সান দিয়েগোর একটি মসজিদে ঘটে যাওয়া গুলির ঘটনা আবারও যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় বিদ্বেষ, অস্ত্র সহিংসতা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে কঠিন প্রশ্ন সামনে এনেছে। ১৮ মে ২০২৬ সোমবার সকালে ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো শহরের ইসলামিক সেন্টার অব সান দিয়েগোতে দুই কিশোর বন্দুকধারীর হামলায় তিনজন নিহত হন। পরে সন্দেহভাজন দুই হামলাকারীকেও একটি গাড়ির ভেতর মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে সম্ভাব্য বিদ্বেষমূলক অপরাধ হিসেবে তদন্ত করছে।
ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন মুসলিম বিশ্ব ঈদুল আজহা এবং পবিত্র হজের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। এই সময়ে মসজিদ শুধু প্রার্থনার স্থান নয়, বরং পরিবার, শিশু, প্রবীণ, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষের মিলনকেন্দ্র হয়ে ওঠে। তাই এই হামলা শুধু তিনটি প্রাণ কেড়ে নেওয়ার ঘটনা নয়; এটি একটি পুরো সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাবোধে আঘাত।
সান দিয়েগো পুলিশের প্রধান স্কট ওয়াল জানান, সোমবার সকাল ৯টা ৪২ মিনিটে পুলিশ প্রথম একটি ফোন পায়। একজন মা তাঁর ছেলেকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং জানান, তাঁর ছেলে আত্মঘাতী হতে পারে। তিনি আরও জানান, তাঁর কিছু অস্ত্র এবং একটি গাড়ি নিখোঁজ। এই তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের কাছে পরিস্থিতি দ্রুত গুরুতর হয়ে ওঠে।
এর প্রায় দুই ঘণ্টা পর, সকাল ১১টা ৪৩ মিনিটে, পুলিশ ৭০০০ ব্লক একস্ট্রম অ্যাভিনিউ এলাকায় সক্রিয় বন্দুকধারীর খবর পায়। খবর পাওয়ার প্রায় চার মিনিটের মধ্যেই কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান। সেখানে গিয়ে তারা মসজিদ ভবনের বাইরে তিনজনকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান। এরপর বড় পরিসরে নিরাপত্তা অভিযান শুরু হয়।
পুলিশ জানায়, প্রায় ৫০ থেকে ১০০ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্য মসজিদ কমপ্লেক্সে প্রবেশ করেন। তাদের একাধিক কক্ষে প্রবেশ করতে দরজা ভাঙতে হয়। তবে পুলিশ প্রধানের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো পুলিশ সদস্য অস্ত্র চালাননি। ঘটনাস্থলের আশপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আকাশ থেকে ধারণ করা দৃশ্যে দেখা যায়, অনেক শিশু হাত ধরে মসজিদের গাড়ি রাখার স্থান থেকে বেরিয়ে আসছে, চারপাশে পুলিশের গাড়ি ঘিরে রেখেছে এলাকা।
এই দৃশ্যই ঘটনার মানবিক দিকটি সবচেয়ে গভীরভাবে তুলে ধরে। একটি ধর্মীয় কেন্দ্রে শিশুরা পড়তে, শিখতে বা পরিবারের সঙ্গে থাকতে আসে; তারা কখনও আশা করে না যে সেখান থেকে জীবন বাঁচিয়ে পালাতে হবে। স্কট ওয়াল নিজেও বলেন, শিশুদের প্রাণ নিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে আসার দৃশ্য তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
ইসলামিক সেন্টার অব সান দিয়েগো শুধু একটি মসজিদ নয়। এটি সান দিয়েগো কাউন্টির সবচেয়ে বড় মসজিদ হিসেবে পরিচিত, যেখানে পাঁচ হাজারের বেশি মুসল্লির সমাগম হয়। একই কমপ্লেক্সে আল রাশিদ স্কুল রয়েছে, যেখানে পাঁচ বছর বা তার বেশি বয়সী শিশুদের আরবি, ইসলামিক শিক্ষা এবং কোরআন শেখানো হয়। অর্থাৎ হামলাটি এমন একটি স্থানে ঘটেছে, যেখানে ধর্মীয় চর্চার পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষা ও সামাজিক বিকাশের কাজও চলত।
মসজিদটি সান দিয়েগো শহরের কেন্দ্র থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার বা ৯ মাইল উত্তরে অবস্থিত। আশপাশে আবাসিক ভবন, অ্যাপার্টমেন্ট, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক খাবারের দোকান এবং বাজার রয়েছে। এই কেন্দ্রটি নিজেকে শুধু মুসলিমদের ধর্মীয় প্রয়োজন পূরণের স্থান হিসেবে নয়, বরং বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে সংযোগ, শিক্ষা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দেয়।
