ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে পরিচালিত ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান শুধু ব্যয়বহুল বা কৌশলগতভাবে ব্যর্থ ছিল কি না—প্রশ্নটি এখন তার চেয়েও গভীরে পৌঁছেছে। মূল প্রশ্ন হলো, এই যুদ্ধ কি শুধু অবৈধ ছিল, নাকি এটি আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় “আগ্রাসনের অপরাধ” হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে?
যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছিল “অপারেশন এপিক ফিউরি”। সমালোচকদের অনেকেই, এমনকি রাজনৈতিক ডানপন্থী ঘরানার কিছু পর্যবেক্ষকও, এটিকে ব্যঙ্গ করে “অপারেশন এপিক ফেল” বলতে শুরু করেন। তাদের অভিযোগ, এই অভিযান ছিল বিপুল অর্থ, সামরিক সরঞ্জাম এবং প্রাণহানির বিনিময়ে পরিচালিত এক অগোছালো যুদ্ধ, যার উদ্দেশ্য বারবার বদলেছে এবং যার কৌশলগত যুক্তি শুরু থেকেই দুর্বল ছিল।
তবে যুদ্ধের কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক যতই তীব্র হোক, আইনি প্রশ্নটি আরও গুরুতর। আন্তর্জাতিক আইনের বহু পর্যবেক্ষকের মতে, জাতিসংঘ সনদে সামরিক শক্তি ব্যবহারের যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, এই যুদ্ধ তা লঙ্ঘন করেছে। জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র সাধারণত দুই অবস্থায় সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে পারে: আত্মরক্ষার প্রয়োজনে, অথবা নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন নিয়ে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের ক্ষেত্রে এই দুই শর্তের কোনটি কতটা পূরণ হয়েছিল, সেটিই বিতর্কের কেন্দ্রে।
কিন্তু এখানে আরেকটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। কোনো যুদ্ধ অবৈধ হলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ হয়ে যায় না। অবৈধ যুদ্ধের জন্য রাষ্ট্রকে নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ বা আন্তর্জাতিক নিন্দার মুখে পড়তে হতে পারে। কিন্তু “অপরাধমূলক যুদ্ধ” হলে দায় সরাসরি রাষ্ট্রনেতা, সামরিক পরিকল্পনাকারী ও নীতিনির্ধারকদের ওপর বর্তাতে পারে। অর্থাৎ তখন প্রশ্ন ওঠে—যারা যুদ্ধের পরিকল্পনা করেছে, নির্দেশ দিয়েছে বা তা বাস্তবায়ন করেছে, তাদের কি আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা উচিত?
এই পার্থক্য বোঝা জরুরি। কারণ অবৈধতা রাষ্ট্রীয় দায়ের বিষয় হতে পারে, কিন্তু আগ্রাসনের অপরাধ ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায় তৈরি করে। এই জায়গাতেই ট্রাম্পের ইরান অভিযান নিয়ে বিতর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রথম কৌঁসুলি লুইস মোরেনো ওকাম্পো বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই অভিযানকে আগ্রাসনের অপরাধ হিসেবে দেখার কথা বলেন। তার মতো একজন অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক আইনবিদ যখন এমন মন্তব্য করেন, তখন বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক মতামতের পর্যায়ে থাকে না; এটি আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার এক গভীর অনিশ্চয়তাকে সামনে আনে।
আগ্রাসনের অপরাধ ধারণাটি নতুন নয়, তবে এর আইনি রূপ এখনও বিতর্কিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাৎসি নেতাদের বিচারের জন্য নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল গঠনের সময় প্রথম বড় পরিসরে আগ্রাসী যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেখানে ২২ জন নাৎসি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছিল, তার কেন্দ্রে ছিল “শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ”। নুরেমবার্গ আদালত আগ্রাসী যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক আইনের সবচেয়ে গুরুতর অপরাধগুলোর একটি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল।
তবে সমস্যাটি শুরু হয়েছিল সেখানেই। যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের তুলনায় “শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ” বা আগ্রাসনের অপরাধের সংজ্ঞা তখন যথেষ্ট স্পষ্ট ছিল না। নাৎসি জার্মানির পূর্ব ফ্রন্টের আগ্রাসন এতটাই নির্মম ও বর্বর ছিল যে যুদ্ধ এবং গণঅত্যাচারের সীমারেখা অনেক ক্ষেত্রে মুছে গিয়েছিল। ফলে আদালতের কাছে নাৎসি আগ্রাসনকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা তুলনামূলক সহজ ছিল। কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য স্পষ্ট প্রশ্নটি রয়ে যায়: সব আগ্রাসী যুদ্ধ কি অপরাধ? নাকি শুধু সেই যুদ্ধগুলো অপরাধ, যেখানে ব্যাপক নৃশংসতা, বেসামরিক মানুষের ওপর পদ্ধতিগত হামলা বা গণহত্যার মতো ঘটনা জড়িত থাকে?
