বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্য এখন আর ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে একটি বড় বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হচ্ছে। নতুন এক গবেষণার তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে বিশ্বে প্রায় ১২০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ছিলেন। সংখ্যাটি শুধু বড় নয়, উদ্বেগজনকও; কারণ ১৯৯০ সালের তুলনায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ৯৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
২২ মে ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত গবেষণায় বিশ্বজুড়ে মানসিক সমস্যার বিস্তৃতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা যায়, উদ্বেগজনিত সমস্যা ও বিষণ্নতা সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে এবং ২০২৩ সালে এগুলোই ছিল সবচেয়ে বেশি দেখা যাওয়া মানসিক সমস্যা। এর পরের অবস্থানে রয়েছে ব্যক্তিত্বজনিত মানসিক সমস্যা।
গবেষণাটি ২০৪টি দেশ ও অঞ্চলের তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়েছে। এতে বয়স, লিঙ্গ, ভৌগোলিক অবস্থান এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে ১২ ধরনের মানসিক সমস্যার প্রবণতা পর্যালোচনা করা হয়। গবেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা শুধু চিকিৎসাব্যবস্থার বিষয় নয়; এটি এখন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী গুরুত্বের বিষয়।
গবেষণার প্রধান লেখক এবং অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড্যামিয়ান সান্তোমাউরো বলেছেন, ফলাফলের ব্যাপকতা তাকে বিস্মিত করেছে। তার মতে, এই সংকটের পেছনে একক কোনো কারণ নেই। বরং জীবনের নানা চাপ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, সহিংসতা, বৈষম্য, যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে। তিনি মনে করেন, ঝুঁকির কারণগুলো মোকাবিলায় বৈশ্বিক পর্যায়ে শক্তিশালী নেতৃত্ব ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
গবেষণায় যেসব মানসিক সমস্যাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, বাইপোলার ডিসঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া, অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার, এডিএইচডি, অ্যানোরেক্সিয়া, বুলিমিয়া, ডিস্টাইমিয়া, কন্ডাক্ট ডিসঅর্ডার, ব্যক্তিত্বজনিত মানসিক সমস্যা এবং অজ্ঞাত কারণে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা।
তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ সালের তুলনায় উদ্বেগজনিত সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ১৫৮ শতাংশ। একই সময়ে বিষণ্নতায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ১৩১ শতাংশ। এই দুটি সমস্যা এখন বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় বোঝা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। যদিও অ্যানোরেক্সিয়া, বুলিমিয়া ও সিজোফ্রেনিয়া তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়, তবু এগুলোর সংখ্যাও অবহেলা করার মতো নয়। ২০২৩ সালে অ্যানোরেক্সিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন প্রায় ৪০ লাখ মানুষ, বুলিমিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ এবং সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারী ও পুরুষের মধ্যে মানসিক সমস্যার ধরনে পার্থক্য। অধিকাংশ মানসিক সমস্যা নারীদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও অটিজম, কন্ডাক্ট ডিসঅর্ডার, এডিএইচডি, ব্যক্তিত্বজনিত মানসিক সমস্যা এবং অজ্ঞাত কারণে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা পুরুষদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা গেছে। এই পার্থক্য দেখায় যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনার ক্ষেত্রে একই ধরনের পদ্ধতি সবার জন্য কার্যকর নাও হতে পারে। বয়স, লিঙ্গ, সামাজিক অবস্থান এবং জীবনযাপনের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সেবা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সাজানো জরুরি।
কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাবও গবেষণায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। মহামারির আগেই উদ্বেগ ও বিষণ্নতার হার বাড়ছিল। কিন্তু মহামারির সময় বিষণ্নতা আরও তীব্রভাবে বেড়ে যায় এবং ২০২৩ সাল পর্যন্ত তা আগের অবস্থায় ফিরে আসেনি। উদ্বেগজনিত সমস্যাও একইভাবে উচ্চ পর্যায়ে ছিল। দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থাকা, আয় কমে যাওয়া, প্রিয়জন হারানোর শোক, শিক্ষা ও কর্মজীবনে অনিশ্চয়তা, চিকিৎসা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা—এসব বিষয় মানুষের মানসিক অবস্থায় গভীর প্রভাব ফেলেছে।