হামলার পর ইসলামিক সেন্টারের ইমাম তাহা হাসানে ঘটনাটির তীব্র নিন্দা জানান। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, মসজিদে মানুষ আসে প্রার্থনা করতে, উদ্যাপন করতে, শিক্ষা নিতে এবং একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে। তাই এমন স্থানে হামলা শুধু অপরাধ নয়, এটি সমাজের সহাবস্থানের ধারণার ওপর সরাসরি আঘাত।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সন্দেহভাজন দুই হামলাকারীর বয়স ছিল ১৭ এবং ১৯ বছর। তাদের সম্পর্কে এখনও সীমিত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। পুলিশের কাছে দেওয়া মায়ের বর্ণনা অনুযায়ী, তারা ছদ্মবেশী পোশাক পরে নিখোঁজ গাড়িতে চলাচল করছিল। তদন্তকারীরা আরও জানিয়েছেন, তাদের একজনের সঙ্গে ম্যাডিসন হাই স্কুলের কোনো ধরনের সম্পর্ক ছিল। এ কারণে বিদ্যালয় এলাকাতেও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়।
মায়ের পাওয়া একটি নোটের কথাও পুলিশ জানিয়েছে, যদিও সেই নোটের বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি। তবে পুলিশ প্রধান বলেন, সেখানে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ইঙ্গিত ছিল। তবুও এখন পর্যন্ত ইসলামিক সেন্টার অব সান দিয়েগোর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো হুমকির তথ্য পাওয়া যায়নি। এ কারণেই তদন্তকারীরা সতর্কভাবে ঘটনাটিকে সম্ভাব্য বিদ্বেষমূলক অপরাধ হিসেবে দেখছেন।
নিহত তিনজনের একজন ছিলেন মসজিদের নিরাপত্তাকর্মী। কর্মকর্তারা বলেছেন, তাঁর ভূমিকা হামলাকে আরও ভয়াবহ হতে দেয়নি। স্কট ওয়াল তাঁর কাজকে বীরত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, তিনি নিঃসন্দেহে অনেকের জীবন বাঁচিয়েছেন। কর্তৃপক্ষ এখনও তিন নিহতের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। তবে কমিউনিটি নেতারা নিরাপত্তাকর্মীকে আমিন আবদুল্লাহ হিসেবে শনাক্ত করেছেন। স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিনি আট সন্তানের বাবা ছিলেন।
এই তথ্যটি ঘটনাটিকে আরও বেদনাদায়ক করে তোলে। একজন নিরাপত্তাকর্মী, যিনি অন্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছিলেন, শেষ পর্যন্ত নিজেই প্রাণ হারালেন। তাঁর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, বরং একটি কমিউনিটির প্রতিরক্ষাকবচ হারানোর মতো।
হামলার পর আমেরিকান-ইসলামিক সম্পর্ক পরিষদ ঘটনাটির নিন্দা জানায়। সংগঠনটির সান দিয়েগো শাখার নির্বাহী পরিচালক তাজহিন নিজাম বলেন, কেউ যেন প্রার্থনা করতে বা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভয় না পায়। এই বক্তব্য শুধু একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রতিফলন।
নিউইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানি বলেন, ইসলামবিদ্বেষ মুসলিম সমাজকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। তাঁর মতে, ভয় ও বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেওয়া জরুরি। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজমও হামলায় শোক প্রকাশ করে বলেন, ঘৃণার কোনো স্থান ক্যালিফোর্নিয়ায় নেই।
এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে ভুল হবে। যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষ নিয়ে নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো বহু বছর ধরে সতর্ক করে আসছে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর থেকে তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ, অভিবাসনবিরোধী রাজনীতি, শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী প্রবণতা এবং সাম্প্রতিক গাজা যুদ্ধকে ঘিরে উত্তেজনা মুসলিম ও আরব সম্প্রদায়ের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
আমেরিকান-ইসলামিক সম্পর্ক পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মুসলিম ও আরববিরোধী অভিযোগের সংখ্যা ছিল ৮,৬৮৩টি। সংগঠনটি ১৯৯৬ সাল থেকে তথ্য প্রকাশ করছে, এবং তাদের মতে এটি ছিল সর্বোচ্চ সংখ্যা। এই পরিসংখ্যান দেখায়, বিদ্বেষমূলক ভাষা, সন্দেহের রাজনীতি এবং বাস্তব হামলার মধ্যে একটি বিপজ্জনক সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে।
