ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক যুদ্ধের শুরুর দিকেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক বিস্ময়কর অধ্যায় সামনে আসে। প্রকাশ্যে বলা হয়েছিল, এই সামরিক অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, সামরিক অবকাঠামো ও পারমাণবিক সক্ষমতা দুর্বল করা। কিন্তু পর্দার আড়ালে আরও বড় একটি রাজনৈতিক পরিকল্পনা চলছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। সেই পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ।
ঘটনাটি যতটা সামরিক, তার চেয়েও বেশি রাজনৈতিক। কারণ আহমাদিনেজাদ এমন একজন নেতা, যিনি দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির শক্ত সমর্থক ছিলেন, পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে তীব্র বক্তব্য দিতেন এবং ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানের জন্য বিশ্বজুড়ে আলোচিত ছিলেন। সেই ব্যক্তিকেই নাকি ইরানে সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্বের মুখ হিসেবে ভাবা হয়েছিল। এ কারণেই পুরো পরিকল্পনাটি শুধু সাহসী নয়, অনেকের কাছে অবাস্তবও মনে হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দিনেই তেহরানে আহমাদিনেজাদের বাড়ির কাছে ইসরায়েলি হামলা হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়েছে, ওই হামলার উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করা। কিন্তু পরিকল্পনাটি শুরুতেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। হামলায় আহমাদিনেজাদ আহত হন বলে দাবি করা হয়েছে। তিনি বেঁচে গেলেও এই ঘটনার পর ক্ষমতা বদলের পরিকল্পনা নিয়ে তাঁর আগ্রহ কমে যায়। এরপর থেকে তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তাঁর বর্তমান অবস্থান ও শারীরিক অবস্থা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এই ঘটনাকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কেন আহমাদিনেজাদ? ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট থাকা এই নেতা একসময় রাষ্ট্রক্ষমতার শক্তিশালী অংশ ছিলেন। কিন্তু ক্ষমতা ছাড়ার পর ধীরে ধীরে তিনি ইরানের শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে দূরত্বে চলে যান। তিনি সরকারের ভেতরের দুর্নীতি ও দুর্বল শাসন নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন। ২০১৭, ২০২১ ও ২০২৪ সালে তিনি আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়াতে চাইলেও ইরানের গার্ডিয়ান কাউন্সিল তাঁকে অনুমতি দেয়নি। তাঁর সহযোগীদের কেউ কেউ গ্রেপ্তার হন, আর তাঁর চলাফেরাও সীমিত হয়ে পড়ে।
এই অবস্থায় আহমাদিনেজাদ এক অদ্ভুত রাজনৈতিক চরিত্রে পরিণত হন। তিনি পুরোপুরি বিরোধী নেতা নন, আবার শাসকগোষ্ঠীর নির্ভরযোগ্য অংশও নন। ইরানের ভেতরে তাঁর কিছু জনসমর্থন ছিল, বিশেষ করে শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে। হয়তো এই কারণেই তাঁকে সম্ভাব্য বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে এই ভাবনা যে কতটা বাস্তবসম্মত ছিল, তা নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেও সন্দেহ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ইরানের ভেতর থেকেই কেউ ক্ষমতা নিলে সেটি ভালো হবে। এই বক্তব্য তখন অনেকের কাছে সাধারণ রাজনৈতিক মন্তব্য মনে হলেও পরে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পরিকল্পনায় নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তির কথা ভাবা হয়েছিল। সেই ব্যক্তি ছিলেন আহমাদিনেজাদ। তবে কীভাবে তাঁকে এই পরিকল্পনায় যুক্ত করা হয়েছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
