পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে সরানোর ঘটনা ঘিরে আবারও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রায় চার বছর আগের সেই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল কি না—এ প্রশ্ন এখন আবার সামনে এসেছে একটি গোপন কূটনৈতিক বার্তা ফাঁস হওয়ার পর।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক তদন্ত সংস্থা ড্রপ সাইট সম্প্রতি একটি নথি প্রকাশ করেছে, যেখানে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনার উল্লেখ রয়েছে। এই নথিকে কেন্দ্র করেই রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে।
ইমরান খান ২০২২ সালের এপ্রিলে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা হারান। সেই ঘটনার আগের সময়কালের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বৈঠকের তথ্য এই নথিতে উঠে এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। নথিতে উল্লেখ আছে, ওয়াশিংটনে নিযুক্ত পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত আসাদ মজিদ খান এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ডোনাল্ড লুর মধ্যে একটি বৈঠক হয়েছিল।
এই বৈঠকের বিষয়বস্তু নিয়েই এখন তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় বিতর্ক। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সেই আলোচনায় পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নেতৃত্ব পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইমরান খান দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছেন যে, তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পেছনে বিদেশি চাপ কাজ করেছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, তার সরকারের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, বিশেষ করে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ইউক্রেন ইস্যুতে নিরপেক্ষ অবস্থান—ওয়াশিংটনের অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
নথিতে আরও দাবি করা হয়েছে, ওই বৈঠকে ডোনাল্ড লু মত দিয়েছিলেন যে, যদি অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ইমরান খান ক্ষমতা হারান, তবে যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্ক স্বাভাবিক ও উন্নত হতে পারে।
একটি উদ্ধৃতি হিসেবে নথিতে বলা হয়েছে, অনাস্থা ভোট সফল হলে ওয়াশিংটন অতীতের সব বিষয় “ক্ষমা করে দেবে”—এ ধরনের বার্তা আলোচনায় এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
তবে এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আরও গভীর হয়েছে। ইমরান খান ও তার রাজনৈতিক সমর্থকরা এটিকে দীর্ঘদিনের “বিদেশি ষড়যন্ত্র” তত্ত্বের প্রমাণ হিসেবে দেখলেও, ওয়াশিংটন বরাবরই এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং সেখানে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপের প্রমাণ নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন নথি প্রকাশের ফলে পাকিস্তানের রাজনীতিতে পুরনো বিতর্ক আবারও নতুন করে জেগে উঠেছে। বিশেষ করে ইমরান খানের অপসারণ, পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সাম্প্রতিক নির্বাচনকে ঘিরে নানা প্রশ্নের সঙ্গে এটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ইমরান খান ক্ষমতা হারানোর পর পাকিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির মামলা হয় এবং তিনি কারাবন্দিও হন।
তার দল তেহরিক-ই-ইনসাফের ওপরও নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচনে প্রতীক ব্যবহার এবং প্রার্থী অংশগ্রহণ নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়, যা দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও বিতর্কিত করে তোলে।
সব মিলিয়ে, নতুন এই ফাঁস হওয়া নথি শুধু অতীত ঘটনার পুনর্বিশ্লেষণই নয়, বরং পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ইস্যু ভবিষ্যতেও দেশটির রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

