যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনফিংয়ের বেইজিং বৈঠক শুধু দুই পরাশক্তির সম্পর্কের বিষয় নয়। এই সম্মেলনের দিকে গভীর নজর রেখেছে পাকিস্তানসহ বৈশ্বিক দক্ষিণের অনেক দেশ। কারণ বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে বড় শক্তিগুলোর দ্বন্দ্ব শুধু তাদের নিজেদের সীমান্তে আটকে থাকে না; এর প্রভাব পড়ে জ্বালানি বাজারে, বাণিজ্যপথে, বিনিয়োগে, আঞ্চলিক নিরাপত্তায় এবং ছোট-মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর কূটনৈতিক সিদ্ধান্তেও।
২০২৬ সালের ১৫ মে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠককে অনেকেই পরাশক্তির গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন হিসেবে দেখছেন। পাকিস্তানের জন্য বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ দেশটি দীর্ঘদিন ধরে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছে। ইসলামাবাদ চায় না তাকে এক পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করা হোক। বরং তার লক্ষ্য হলো চীনের সঙ্গে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ধরে রাখা, একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য, কূটনীতি ও নিরাপত্তা যোগাযোগ অব্যাহত রাখা।
এই সম্মেলন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যখন পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত, হরমুজ প্রণালীর সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে অনিশ্চয়তা এবং তাইওয়ান ইস্যুতে দীর্ঘস্থায়ী মতবিরোধ আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে আরও অস্থির করে তুলেছে। ট্রাম্পের চীন সফর প্রথমে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ইরানকে ঘিরে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে তা পিছিয়ে যায়। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি টিকে থাকায় বেইজিং বৈঠকের পথ তৈরি হয়।
এই প্রেক্ষাপট বৈঠকের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ আলোচনা শুধু চীন-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট পুনরায় স্থিতিশীল করা, ইরান সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক চাপ কমানোর মতো বিষয়ও সামনে এসেছে। ফলে এই সম্মেলনকে শুধু দুই রাষ্ট্রপ্রধানের আনুষ্ঠানিক বৈঠক হিসেবে দেখা যায় না; এটি ছিল একটি বৃহত্তর সংকট ব্যবস্থাপনার অংশ।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ট্রাম্পের রাষ্ট্রীয় সফরকে এমন একটি ঘটনা হিসেবে তুলে ধরেছে, যা বিশ্বে প্রয়োজনীয় স্থিতিশীলতা ও নিশ্চয়তা যোগ করেছে। দুই পক্ষ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ইস্যুতে যোগাযোগ ও সমন্বয় বাড়ানোর কথাও বলেছে। এই ভাষা কূটনৈতিকভাবে সতর্ক হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য বড়। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক যখন উত্তেজনাপূর্ণ থাকে, তখন পাকিস্তানের মতো দেশগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে।
পাকিস্তানের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো ভারসাম্য রক্ষা। একদিকে চীন তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর পাকিস্তানের অবকাঠামো, জ্বালানি ও সংযোগনীতির কেন্দ্রীয় অংশ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও পাকিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা অংশীদার। এর পাশাপাশি পাকিস্তানকে ইরান, উপসাগরীয় রাষ্ট্র এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য বাস্তবতার সঙ্গেও হিসাব মিলিয়ে চলতে হয়। তাই চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সামান্য উত্তেজনাও ইসলামাবাদের নীতিনির্ধারণে বড় চাপ তৈরি করে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালীর কিছু অংশ বন্ধ থাকার অনিশ্চয়তা পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। জ্বালানি সরবরাহে চাপ বেড়েছে, তেলের দাম বেড়েছে এবং বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও আমদানিনির্ভর রাষ্ট্রগুলোর জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও বেশি, কারণ দেশটি একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সংকট, ঋণচাপ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগের সঙ্গে লড়ছে।
এই অবস্থায় ট্রাম্প-শি বৈঠক পাকিস্তানের জন্য কিছুটা স্বস্তির সম্ভাবনা তৈরি করেছে। যদি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সংঘাতের মাত্রা কমে, তাহলে পাকিস্তানকে প্রতিটি কূটনৈতিক সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত সতর্কতার বোঝা বহন করতে হবে না। বরং দেশটি উন্নয়ন, বিনিয়োগ, কৃষি আধুনিকীকরণ, প্রযুক্তি সহযোগিতা ও আঞ্চলিক সংযোগের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে পারবে।
পাকিস্তানের কূটনৈতিক ইতিহাসেও এই বৈঠকের একটি বিশেষ প্রতিধ্বনি আছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছিল। তখন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের আমলে পাকিস্তান গোপন কূটনৈতিক যোগাযোগ ও সফর ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করে। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে হেনরি কিসিঞ্জার বেইজিং সফর করেন এবং পরে ১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ঐতিহাসিক চীন সফরের পথ তৈরি হয়। সেই উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের দীর্ঘ বৈরিতার অবসান ঘটিয়ে শীতল যুদ্ধের ভূরাজনীতিকে বদলে দেয়।
