চীন সফর শেষে ওয়াশিংটনে ফিরে আবারও ইরান প্রশ্নে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কয়েক দফা কূটনৈতিক যোগাযোগ ও যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ সত্ত্বেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হওয়ায় এখন নতুন সামরিক পদক্ষেপের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে ইতোমধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় সামরিক অভিযান চালানোর বিষয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে। বিশেষ করে পেন্টাগনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সম্ভাব্য বিভিন্ন হামলা পরিকল্পনা ও বিকল্প কৌশল প্রস্তুত করেছেন বলে জানা গেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পুরো বিষয়টি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতির কারণে স্থগিত হয়ে যাওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ আবারও চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পরিকল্পনায় ইরানের সামরিক ঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো এবং কৌশলগত স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার বিষয় রয়েছে।
শুধু বিমান হামলাই নয়, ইসফাহানে মাটির নিচে থাকা পারমাণবিক স্থাপনায় বিশেষ বাহিনী পাঠিয়ে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দ করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্পও আলোচনায় রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এমন পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতি আরও বিস্ফোরক হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে ট্রাম্প নিজেও ইরানের সাম্প্রতিক শান্তি প্রস্তাব নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, প্রস্তাবটির শুরুতেই তিনি হতাশ হয়েছেন এবং সেটি গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। এতে স্পষ্ট হয়েছে যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার আস্থার সংকট এখনো কাটেনি।
তবে চীন সফরের সময় প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প দাবি করেন, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। ফলে বিষয়টি শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক মূল্যায়ন বলছে, টানা হামলা ও অবরোধের পরও ইরান পুরোপুরি দুর্বল হয়ে পড়েনি। বরং দেশটি দ্রুত তাদের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করছে। হরমুজ প্রণালির আশপাশে থাকা ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির মধ্যে ৩০টিতে আবারও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে তেহরান। পাশাপাশি তাদের ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের বড় অংশ এখনো অক্ষত রয়েছে।
ইরানের পক্ষ থেকেও পাল্টা কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো আগ্রাসন চালালে তার “দাঁতভাঙা জবাব” দেওয়া হবে। তার বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে যে, তেহরান এখন আর শুধু প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে নেই; প্রয়োজনে তারা সরাসরি পাল্টা প্রতিক্রিয়ার জন্যও প্রস্তুত।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও বড় ধরনের সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। কূটনৈতিক আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ না হলেও দুই পক্ষের অবস্থান ক্রমেই কঠোর হয়ে উঠছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে পড়তে শুরু করেছে। অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ছে, উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনীতিতেও।

