ইরান যুদ্ধ এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সংকট নয়, এটি ব্রিকসের মতো বড় আন্তর্জাতিক জোটের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে আসছে। নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের দুই দিনের বৈঠক শুক্রবার শেষ হলেও ইরান যুদ্ধ নিয়ে সদস্য দেশগুলো কোনো যৌথ অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। বৈঠকের ফলাফলে শুধু বলা হয়েছে, কিছু সদস্যের মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। অর্থাৎ, ব্রিকস একসঙ্গে বসেছে, অনেক বিষয়ে আলোচনা করেছে, কিন্তু সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রশ্নে এক ভাষায় কথা বলতে পারেনি।
এটি ছিল ভারতে অনুষ্ঠিত টানা দ্বিতীয় ব্রিকস বৈঠক, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত নিয়ে কোনো ঐকমত্য তৈরি হয়নি। এর আগে ২৪ এপ্রিল নয়াদিল্লিতে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ব্রিকসের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিশেষ দূতদের বৈঠকও যৌথ বিবৃতি ছাড়াই শেষ হয়েছিল। তখন ভারত শুধু সভাপতির সারসংক্ষেপ প্রকাশ করেছিল। এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা দেখাচ্ছে, সম্প্রসারিত ব্রিকসের ভেতরে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা এখন আগের চেয়ে অনেক কঠিন হয়ে উঠেছে।
বৈঠকটি শুরু হয় বৃহস্পতিবার, নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর বৈঠকের সভাপতিত্ব করেন। এটি ছিল ভারতের ২০২৬ সালের ব্রিকস সভাপতিত্বের অধীনে প্রথম বড় মন্ত্রীপর্যায়ের আয়োজন। ব্রিকস এখন দশ সদস্যের একটি জোট, যারা অর্থনীতি, নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও বৈশ্বিক দক্ষিণের স্বার্থ নিয়ে সমন্বয় করার চেষ্টা করে। পশ্চিমা প্রভাবাধীন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপরীতে একটি বিকল্প কণ্ঠ তৈরি করাই এই জোটের বড় উদ্দেশ্যগুলোর একটি। আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতে ব্রিকস নেতাদের সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে।
কিন্তু এই বৈঠকের ওপর সবচেয়ে বড় ছায়া ফেলেছে ইরান যুদ্ধ। সংবাদটিতে বলা হয়েছে, যুদ্ধ তখন ৭৭তম দিনে পৌঁছেছে। সংঘাত শুরু হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সামরিক স্থাপনা, পারমাণবিক কেন্দ্র ও অবকাঠামোতে হামলা চালায়। এরপর ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ বাড়ে। গত মাসে ইসলামাবাদে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনার চেষ্টা হলেও তা স্থবির হয়ে পড়ে। ১৩ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে।
এই প্রেক্ষাপটে ব্রিকসের বৈঠক শুধু নিয়মিত কূটনৈতিক আয়োজন ছিল না; এটি ছিল জোটের রাজনৈতিক সক্ষমতার পরীক্ষা। কিন্তু বৈঠকে উপস্থিত দেশগুলোর অবস্থান এক ছিল না। ইরান চেয়েছিল ব্রিকস স্পষ্টভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার নিন্দা করুক। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের কর্মকাণ্ডের নিন্দা চেয়েছে। ফলে বৈঠক এক ধরনের কূটনৈতিক অচলাবস্থায় আটকে যায়।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন না, কারণ একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনে রাষ্ট্রীয় সফরে ছিলেন। প্রায় এক দশকের মধ্যে এটি ছিল কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম বেইজিং সফর। তাই ব্রিকস বৈঠকে চীনের প্রতিনিধিত্ব করেন ভারতে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত শু ফেইহং। বৈঠকে ইরানের আব্বাস আরাঘচি, রাশিয়ার সের্গেই লাভরভ, ব্রাজিলের মাউরো ভিয়েরা, দক্ষিণ আফ্রিকার রোনাল্ড লামোলা এবং ইন্দোনেশিয়া, মিসর ও ইথিওপিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা অংশ নেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আবুধাবি যাওয়ার আগে অতিথি মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
সবচেয়ে বড় উত্তেজনা তৈরি হয় ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি প্রথমে আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে আমিরাতের নাম সরাসরি বলেননি। পরে তিনি জানান, জোটের ঐক্য ধরে রাখার স্বার্থেই তিনি শুরুতে সংযত ছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। তিনি ব্রিকস সদস্যদের আহ্বান জানান, তারা যেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেয় এবং যুদ্ধ বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধি খলিফা বিন শাহিন আল মারার তাঁর বক্তব্যে ইরানের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানানোর দাবি তোলেন। এর মাধ্যমে ব্রিকসের সম্প্রসারিত কাঠামোর গভীর সমস্যা প্রকাশ্যে আসে। একই জোটে এখন ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত পূর্ণ সদস্য, অথচ তারা চলমান সংঘাতের বিপরীত অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। এই বাস্তবতা ব্রিকসের জন্য নতুন ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরে আবার বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ চান। তিনি অভিযোগ করেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে সরাসরি জড়িত। তাঁর দাবি, হামলার শুরুতে আমিরাত কোনো নিন্দা জানায়নি, বরং যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দিয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, আমিরাতের যুদ্ধবিমান ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় অংশ নিয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়, মিনাব শহরের একটি স্কুলে হামলায় প্রায় ১৭০ শিক্ষার্থী নিহত হলেও আমিরাত তা নিন্দা করেনি।
তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। আবুধাবির দাবি, ইরানি হামলা দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো ও বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করেছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে আমিরাত ২ হাজার ৮০০টির বেশি ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। ফলে দুই দেশের বক্তব্য পুরোপুরি বিপরীত অবস্থানে দাঁড়ায়, যা ব্রিকসের যৌথ বিবৃতি তৈরির সম্ভাবনাকে প্রায় অসম্ভব করে তোলে।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর সভাপতির ভূমিকায় ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেন। তিনি হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগরসহ আন্তর্জাতিক জলপথে নিরাপদ ও বাধাহীন চলাচলের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একতরফা নিষেধাজ্ঞা কখনো সংলাপের বিকল্প হতে পারে না, আর চাপ প্রয়োগ কূটনীতির জায়গা নিতে পারে না। একই সঙ্গে তিনি নতুন সদস্যদের উদ্দেশে ইঙ্গিতপূর্ণভাবে বলেন, ব্রিকসের অগ্রগতি মসৃণ রাখতে হলে পরবর্তী সদস্যদের জোটের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিদ্যমান ঐকমত্যকে বুঝতে হবে এবং তা মানতে হবে।
শেষ পর্যন্ত বৈঠকের ফলাফল ছিল সতর্ক ও অস্পষ্ট। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে চূড়ান্ত নথিতে শুধু বলা হয়, কিছু সদস্যের মধ্যে ভিন্ন মত আছে। সেখানে সংলাপ, কূটনীতি, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান, আন্তর্জাতিক জলপথে চলাচলের স্বাধীনতা এবং বেসামরিক মানুষের সুরক্ষার মতো সাধারণ নীতির কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু কোনো পক্ষের নাম নেওয়া হয়নি, দায়ও নির্ধারণ করা হয়নি। ইরানের চাওয়া অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নিন্দা করা হয়নি। আবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের চাওয়া অনুযায়ী ইরানের হামলার নিন্দাও করা হয়নি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরে নয়াদিল্লিতে ইরানি দূতাবাসে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের কারণেই চূড়ান্ত বিবৃতি আটকে গেছে। তাঁর দাবি, আমিরাতের ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে এবং সেই অবস্থানই ব্রিকসের ঐকমত্যে বাধা দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা যেগুলো নিরাপত্তা দেওয়ার কথা ছিল, সেগুলোই এখন অনিরাপত্তার উৎস হয়ে উঠেছে।
তবে বৈঠক পুরোপুরি ব্যর্থ বলা যাবে না। ইরান যুদ্ধ নিয়ে ঐকমত্য না হলেও অন্যান্য বিষয়ে সদস্য দেশগুলো ৬০টির বেশি ইস্যুতে একমত হয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতা, বাণিজ্য, ডিজিটাল অবকাঠামো, জলবায়ু পদক্ষেপ এবং বহুপাক্ষিক সংস্কারের মতো বিষয় ছিল। এর অর্থ, ব্রিকস অর্থনৈতিক ও উন্নয়নভিত্তিক আলোচনায় এখনো কার্যকর হতে পারে। কিন্তু কঠিন ভূরাজনৈতিক সংকটে জোটের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট।
এই ঘটনা ব্রিকসের সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরেছে। জোটটি কি শুধু অর্থনীতি, বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতার মঞ্চ থাকবে, নাকি বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংকটে একক অবস্থান নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করবে? সম্প্রসারণের ফলে ব্রিকসের গুরুত্ব বেড়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে ভেতরের বৈপরীত্যও বেড়েছে। ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় স্বার্থ এক নয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ইসরায়েল প্রশ্নে সদস্যদের অবস্থান আলাদা।
সাবেক পাকিস্তানি কূটনীতিক জওহর সেলিমের মতে, এই ফলাফল অপ্রত্যাশিত নয়। তাঁর বিশ্লেষণে ব্রিকস গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর একটি জোট হলেও এর সদস্যদের পররাষ্ট্রনীতি, স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গি অনেক ভিন্ন। তাই ইরান যুদ্ধের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে যৌথ অবস্থান তৈরি করা শুরু থেকেই কঠিন ছিল। তাঁর মতে, আজকের বিশ্বে জোটভিত্তিক রাজনীতি আগের মতো কার্যকর নয়; বরং বড় জোটগুলোতেও ভাঙন ও মতপার্থক্য বাড়ছে।
এখানে পাকিস্তানের ভূমিকাও আলোচনায় এসেছে। ইসলামাবাদ যুক্তরাষ্ট্র ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে চেয়েছে। গত মাসে পাকিস্তান আলোচনার আয়োজন করেছিল এবং দুই পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ রেখেছিল। জওহর সেলিমের মতে, পাকিস্তানের ভারসাম্যপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক কূটনীতি বর্তমান সময়ের সঙ্গে বেশি মানানসই, কারণ এখন কঠিন কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখাই স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে।
সব মিলিয়ে, নয়াদিল্লির ব্রিকস বৈঠক দেখিয়ে দিয়েছে, বড় জোট হওয়া আর কার্যকর রাজনৈতিক ঐক্য দেখানো এক বিষয় নয়। ব্রিকস বৈশ্বিক দক্ষিণের কণ্ঠস্বর হতে চায়, কিন্তু তার ভেতরে যদি সদস্যদের নিরাপত্তা স্বার্থ, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে জোটের ভাষা স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হয়ে যায়। ইরান যুদ্ধ তাই শুধু একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়; এটি ব্রিকসের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক চরিত্রেরও একটি পরীক্ষা।

