ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সীমান্ত নিরাপত্তা, অনুপ্রবেশ এবং আইন-শৃঙ্খলা ইস্যুতে ধারাবাহিকভাবে কঠোর অবস্থানের বার্তা দিচ্ছেন। এবার তিনি দাবি করেছেন, তার সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশভিত্তিক জামায়াতপন্থিদের মধ্যে অস্বস্তি বেড়েছে।
সোমবার সন্ধ্যায় কলকাতার ভবানীপুর ও ক্যামাক স্ট্রিট এলাকায় আয়োজিত ধন্যবাদ জ্ঞাপন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে একাধিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিষয়ে কঠোর মন্তব্য করেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে জয় পাওয়ার পর ভোটারদের উদ্দেশে কৃতজ্ঞতা জানাতেই এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, সীমান্ত সুরক্ষিত করা এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো তার সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে এবং এখন তা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, যাঁরা অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছেন, তাঁদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াও শুরু হবে।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, তার ক্ষমতায় আসার পর পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়েও বাংলাদেশের জামায়াতঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর প্রতিক্রিয়া বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে তিনি এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য বা প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।
নিজেকে সাধারণ মানুষের ‘ভাই’ হিসেবে উল্লেখ করে শুভেন্দু বলেন, তিনি চাপের কাছে নতি স্বীকার করার রাজনীতি করেন না। নির্বাচনের আগে বিজেপি যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়নে তার সরকার কাজ করবে বলেও জানান তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ভোটার তালিকা থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের নাম বাদ দেওয়ার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে দ্রুত জমি বুঝিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আগে প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকের পর ৪৫ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় জমি হস্তান্তরের ঘোষণা দিয়েছিল তার সরকার।
শুধু সীমান্ত নয়, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও কড়া অবস্থান নিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। সম্প্রতি কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায় বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের ওপর হামলা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। ওই ঘটনায় ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
আহত পুলিশ সদস্যদের দেখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, পুলিশকে লক্ষ্য করে হামলা, ভাঙচুর, চাঁদাবাজি কিংবা সিন্ডিকেটভিত্তিক দখলদারিত্ব কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। তার ভাষায়, এ ধরনের ঘটনায় সরকারের অবস্থান হবে ‘জিরো টলারেন্স’।
আসানসোলে একটি পুলিশ ফাঁড়িতে হামলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে শুভেন্দু বলেন, সরকারি সম্পদ নষ্টের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ক্ষয়ক্ষতির পুরো অর্থ আদায় করা হবে। একই দিনে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার দ্বিতীয় বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ধর্মভিত্তিক ভাতা ব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্তও নেয়। এর আওতায় ইমাম, মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের জন্য চালু থাকা সরকারি ভাতা বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এ সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারের মূল দায়িত্ব শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা। তার দাবি, ভাতা খাতে ব্যয় হওয়া অর্থ এখন শিক্ষার্থীদের জন্য মেধাবৃত্তি কর্মসূচিতে ব্যবহার করা হবে, যাতে সব ধর্মের শিক্ষার্থীরা সমানভাবে উপকৃত হতে পারে। তিনি আরও বলেন, পশ্চিমবঙ্গে আর তোষণভিত্তিক রাজনীতি চলবে না। তার সরকার ধর্মের ভিত্তিতে নয়, সমান সুযোগের নীতিতে কাজ করবে বলে মন্তব্য করেন।
রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-কে লক্ষ্য করেও কড়া সমালোচনা করেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি দাবি করেন, নিজের শক্ত ঘাঁটি ভবানীপুরেও পরাজিত হওয়ায় মমতার রাজনৈতিক প্রভাব কমে গেছে। এ ছাড়া অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়সহ কয়েকজন তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তাদের সম্পদের তদন্তের ইঙ্গিত দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের হিসাব খতিয়ে দেখা হবে এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারি সেবা ও জনভোগান্তি কমাতে শিগগিরই একটি বিশেষ হেল্পলাইন চালুর ঘোষণাও দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। তার দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধানে প্রশাসনিক কার্যকারিতা কম ছিল, নতুন সরকার সেটি পরিবর্তনের উদ্যোগ নিচ্ছে।