যুদ্ধের শুরুর দিন, ফেব্রুয়ারি ২৮, ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তা নিহত হন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একই সময়ে আহমাদিনেজাদের বাড়ির কাছেও হামলা হয়। তাঁর বাড়ি বড় ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, কিন্তু বাড়ির প্রবেশপথের নিরাপত্তা চৌকি ধ্বংস হয়ে যায়। পরে ইরানি সংবাদমাধ্যমে প্রথমে তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়ালেও পরে বলা হয়, তিনি বেঁচে আছেন। নিহতদের মধ্যে যাদের দেহরক্ষী বলা হয়েছিল, তারা আসলে ইসলামী বিপ্লবী গার্ডের সদস্য ছিলেন, যারা একদিকে তাঁকে পাহারা দিচ্ছিলেন, অন্যদিকে তাঁকে কার্যত নজরবন্দি রেখেছিলেন।
এই ঘটনাকে কেউ কেউ গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করার অভিযান হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। মার্চ মাসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে আহমাদিনেজাদের সহযোগীদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, হামলাটি কার্যত তাঁকে বের করে আনার প্রচেষ্টা ছিল। পরে তাঁর এক সহযোগীও বলেন, আহমাদিনেজাদ নিজেও ঘটনাটিকে তাঁকে মুক্ত করার চেষ্টা হিসেবে দেখেছিলেন। ওই সহযোগীর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখছিল, যিনি ইরানের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেন।
তবে এখানেই পরিকল্পনার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আহমাদিনেজাদ এমন নেতা, যিনি একদিকে ইরানের পুরোনো শাসনব্যবস্থার অংশ, অন্যদিকে বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গে বিরোধে জড়িত। তাঁকে ব্যবহার করে শাসন পরিবর্তনের চেষ্টা করলে সাধারণ ইরানিরা সেটিকে কতটা গ্রহণ করত, তা বড় প্রশ্ন। বিদেশি শক্তির সহায়তায় ক্ষমতায় আসা কোনো নেতা ইরানের মতো জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতির দেশে সহজে গ্রহণযোগ্য হবেন কি না, সেটিও অনিশ্চিত।
ইসরায়েলের পরিকল্পনা ছিল কয়েক ধাপে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করা। প্রথম ধাপে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা, সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে হত্যা এবং কুর্দি বাহিনীকে সক্রিয় করার চিন্তা ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে তথ্য প্রচার ও প্রভাব বিস্তারমূলক অভিযানের মাধ্যমে ইরানের ভেতরে অস্থিরতা তৈরি করার পরিকল্পনা ছিল। তৃতীয় ধাপে বিদ্যুৎসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষতি, রাজনৈতিক চাপ এবং সামরিক বিপর্যয়ের ফলে সরকার ভেঙে পড়বে—এমন আশা করা হয়েছিল। এরপর একটি বিকল্প সরকার প্রতিষ্ঠার ধারণা ছিল।
কিন্তু বাস্তবে পরিকল্পনার বড় অংশই প্রত্যাশামতো এগোয়নি। বিমান হামলা ও শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করার অভিযান কিছু ক্ষেত্রে সফল হলেও ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থা দ্রুত ভেঙে পড়েনি। বরং দেখা যায়, ইরানের শাসন কাঠামো আগের ধারণার তুলনায় বেশি সহনশীল। এই জায়গায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বড় ধরনের ভুল হিসাব করেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা হতে পারে।
আহমাদিনেজাদের অতীতও তাঁকে ঘিরে পরিকল্পনাটিকে আরও জটিল করে তোলে। প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তিনি হলোকাস্ট অস্বীকারের মতো বিতর্কিত বক্তব্য দিয়েছিলেন। তিনি ইসরায়েলবিরোধী কঠোর ভাষার জন্য পরিচিত ছিলেন। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্প্রসারণের সময়ও তিনি ক্ষমতায় ছিলেন। ২০০৭ সালে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সরাসরি কাজ কয়েক বছর আগে বন্ধ করলেও পারমাণবিক জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাচ্ছিল, যা ভবিষ্যতে অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
তবে ক্ষমতা ছাড়ার পর আহমাদিনেজাদের অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যায়। তিনি ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সমালোচক হয়ে ওঠেন। ২০১৯ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ট্রাম্পের প্রশংসা করেন এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নতুনভাবে ভাবার কথা বলেন। তাঁর ভাষ্য ছিল, ট্রাম্প একজন কাজের মানুষ এবং ব্যবসায়ী হিসেবে ব্যয়-লাভের হিসাব বুঝতে পারেন। এই ধরনের বক্তব্য তাঁর পশ্চিমা যোগাযোগ নিয়ে জল্পনা আরও বাড়ায়।