গবেষণাটি ২০২৩ সালের রোগ, আঘাত ও ঝুঁকির বৈশ্বিক বোঝা সম্পর্কিত বৃহৎ গবেষণা উদ্যোগের তথ্য বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য পরিমাপ ও মূল্যায়ন ইনস্টিটিউট পরিচালিত এই উদ্যোগকে বিশ্বে স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বোঝার অন্যতম বড় গবেষণা প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মানসিক সমস্যা এখন অক্ষমতার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে নারী এবং ১৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এর প্রভাব বেশি দেখা যাচ্ছে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে মানসিক সমস্যার হার এবারই প্রথম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগে সাধারণত মধ্যবয়সীদের মধ্যে মানসিক সমস্যার প্রবণতা বেশি দেখা যেত। এই পরিবর্তন ভবিষ্যতের জন্য বড় সতর্কবার্তা।
কৈশোর ও তরুণ বয়স মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ, আত্মপরিচয় গঠন, সম্পর্ক তৈরি, শিক্ষা, কর্মজীবনের প্রস্তুতি এবং সামাজিক দক্ষতা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে মানসিক সমস্যা দেখা দিলে তার প্রভাব অনেক দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া, সামাজিক যোগাযোগে ভীতি, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, কর্মজীবনে পিছিয়ে পড়া এবং সম্পর্কের জটিলতা—এসব সমস্যা পরবর্তী জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগের তুলনায় এখন মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক কলঙ্ক কিছুটা কমেছে। ফলে অনেকেই চিকিৎসা নিতে বা নিজের সমস্যা নিয়ে কথা বলতে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। একই সঙ্গে সমস্যা শনাক্ত করার পদ্ধতি ও চিকিৎসা ব্যবস্থাও উন্নত হয়েছে। এসব কারণে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেশি ধরা পড়ছে। তবে শুধু শনাক্তকরণ বাড়াই এই বৃদ্ধির একমাত্র কারণ নয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, মানুষের দীর্ঘায়ু, জীবনযাত্রার চাপ এবং সামাজিক বাস্তবতার পরিবর্তনও এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে।
আজকের পৃথিবীতে মানসিক চাপ তৈরির কারণও আগের তুলনায় বহুমুখী। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, চাকরির প্রতিযোগিতা, শিক্ষাজীবনের চাপ, পারিবারিক সহিংসতা, একাকিত্ব, সামাজিক বৈষম্য, যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পরিবেশগত ঝুঁকি মানুষের মানসিক সুস্থতাকে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অনেক দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো সহজলভ্য নয়। কোথাও চিকিৎসক কম, কোথাও খরচ বেশি, আবার কোথাও মানসিক সমস্যা নিয়ে কথা বলাকেই দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়।
গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, মানসিক সমস্যার বোঝা দ্রুত বাড়লেও সেই তুলনায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারিত হয়নি। এটি বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি করছে। অনেক মানুষ সমস্যায় ভুগছেন, কিন্তু সময়মতো সহায়তা পাচ্ছেন না। কেউ চিকিৎসা নিতে ভয় পাচ্ছেন, কেউ জানেন না কোথায় যাবেন, আবার কেউ চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারছেন না।
এই বাস্তবতায় মানসিক স্বাস্থ্যকে সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা বাড়ালেই হবে না; স্কুল, পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে মানসিক সুস্থতা নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে শিশু, কিশোর, নারী এবং তরুণদের জন্য সহজলভ্য পরামর্শসেবা, সহায়ক পরিবেশ এবং দ্রুত শনাক্তকরণ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
প্রায় ১২০ কোটি মানুষের মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার তথ্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি বোঝায়, বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ নীরবে লড়াই করছেন। তাদের অনেকেই বাইরে থেকে স্বাভাবিক দেখালেও ভেতরে ভেতরে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ভয়, একাকিত্ব বা অস্থিরতার সঙ্গে সংগ্রাম করছেন। তাই মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা করার সময় আর নেই। এটি ব্যক্তির সুস্থতা, পরিবারের স্থিতি, সমাজের উৎপাদনশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিকাশের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন। গবেষণার এই ফলাফল বিশ্বনেতা, নীতিনির্ধারক, চিকিৎসাব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পরিবার—সবাইকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। কারণ শরীরের অসুখের মতো মনের অসুখও বাস্তব। আর সময়মতো যত্ন, সহানুভূতি ও চিকিৎসা পেলে অনেক মানুষ সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পারেন।