এই প্রশ্নের উত্তর আজও সহজ নয়। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার মতো আন্তর্জাতিক অপরাধ সাধারণত ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর ওপর ভয়াবহ ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু আগ্রাসনের অপরাধ অনেক সময় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার ওপর আঘাতের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে প্রশ্ন ওঠে, আগ্রাসনের অপরাধ কি মানুষের সুরক্ষার জন্য, নাকি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য? এই দ্বিধাই আন্তর্জাতিক আইনকে দীর্ঘদিন ধরে জটিল করে রেখেছে।
জাতিসংঘ নুরেমবার্গের উত্তরাধিকারকে এগিয়ে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু শীতল যুদ্ধের রাজনৈতিক বিভাজন এই কাজকে বাধাগ্রস্ত করে। বহু বছর ধরে কূটনীতিক ও আইনবিদেরা আগ্রাসনের অপরাধের গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা খুঁজতে ব্যস্ত ছিলেন। এমনকি কোনো সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব বা প্রয়োজন কি না, সেটি নিয়েও দীর্ঘ বিতর্ক চলেছে। শেষ পর্যন্ত ২০১০ সালে রোম সংবিধির পর্যালোচনা সম্মেলনে আগ্রাসনের অপরাধের একটি সংজ্ঞা গ্রহণ করা হয়। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এই অপরাধের ওপর কার্যকর বিচারিক ক্ষমতা পায় ২০১৭ সালে।
এই সংজ্ঞা অনুযায়ী, সব অবৈধ আগ্রাসন আগ্রাসনের অপরাধ নয়। কোনো আগ্রাসী কাজকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হলে তার চরিত্র, গুরুতরতা এবং পরিসর এমন হতে হবে, যাতে তা জাতিসংঘ সনদের প্রকাশ্য ও গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এই ভাষা নিজেই অস্পষ্ট। “চরিত্র”, “গুরুতরতা”, “পরিসর” এবং “প্রকাশ্য লঙ্ঘন”—এসব শব্দের আইনি অর্থ কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত, তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই।
এই অস্পষ্টতার কারণেই ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধকে বিচার করা সহজ নয়। একদিকে বলা যায়, যদি কোনো রাষ্ট্র আত্মরক্ষা বা নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়াই বড় আকারের সামরিক অভিযান চালায়, তবে সেটি আগ্রাসনের কাছাকাছি চলে যায়। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে প্রমাণ করতে হলে শুধু যুদ্ধের অবৈধতা নয়, যুদ্ধ পরিচালনার ধরন, লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন, বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি এবং নেতাদের উদ্দেশ্যও বিবেচনায় নিতে হয়।
লেখাটিতে রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধের উদাহরণ আনা হয়েছে। ভ্লাদিমির পুতিনের ইউক্রেন আক্রমণকে আগ্রাসনের অপরাধের একটি স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। কারণ সেখানে আক্রমণের প্রকাশ্যতা, যুক্তির দুর্বলতা, বেসামরিক মানুষের ওপর নৃশংস ও নির্বিচার হামলা—সব মিলিয়ে অপরাধের মাত্রা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই উদাহরণ দিয়ে বোঝানো হয়েছে, আগ্রাসনের অপরাধ কেবল সীমান্ত অতিক্রম করা নয়; এটি এমন এক যুদ্ধ, যেখানে রাষ্ট্রীয় শক্তি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি তুলনামূলক জটিল। অভিযোগ আছে, অভিযানে ১৩,০০০ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে, যার মধ্যে শিশুতে পূর্ণ একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও ছিল। এর সঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের কথিত মন্তব্য—যেখানে তিনি “সংঘর্ষের বোকা নিয়ম” পাশ কাটানোর ইঙ্গিত দেন—সমালোচকদের কাছে যুদ্ধটিকে আরও উদ্বেগজনক করে তোলে। এসব তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করলে অনেকে বলতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন অপরাধের পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তবে পাল্টা যুক্তিও রয়েছে। রাশিয়ার ক্ষেত্রে যেমন বেসামরিক জনগণকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানোর অভিযোগ স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ইরান অভিযানের ক্ষেত্রে সেই একই মাত্রার ইচ্ছাকৃত বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুকরণ প্রমাণ করা কঠিন। এই কারণেই বিষয়টি আইনগতভাবে অস্পষ্ট থেকে যায়। যুদ্ধ অবৈধ হতে পারে, ভয়াবহও হতে পারে, কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ব্যক্তিগত দায় প্রমাণের জন্য আরও নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ করতে হয়।
সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো, এই বিতর্ক অনেকাংশে তাত্ত্বিক থেকে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে। কারণ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আগ্রাসনের অপরাধ বিচার করার ক্ষমতা নানা সীমাবদ্ধতায় ঘেরা। এমনকি পুতিন যদি হঠাৎ হেগে উপস্থিত হন, তবুও আদালত আগ্রাসনের অপরাধে তাকে বিচার করতে পারবে কি না, তা নিয়ে গুরুতর আইনি বাধা রয়েছে। এই সীমাবদ্ধতা আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে আনে।
এখানেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিদ্রূপটি দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া—এই দুই রাষ্ট্রই একসময় নুরেমবার্গ বিচারের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তারাই আগ্রাসী যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক আইনের সর্বোচ্চ অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিয়েছিল। অথচ এখন এই দুই শক্তিই সেই ব্যবস্থাকে দুর্বল করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে বলে অভিযোগ উঠছে।
ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ তাই শুধু একটি সামরিক অভিযানের গল্প নয়। এটি আন্তর্জাতিক আইনের সীমাবদ্ধতা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অহংকার এবং বৈশ্বিক বিচারব্যবস্থার দ্বিচারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে। যুদ্ধের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়, কিন্তু আগ্রাসনের অপরাধ প্রমাণের প্রশ্ন আজও রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য, আইনি অস্পষ্টতা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতার মধ্যে আটকে আছে।
সবশেষে বলা যায়, ট্রাম্পের ইরান অভিযানকে অবৈধ যুদ্ধ বলা সহজ হতে পারে, কিন্তু একে আগ্রাসনের অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা অনেক বেশি কঠিন। কারণ আন্তর্জাতিক আইন এখানে এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়, আর বিচারিক কাঠামোও শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে সমানভাবে কার্যকর নয়। এই বাস্তবতাই সবচেয়ে উদ্বেগজনক। আইন যদি দুর্বলদের জন্য কঠোর এবং শক্তিশালীদের জন্য নমনীয় হয়ে যায়, তবে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের ধারণাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

