকে মার্কিন রাজনীতিতেও যুদ্ধের প্রকৃত খরচ ও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে। বিরোধী আইনপ্রণেতাদের কেউ কেউ মনে করছেন, সংঘাতের বাস্তব চিত্র জনগণের সামনে পুরোপুরি তুলে ধরা হয়নি। আবার অনেকে বলছেন, এই ধরনের তথ্য প্রকাশ ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত আপাতত বড় আকারের যুদ্ধে রূপ না নিলেও এর সামরিক ও রাজনৈতিক অভিঘাত এখনো গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।

