ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানি ও জনসমক্ষে পশু জবাই নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কলকাতা হাইকোর্টের এক পর্যবেক্ষণ ঘিরে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। আদালত বলেছেন, গরু কোরবানি দেওয়া ঈদুল আজহার অবিচ্ছেদ্য অংশ নয় এবং ইসলামের বিধান অনুযায়ী এটি বাধ্যতামূলক ধর্মীয় কাজও নয়। একই সঙ্গে উন্মুক্ত জনপরিসরে গবাদিপশু জবাইয়ের ওপর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জারি করা নিষেধাজ্ঞাও বহাল রাখা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সুজয় পাল ও বিচারপতি পার্থ সারথি সেনের সমন্বয়ে গঠিত একটি বেঞ্চ এই আদেশ দেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, উন্মুক্ত জনপরিসরে গরু, মহিষ কিংবা অন্য কোনো প্রাণী জবাই করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ থাকবে। একই সঙ্গে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি পুরোনো মামলার রায়ের প্রসঙ্গ টেনে আদালত বলেন, গরু কোরবানি ঈদুল আজহার অপরিহার্য অংশ নয় এবং ইসলামের দৃষ্টিতেও এটি বাধ্যতামূলক ধর্মীয় বিধান হিসেবে বিবেচিত নয়।
আদালতের এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়। কেউ এটিকে আইনি ব্যাখ্যা হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে ধর্মীয় বিষয়ে আদালতের এমন পর্যবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত বিজেপি সরকার পশু জবাই নিয়ন্ত্রণে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। গত ১৩ মে প্রকাশিত সেই নির্দেশনায় বলা হয়, জনসমক্ষে কোনো প্রাণী জবাই করা যাবে না। পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের দেওয়া সুস্থতার ছাড়পত্র ছাড়া পশু জবাই নিষিদ্ধ থাকবে। এই নির্দেশ অমান্য করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়।
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হন কয়েকজন আবেদনকারী। তাদের মধ্যে ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্রসহ আরও অনেকে। আবেদনকারীরা দাবি করেন, ঈদুল আজহার সময় ধর্মীয় আচার পালনের জন্য ১৯৫০ সালের প্রাণী জবাই নিয়ন্ত্রণ আইনের ১২ ধারার আওতায় বিশেষ ছাড় দেওয়া উচিত।
তবে আদালত সরাসরি নিষেধাজ্ঞা স্থগিত না করে জানিয়েছে, এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব রাজ্য সরকারের। অর্থাৎ বিশেষ ছাড় দেওয়া হবে কি না, তা সরকারই নির্ধারণ করবে।
পশ্চিমবঙ্গে পশু জবাই ও কোরবানি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন নয়। তবে এবার বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক পালাবদলের কারণে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এই ধরনের সিদ্ধান্ত ধর্মীয় আবেগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়াতে পারে। অন্যদিকে সরকার বলছে, এটি ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নয়; বরং জনস্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা ও আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করার উদ্যোগ।
বিশ্লেষকদের মতে, আদালতের এই রায় শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনার বৈধতা নিয়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা ধর্ম, রাজনীতি, সংবিধান এবং সামাজিক সহাবস্থানের প্রশ্নকেও নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। ঈদুল আজহা যত এগিয়ে আসছে, পশ্চিমবঙ্গে এই বিতর্কও ততই তীব্র হয়ে উঠছে।

