চীনের উত্তরাঞ্চলের একটি কয়লাখনিতে ভয়াবহ গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তত ৯০জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার পর খনির ভেতরে আটকে পড়েছেন আরও বহু শ্রমিক। উদ্ধারকারীরা সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ চালিয়ে গেলেও পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
শুক্রবার (২২ মে) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে চীনের শানসি প্রদেশের লিউশেনইউ কয়লাখনিতে এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণের মুহূর্তে খনির গভীরে শত শত শ্রমিক কাজ করছিলেন। আচমকা বিকট শব্দ, ধোঁয়া আর বিষাক্ত গ্যাসে পুরো এলাকা আতঙ্কে ছড়িয়ে পড়ে।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় খনির ভেতরে মোট ২৪৭ জন শ্রমিক অবস্থান করছিলেন। শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২০১ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে এখনও অন্তত ৩৮ জন শ্রমিক খনির নিচে আটকা রয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় জরুরি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।
উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকলেও পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে খনির ভেতরে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাসের কারণে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, বিস্ফোরণের আগে খনিটিতে কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। গন্ধহীন এই বিষাক্ত গ্যাস দ্রুত মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাসে প্রভাব ফেলে এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, ভেতরে আটকে পড়া কয়েকজন শ্রমিকের অবস্থা আশঙ্কাজনক হতে পারে। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে বিষাক্ত গ্যাসের মধ্যে আটকা থাকার ফলে অক্সিজেনের ঘাটতি ও শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ঘটনার পরপরই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আহতদের চিকিৎসায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, এই দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশের সব অঞ্চল ও সংশ্লিষ্ট বিভাগকে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কঠোর হতে হবে। বিশেষ করে খনি ও ভারী শিল্পখাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ধরনের গাফিলতি যেন না থাকে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শানসি প্রদেশকে চীনের কয়লা শিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেশটির জ্বালানি খাতের বড় অংশই এখনও কয়লার ওপর নির্ভরশীল। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খনি নিরাপত্তা উন্নয়নের দাবি করেছে বেইজিং, বাস্তবে এখনো নিয়মিত দুর্ঘটনার খবর সামনে আসছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর চাপ, নিরাপত্তা নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করা এবং পুরোনো অবকাঠামো— এসব কারণে চীনের খনি খাতে দুর্ঘটনা পুরোপুরি কমছে না। অনেক সময় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ উৎপাদন সচল রাখতে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিও উপেক্ষা করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কয়লা ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে চীনের শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী রাষ্ট্রও। যদিও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় বিনিয়োগ করছে চীন, তবুও বাস্তবতা হলো— তাদের অর্থনীতির বড় অংশ এখনো কয়লাভিত্তিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল।
এই দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, শিল্পোন্নয়ন ও উৎপাদনের প্রতিযোগিতার আড়ালে শ্রমিকদের নিরাপত্তা কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়ে গেছে। খনির অন্ধকারে আটকে থাকা শ্রমিকদের পরিবার এখন শুধু একটি খবরের অপেক্ষায়— তাদের প্রিয়জনেরা জীবিত ফিরবেন কি না।