বর্তমান পরিস্থিতি অবশ্য ১৯৭১ সালের মতো নয়। আজকের বিশ্ব অনেক বেশি বহুমুখী, অর্থনৈতিকভাবে আন্তঃনির্ভরশীল এবং সংকটপূর্ণ। তবু পাকিস্তান আবারও নিজেকে একটি যোগাযোগসেতু হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামাবাদ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি গঠনে ও বাড়াতে কূটনৈতিক ভূমিকা রেখেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ট্রাম্পকে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে অনুরোধ করেছিলেন, যাতে ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা আয়োজনের সুযোগ তৈরি হয়। ট্রাম্পও পাকিস্তানের এই ভূমিকার প্রশংসা করেছেন।
চীনও পাকিস্তানকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংলাপ এগিয়ে নিতে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এটি দেখায় যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতামূলক ভূমিকা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে নয়, চীনের দিক থেকেও গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে এই ভূমিকার পেছনে পাকিস্তান-চীন সম্পর্কের গভীরতা বড় ভূমিকা রাখছে। চীনের সঙ্গে শক্তিশালী অংশীদারত্ব পাকিস্তানকে আঞ্চলিক কূটনীতিতে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছে।
বৈশ্বিক দক্ষিণের অনেক দেশই এখন একই ধরনের বাস্তবতার মুখোমুখি। তারা চীনের উন্নয়ন অর্থায়ন, অবকাঠামো প্রকল্প ও আঞ্চলিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চায়। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রের বাজার, প্রযুক্তি, আর্থিক ব্যবস্থা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক থেকেও দূরে যেতে চায় না। কিন্তু যখন ওয়াশিংটন ও বেইজিং মুখোমুখি অবস্থানে যায়, তখন এসব দেশ নীরব চাপের মধ্যে পড়ে। তাদের ওপর সরাসরি ঘোষণা না থাকলেও বাস্তবে এক ধরনের পক্ষ বেছে নেওয়ার চাপ তৈরি হয়।
পাকিস্তান এই চাপ খুব ভালোভাবেই বোঝে। এক অঞ্চল এক পথ উদ্যোগ, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পৃক্ততা তাকে চীনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হলে অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় পাকিস্তানের অবস্থান দুর্বল হতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের উন্নতি ইসলামাবাদের জন্য কৌশলগত স্বস্তি এনে দিতে পারে।
এই সম্মেলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পাকিস্তানের উন্নয়ন অগ্রাধিকার। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের পরবর্তী ধাপে কৃষি, প্রযুক্তি, শিল্পায়ন ও সংযোগব্যবস্থার ওপর বেশি জোর দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। যদি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা কমে, তাহলে পাকিস্তান চীনের সঙ্গে এই প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কও বজায় রাখতে পারবে। এতে পাকিস্তান আদর্শিক অবস্থান নয়, বাস্তব স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কূটনৈতিক পথ বেছে নিতে পারবে।
তবে আশাবাদের পাশাপাশি সতর্কতাও জরুরি। ট্রাম্প-শি বৈঠক তাৎক্ষণিকভাবে সব সংকটের সমাধান করবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। ইরান ইস্যু, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা, তাইওয়ান প্রশ্ন, বাণিজ্য প্রতিযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত প্রাধান্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতবিরোধ গভীর। একটি সম্মেলন এসব বিরোধ মুছে দিতে পারে না। তবে এটি উত্তেজনা কমানোর একটি দরজা খুলতে পারে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনেক সময় এই দরজাই ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর জন্য বড় সুযোগ তৈরি করে।
পাকিস্তানের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ইসলামাবাদ কি এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারবে? শুধু মধ্যস্থতার দাবি করলেই হবে না; পাকিস্তানকে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সংস্কার, প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা এবং আঞ্চলিক আস্থার জায়গাগুলো শক্ত করতে হবে। কারণ বড় শক্তির সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হলেও দুর্বল নীতি ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা থাকলে সেই সুযোগ দীর্ঘস্থায়ী লাভে পরিণত হয় না।
সব মিলিয়ে বেইজিং সম্মেলন পাকিস্তানের জন্য একটি সম্ভাবনার জানালা খুলেছে। এটি একদিকে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের উত্তেজনা কমানোর ইঙ্গিত দিতে পারে, অন্যদিকে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর জন্য কূটনৈতিক শ্বাস নেওয়ার জায়গা তৈরি করতে পারে। পাকিস্তান এই মুহূর্তে এমন এক অবস্থানে আছে, যেখানে সে চীনকে ছাড়তে চায় না, যুক্তরাষ্ট্রকেও হারাতে চায় না, আবার ইরান ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না।
তাই বেইজিং বৈঠকের প্রকৃত মূল্য বোঝা যাবে আগামী দিনগুলোতে। যদি এই সম্মেলনের পর আঞ্চলিক সংঘাত কমে, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ স্থিতিশীল হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন যোগাযোগ বাড়ে, তাহলে পাকিস্তানসহ বৈশ্বিক দক্ষিণের অনেক দেশ বাস্তব লাভ পেতে পারে। কিন্তু যদি এটি শুধু কূটনৈতিক ভাষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে প্রত্যাশা দ্রুত হতাশায় বদলে যেতে পারে।
পাকিস্তান এখন অপেক্ষা করছে। শুধু পাকিস্তান নয়, বৈশ্বিক দক্ষিণের বহু দেশও দেখছে, বেইজিংয়ের এই আলোচনার ফল বাস্তব স্থিতিশীলতায় রূপ নেয় কি না। কারণ আজকের বিশ্বে পরাশক্তির টেবিলে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনেক সময় ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণ করে দেয়।

