রাশিয়া ও ইউক্রেনের চলমান যুদ্ধ এখন আরও বেশি প্রযুক্তিনির্ভর ও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। সামনের যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি দুই দেশের আকাশেও বাড়ছে সংঘর্ষের মাত্রা। বিশেষ করে ড্রোন যুদ্ধ এখন এই সংঘাতের অন্যতম বড় বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়া দাবি করেছে, মাত্র এক সপ্তাহে তারা ইউক্রেনের ৩ হাজারের বেশি ড্রোন ধ্বংস করেছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ মে থেকে ১৭ মে পর্যন্ত সাত দিনে ইউক্রেন থেকে ছোড়া মোট ৩ হাজার ১২৪টি ড্রোন আটকানোর পর ধ্বংস করেছে রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তাসংস্থা রিয়া নভোস্তি এই তথ্য প্রকাশ করেছে।
রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, গত এক সপ্তাহে প্রায় প্রতিদিনই শত শত ড্রোন রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবেশের চেষ্টা করেছে। তবে সবচেয়ে বড় আকারের হামলা হয়েছে ১৩ মে এবং ১৭ মে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৩ মে একদিনেই ৫৭২টি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে। আর ১৭ মে সেই সংখ্যা এক লাফে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৪টিতে। রাশিয়ার দাবি অনুযায়ী, এটি চলমান যুদ্ধের অন্যতম বৃহৎ ড্রোন প্রতিরোধ অভিযান।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন এখন সরাসরি সম্মুখযুদ্ধের পাশাপাশি ড্রোন হামলার ওপরও ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। কারণ, ড্রোন ব্যবহার করে দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল এবং দ্রুত কার্যকর। একই সঙ্গে এটি শত্রুপক্ষের ভেতরে মনস্তাত্ত্বিক চাপও তৈরি করে।
গত কয়েক মাসে ইউক্রেন ধারাবাহিকভাবে রাশিয়ার অভ্যন্তরে ড্রোন হামলার পরিমাণ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী মস্কো ও তার আশপাশের এলাকাগুলো বারবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ বেড়েছে।
রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১০ মে থেকে ১৭ মে পর্যন্ত পরিচালিত এসব হামলায় অন্তত ৪ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৩ জনই মস্কো ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দা। হামলার কারণে বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
যুদ্ধের শুরুতে ড্রোন মূলত নজরদারি ও সীমিত হামলার কাজে ব্যবহৃত হলেও এখন তা পূর্ণাঙ্গ আক্রমণাত্মক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। উভয় পক্ষই এখন শত শত ড্রোন ব্যবহার করে একযোগে হামলা চালাচ্ছে। ফলে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এই যুদ্ধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রাশিয়ার দাবি অনুযায়ী, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন অনেক বেশি সক্রিয় ও কার্যকর। তবে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে এই সংখ্যা নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে বাস্তবে ঠিক কতগুলো ড্রোন ধ্বংস হয়েছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে যুদ্ধের রাজনৈতিক দিকও আরও জটিল হয়ে উঠছে। দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর ২০২২ সালে ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। মস্কোর অভিযোগ ছিল, ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার জন্য কিয়েভের প্রচেষ্টা এবং ক্রিমিয়া ইস্যুতে পশ্চিমা অবস্থান রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছিল।
অন্যদিকে ইউক্রেন বরাবরই দাবি করে আসছে, এটি একটি আগ্রাসী যুদ্ধ এবং নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষার জন্যই তারা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধ বন্ধে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলে আসছেন। তিনি একাধিকবার যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাঝেও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ইউরোপীয় মিত্রদের কাছে নতুন করে অর্থ ও অস্ত্র সহায়তার জন্য তৎপরতা চালাচ্ছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, আপাতত যুদ্ধ থামার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামনের দিনগুলোতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আরও বেশি ড্রোননির্ভর হয়ে উঠতে পারে। কারণ, আধুনিক যুদ্ধের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে এবং স্বল্প খরচে বড় ক্ষতি করার সক্ষমতার কারণে ড্রোন এখন বড় শক্তিগুলোর অন্যতম প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছে।

