হরমুজ প্রণালীতে সফল যুদ্ধকালীন অবরোধের পর, ইরান এখন বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম একটি গোপন ধমনীর দিকে নজর দিয়েছে। জলপথটির তলদেশ দিয়ে যাওয়া সাবমেরিন বা সমুদ্রগর্ভস্থ ক্যাবলগুলো দিকে, যা ইউরোপ, এশিয়া এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে বিশাল ইন্টারনেট ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য বহন করে, সেগুলোকে এবার নিজেদের কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে ইসলামিক রিপাবলিক। সূত্র: সিএনএন
তেহরানের আইনপ্রণেতারা সম্প্রতি হরমুজ প্রণালী এবং পারস্য উপসাগরের তলদেশ দিয়ে যাওয়া সাবমেরিন ইন্টারনেট ক্যাবল ব্যবহারের জন্য বিশ্বের বৃহত্তম প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর ওপর ফি বা শুল্ক আরোপের একটি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
ইরানের সামরিক মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি সামাজিক মাধ্যম এক্সে ঘোষণা করেছেন, আমরা ইন্টারনেট ক্যাবলের ওপর ফি আরোপ করব। ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম জানিয়েছে, এই পরিকল্পনা অনুযায়ী গুগল, মাইক্রোসফট, মেটা এবং আমাজনের মতো কোম্পানিগুলোকে ইরানি আইন মেনে চলতে হবে।
এছাড়া ক্যাবল কোম্পানিগুলোকে লাইসেন্স ফি দিতে হবে এবং এর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের একচেটিয়া অধিকার দিতে হবে ইরানি সংস্থাগুলোকে। কোম্পানিগুলো এই অর্থ পরিশোধ না করলে ইন্টারনেট ট্রাফিক ব্যাহত করার পরোক্ষ হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
তবে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে এই প্রযুক্তি জায়ান্টদের পক্ষে ইরানকে কোনো অর্থ প্রদান করা আইনত অসম্ভব। ফলে অনেক কোম্পানিই ইরানের এই পদক্ষেপকে বাস্তব নীতির চেয়ে একটি ফাঁকা হুমকি বা রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখছে।
সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার ইতিহাস প্রায় দুই শতাব্দী পুরোনো। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ব্রিটেন জার্মানির প্রধান টেলিগ্রাফ ক্যাবলগুলো কেটে দিয়েছিল। বর্তমানে আধুনিক সাবমেরিন ক্যাবলের একটি একক অপটিক্যাল ফাইবার আলোর গতিতে একসাথে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ফোন কলের সমপরিমাণ ডাটা বহন করতে পারে।
বর্তমানে বেশিরভাগ আধুনিক ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে অপারেটররা দ্রুত অন্য রুট দিয়ে ডাটা ঘুরিয়ে দিতে পারে, ফলে ব্যবহারকারীরা বড় বিপর্যয় টের পান না। কিন্তু হরমুজ প্রণালীর মতো সংবেদনশীল এলাকায় বড় ধরনের আক্রমণ হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
তাছাড়া, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ক্যাবল মেরামত করা অত্যন্ত জটিল হবে, কারণ মেরামতকারী জাহাজগুলোকে দীর্ঘ সময় এক জায়গায় স্থির থাকতে হয়। বর্তমানে এই অঞ্চলে সাধারণত কাজ করা পাঁচটি রক্ষণাবেক্ষণ জাহাজের মধ্যে মাত্র একটি পারস্য উপসাগরের ভেতরে অবস্থান করছে।
নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে আন্তর্জাতিক অপারেটররা সাধারণত ইরানের জলসীমা এড়িয়ে ওমানের দিক দিয়ে ক্যাবল স্থাপন করেছে। তবে ‘ফ্যালকন’ এবং ‘গালফ ব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল’ (জিবিআই) নামের দুটি প্রধান ক্যাবল ইরানের জলসীমার মধ্য দিয়েই গেছে।
আইআরজিসির কমব্যাট ডাইভার (যুদ্ধক্ষেত্রের ডুবুরি), ছোট সাবমেরিন এবং পানির নিচের ড্রোনের মাধ্যমে যেকোনো ধরনের আক্রমণ বিভিন্ন মহাদেশে একটি চেইন-অ্যাকশন বা “ডিজিটাল বিপর্যয়” ডেকে আনতে পারে।
এই বিপর্যয়ের ফলে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ইন্টারনেট সংযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে, যা তাদের তেল-গ্যাস রপ্তানি এবং ব্যাংকিং খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এর বাইরে ভারতের বিশাল আউটসোর্সিং শিল্প বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
এটি সিঙ্গাপুরের মতো এশিয়ান ডাটা হাব এবং ইউরোপের ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশনগুলোর মধ্যকার সংযোগ ধীর করে দেবে, যার ফলে ইউরোপ-এশিয়ার মধ্যকার আর্থিক লেনদেন বাধাগ্রস্ত হবে এবং পূর্ব আফ্রিকার কিছু অংশে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট হতে পারে।
টেলিজিওগ্রাফির তথ্যমতে, ২০২৫ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের মাত্র ১%-এরও কম হরমুজ প্রণালী দিয়ে পার হলেও, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এর প্রভাব হবে অত্যন্ত তীব্র। ইতিপূর্বে ২০২৪ সালে লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের হামলায় তিনটি সাবমেরিন ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ওই অঞ্চলের ২৫ শতাংশ ইন্টারনেট ট্রাফিক ব্যাহত হয়েছিল।
ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো দাবি করেছে, তাদের জলসীমা দিয়ে যাওয়া ক্যাবলের জন্য ফি নেয়ার এই প্রস্তাব ১৯৮২ সালের জাতিসংঘের সমুদ্র আইন বিষয়ক কনভেনশন (ইউএনসিএলওএস)-এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ৭৯ অনুযায়ী উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর তাদের ভূখণ্ড বা জলসীমায় ক্যাবল প্রবেশের শর্ত নির্ধারণ করার অধিকার রয়েছে।
ইরান এক্ষেত্রে মিশরের উদাহরণ টেনেছে, যারা সুয়েজ খালের কৌশলগত অবস্থান ব্যবহার করে ইউরোপ ও এশিয়াকে সংযোগকারী সাবমেরিন ক্যাবল থেকে বার্ষিক লাখ লাখ ডলার ট্রানজিট এবং লাইসেন্স ফি আয় করে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, সুয়েজ খাল হলো মিশরের ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে খনন করা একটি কৃত্রিম জলপথ, পক্ষান্তরে হরমুজ প্রণালী একটি প্রাকৃতিক প্রণালী যা সম্পূর্ণ ভিন্ন আইনি কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয়। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের সোয়াসের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক ইরিনি পাপানিকোলপোলু জানান, বিদ্যমান ক্যাবলগুলোর ক্ষেত্রে ইরানকে আগের চুক্তি মেনে চলতে হবে, তবে নতুন ক্যাবল স্থাপনের ক্ষেত্রে যেকোনো শর্ত দেওয়ার অধিকার ইরানের রয়েছে।
ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের মধ্যপ্রাচ্য প্রধান দিনা এসফান্দিয়ারি মনে করেন, ইরান এই যুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিতে এমন একটি চড়া মূল্য চাপিয়ে দিতে চাইছে, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ ইরানকে আক্রমণ করার সাহস না পায়। হরমুজ প্রণালীর ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তেহরান এখন তার সামরিক শক্তির বাইরেও এক বিশাল অর্থনৈতিক ও কৌশলগত হাতিয়ারের সন্ধান পেয়েছে।