তাঁর ঘনিষ্ঠদের নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। আহমাদিনেজাদের সাবেক প্রধান সহকারী এসফানদিয়ার রহিম মাশাইকে ২০১৮ সালে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়। তাঁর বিরুদ্ধে পশ্চিমা ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ তোলা হয়েছিল। যদিও এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।
গত কয়েক বছরে আহমাদিনেজাদের বিদেশ সফরও আলোচনায় আসে। ২০২৩ সালে তিনি গুয়াতেমালা যান। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তিনি হাঙ্গেরি সফর করেন। এই দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। হাঙ্গেরির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। এসব সফর আহমাদিনেজাদকে ঘিরে সন্দেহ ও জল্পনা আরও বাড়িয়ে দেয়।
ইরানে যুদ্ধ শুরু হলে আহমাদিনেজাদ আশ্চর্যজনকভাবে খুব কম কথা বলেন। যে ব্যক্তি একসময় ইসরায়েলকে ইরানের প্রধান শত্রু হিসেবে দেখতেন, তিনি সেই যুদ্ধের সময় সামাজিক মাধ্যমে খুব সীমিত প্রতিক্রিয়া দেন। ইরানি সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই তাঁর এই নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মৃত্যুর গুজব ছড়ানোর পর তাঁকে নিয়ে আলোচনা বাড়লেও পরে তা ধীরে ধীরে কমে যায়। শেষ পর্যন্ত আলোচনার জায়গা দখল করে নেয় একটি প্রশ্ন—তিনি কোথায়?
এই পুরো ঘটনাকে শুধু একটি ব্যর্থ সামরিক পরিকল্পনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি দেখায়, মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার রাজনীতিতে বিদেশি শক্তিগুলো এখনো শাসন পরিবর্তনকে কৌশল হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, বাইরে থেকে নেতৃত্ব বসানোর পরিকল্পনা প্রায়ই জটিল, অনিশ্চিত এবং বিপজ্জনক ফল বয়ে আনে। বিশেষ করে ইরানের মতো রাষ্ট্রে, যেখানে বিপ্লব, জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় শাসন, সামরিক শক্তি ও জনমত একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সামরিক অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা, উৎপাদন কেন্দ্র ভেঙে দেওয়া, নৌক্ষমতা দুর্বল করা এবং প্রক্সি শক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী তাদের লক্ষ্য অর্জন করেছে বা ছাড়িয়ে গেছে। তবে আহমাদিনেজাদকে ঘিরে যে পরিকল্পনার কথা সামনে এসেছে, তা যুদ্ধের ঘোষিত উদ্দেশ্যকে আরও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
সব মিলিয়ে আহমাদিনেজাদকে কেন্দ্র করে ক্ষমতা বদলের এই কথিত পরিকল্পনা ইরান যুদ্ধের ভেতরের আরেকটি যুদ্ধকে প্রকাশ করে। একদিকে ছিল বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক হামলা। অন্যদিকে ছিল নেতৃত্ব বদল, জনমত প্রভাবিত করা এবং বিকল্প সরকার প্রতিষ্ঠার হিসাব। কিন্তু ইরানের বাস্তবতা প্রমাণ করেছে, কাগজে আঁকা কৌশল মাঠের রাজনীতিতে সব সময় কাজ করে না।
এই ঘটনা শেষ পর্যন্ত তিনটি বড় শিক্ষা দেয়। প্রথমত, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমীকরণ বাইরে থেকে সহজে বোঝা যায় না। দ্বিতীয়ত, পুরোনো ক্ষমতাবান কিন্তু বিতর্কিত নেতাকে বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে দাঁড় করানো ঝুঁকিপূর্ণ। তৃতীয়ত, সামরিক শক্তি দিয়ে অবকাঠামো ভাঙা গেলেও একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো ভাঙা অনেক কঠিন।
আহমাদিনেজাদ এখন কোথায়, তিনি কতটা সুস্থ, কিংবা তিনি ভবিষ্যতে আবার ইরানের রাজনীতিতে ফিরবেন কি না—এসব প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। কিন্তু তাঁকে ঘিরে যে পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে এসেছে, তা ইরান যুদ্ধের ইতিহাসে এক অস্বস্তিকর ও বিস্ময়কর অধ্যায় হয়ে থাকবে।