২০২৫ সালের পরিস্থিতি নিয়ে সংগঠনটির প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক বক্তব্য অনেক সময় মুসলিমদের এবং ফিলিস্তিনি মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলা মানুষদের সন্দেহের চোখে দেখেছে। এর ফলে তারা ধর্মীয় ও নাগরিক নিরাপত্তার স্বাভাবিক পরিসর থেকে বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে অনেকের মনে ধারণা জন্মেছে।
এপ্রিল মাসে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের শুরু থেকে রিপাবলিকান নির্বাচিত কর্মকর্তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুসলিমবিরোধী বক্তব্য দ্রুত বেড়েছে। গবেষকেরা রিপাবলিকান গভর্নর ও কংগ্রেস সদস্যদের এক হাজার একশর বেশি পোস্টকে মুসলিমবিরোধী বিদ্বেষের সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
এই প্রেক্ষাপটে সান দিয়েগোর হামলা একটি বড় সতর্কসংকেত। যখন রাজনৈতিক ভাষা, সামাজিক সন্দেহ এবং অস্ত্রের সহজলভ্যতা একসঙ্গে কাজ করে, তখন বিদ্বেষ শুধু কথায় থাকে না; তা প্রাণঘাতী সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। মসজিদ, ইসলামিক স্কুল ও মুসলিম কমিউনিটি সেন্টারের ওপর সাম্প্রতিক হুমকি ও হামলার ঘটনাগুলো এই আশঙ্কাকেই শক্তিশালী করে।
এর আগে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রমজান মাসে পেনসিলভানিয়ার ম্যাটামোরাসে পাইক কাউন্টি ইসলামিক সেন্টারে গুলি চালানো হয়েছিল। এতে মসজিদের জানালা ও আসবাব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইলিনয়ে ছয় বছর বয়সী ফিলিস্তিনি-আমেরিকান শিশু ওয়াদিয়া আল-ফাইয়ুমিকে হত্যা করা হয়; প্রসিকিউটরদের মতে, গাজা যুদ্ধকে ঘিরে বিদ্বেষমূলক পরিবেশের সঙ্গে সেই ঘটনার সম্পর্ক ছিল।
মুসলিম নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও দীর্ঘদিন ধরে হুমকি ও হয়রানির মুখোমুখি হচ্ছেন। কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দিকের মুসলিম নারী কংগ্রেস সদস্যদের একজন, বারবার মৃত্যুর হুমকি ও মুসলিমবিরোধী আক্রমণের শিকার হয়েছেন।
সান দিয়েগোর ঘটনায় একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ: হামলাকারীরা ছিল কিশোর ও তরুণ। ১৭ এবং ১৯ বছর বয়সী দুই তরুণের হাতে অস্ত্র, নিখোঁজ গাড়ি, সম্ভাব্য আত্মঘাতী মনোভাব এবং বিদ্বেষমূলক বক্তব্য—এই সব মিলিয়ে শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, পরিবার, শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য, অনলাইন প্রভাব এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুকেই আলোচনায় আনতে হয়।
এই হামলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নিরাপত্তা শুধু পুলিশের দ্রুত উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে না। পরিবারে সতর্কতা, স্কুলে মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা, অনলাইন ঘৃণাচর্চার নজরদারি, অস্ত্র সংরক্ষণের দায়িত্বশীলতা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি সামাজিক সহমর্মিতা—সবই গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে কর্তৃপক্ষ ইসলামিক সেন্টার অব সান দিয়েগোর আশপাশের জেনেসিস সতর্কতা এলাকা কমিয়ে এনেছে। জরুরি প্রতিক্রিয়া পর্যায় থেকে তদন্ত পর্যায়ে যাওয়ার পর সীমাবদ্ধ এলাকা একস্ট্রম অ্যাভিনিউ, কসমো স্ট্রিট, বালবোয়া অ্যাভিনিউ এবং হ্যাথাওয়ে স্ট্রিটের মধ্যে সীমিত করা হয়েছে। তবুও বাসিন্দাদের এলাকা এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে, কারণ তদন্তকারীরা এখনও ঘটনাস্থলে কাজ করছেন।
শেষ পর্যন্ত, এই হামলা শুধু সান দিয়েগোর মুসলিম সমাজের জন্য নয়, পুরো আমেরিকান সমাজের জন্য এক গভীর আত্মসমালোচনার মুহূর্ত। একটি মসজিদে হামলা মানে শুধু একটি ধর্মীয় স্থানে হামলা নয়; এটি বহুত্ববাদ, নিরাপত্তা, নাগরিক মর্যাদা এবং পারস্পরিক সহাবস্থানের ওপর আঘাত।
প্রার্থনার স্থানে মানুষ ভয় নিয়ে যাবে—এমন সমাজ কোনোভাবেই সুস্থ সমাজ হতে পারে না। তাই সান দিয়েগোর রক্তাক্ত সকাল শুধু শোকের নয়, সতর্কতারও। ঘৃণার ভাষা কোথায় জন্ম নিচ্ছে, কারা তা ছড়াচ্ছে, কীভাবে তা তরুণদের হাতে অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে—এই প্রশ্নগুলোর জবাব না খুঁজলে এমন ঘটনা আবারও ঘটতে পারে।

