ভারত এখন এমন এক গ্রীষ্মের মুখোমুখি, যা শুধু ঋতুর স্বাভাবিক পরিবর্তন নয়; এটি মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, জীবিকা ও ভবিষ্যৎকে একসঙ্গে বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ২২ মে ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল বেশি গরমের গল্প নয়। এটি একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকট, একটি নগর পরিকল্পনার ব্যর্থতা, একটি পরিবেশগত বিপর্যয় এবং একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার কঠিন উদাহরণ।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। কোথাও কোথাও তা ৪৬ ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছেছে। মহারাষ্ট্রের বিদর্ভ অঞ্চলের আকোলায় ২৬ এপ্রিল দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪৬.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই সংখ্যা শুধু আবহাওয়ার পরিসংখ্যান নয়; এর ভেতরে আছে অসংখ্য মানুষের হাঁপিয়ে ওঠা শরীর, কাজ হারানো দিনমজুর, মাঠে যেতে না পারা কৃষক, অসুস্থ হয়ে পড়া বৃদ্ধ, পানির জন্য অপেক্ষা করা বস্তিবাসী এবং রাস্তায় জীবিকা চালানো মানুষের নিঃশব্দ কষ্ট।
তাপপ্রবাহের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এটি ধীরে ধীরে আঘাত করে। ঝড়, বন্যা বা ভূমিকম্পের মতো এর শব্দ নেই, দৃশ্যমান ধ্বংসস্তূপও নেই। কিন্তু এর প্রভাব অনেক গভীর। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদমশুমারির কাজে থাকা কর্মী মারা গেছেন, পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভোট দিতে বের হওয়া মানুষ মারা গেছেন, এমনকি এক ব্যক্তি বিয়েতে যাওয়ার জন্য বাসে উঠলেও গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই মারা যান। এপ্রিলের শেষ দিকে এক দিনে বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ ৫০টি শহরের সবগুলোই ছিল ভারতে। এই তথ্য বোঝায়, সংকটটি বিচ্ছিন্ন নয়; এটি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এক ভয়াবহ বাস্তবতা।
এই তাপপ্রবাহ শুধু অস্বস্তি তৈরি করছে না, মানুষের শরীরের স্বাভাবিক কাজ করার ক্ষমতাকেও ভেঙে দিচ্ছে। অতিরিক্ত গরমে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ে, কিডনির ক্ষতি হতে পারে, ঘুমের মান কমে যায় এবং ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্ট ও মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যাও বাড়তে পারে। গরম যখন দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী হয়, তখন শরীর নিজেকে ঠান্ডা রাখতে পারে না। বিশেষ করে যারা খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন, যারা পর্যাপ্ত পানি পান করতে পারেন না, যারা ঘরে পাখা বা শীতল পরিবেশ পান না—তাদের জন্য এই গরম সরাসরি জীবনঘাতী হয়ে ওঠে।
তবু সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, তাপে কত মানুষ মারা যাচ্ছে তার পূর্ণ হিসাব অনেক ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় না। সংবাদপত্রে কিছু মৃত্যুর খবর আসে, কিন্তু বাস্তবে সংখ্যাটি আরও বেশি হতে পারে। কারণ তাপজনিত মৃত্যু অনেক সময় অন্য রোগের নামে নথিভুক্ত হয়। কেউ হৃদ্রোগে মারা গেলে, কেউ কিডনি বিকল হয়ে মারা গেলে, কেউ ঘুমের ঘাটতি ও পানিশূন্যতায় অসুস্থ হয়ে মারা গেলে—সেসব মৃত্যুর পেছনে তাপপ্রবাহের ভূমিকা অনেক সময় আলাদা করে লেখা হয় না। ফলে দুর্যোগটি চোখের সামনে থাকলেও তার প্রকৃত আকার অদৃশ্য থেকে যায়।
ভারতের ১৬তম অর্থ কমিশন তাপপ্রবাহকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি পেলে প্রতিরোধ, ক্ষতিপূরণ ও জরুরি সহায়তার পথ কিছুটা সহজ হতে পারে। কিন্তু বাস্তব সমস্যা হলো প্রশাসনিক জটিলতা। দুর্যোগের তহবিল থেকে অর্থ পাওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তা দেওয়া কিংবা মৃত্যুর স্বীকৃতি নিশ্চিত করা—এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা অনেক সময় মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দেয়। যে পরিবার একজন উপার্জনক্ষম মানুষ হারায়, তাদের কাছে কাগজপত্রের জটিলতা আরেক ধরনের শাস্তি হয়ে দাঁড়ায়।
বিশ্বের অনেক দেশ যখন জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় গাছ, জলাভূমি, সবুজ এলাকা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষাকে গুরুত্ব দিচ্ছে, ভারতে তখন উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি তাপপ্রবাহে আক্রান্ত শহরগুলোতেই চলছে গাছ কাটার প্রতিযোগিতা। নাসিকে প্রতিবাদ সত্ত্বেও বহু পুরোনো বটগাছ কাটা হচ্ছে। পুনেতে চার লেনের সড়কের জন্য পুরোনো গাছ সরানো হচ্ছে। বেঙ্গালুরুতে মেট্রোরেল প্রকল্পের জন্য গাছ কাটা হচ্ছে। কাশ্মীরের মতো তুলনামূলক শীতল অঞ্চলেও চওড়া রাস্তা ও তথাকথিত আধুনিক শহর তৈরির নামে তুঁত, আখরোট ও চিনার গাছ কাটা হচ্ছে।
এখানেই প্রশ্ন আসে: উন্নয়ন কাকে বলে? যদি উন্নয়নের নামে শহর থেকে ছায়া সরিয়ে দেওয়া হয়, যদি রাস্তা বড় হয় কিন্তু পথচারীর জীবন ছোট হয়ে যায়, যদি সড়ক প্রশস্ত হয় কিন্তু বাতাস আরও গরম হয়ে ওঠে, তবে সেই উন্নয়ন আসলে কার জন্য? শহরে গাছ শুধু সৌন্দর্য বাড়ায় না; গাছ তাপ কমায়, বাতাসে আর্দ্রতা ধরে, ছায়া দেয়, ধুলো কমায় এবং মানুষের হাঁটার মতো পরিবেশ তৈরি করে। গাছ কেটে শহরকে কংক্রিটে ঢেকে দিলে তাপ আটকে থাকে, রাতেও শহর ঠান্ডা হতে পারে না। ফলে গরম শুধু দিনের নয়, রাতের ঘুমও কেড়ে নেয়।
এই সংকটের আরেকটি বড় দিক হলো বৈষম্য। গরম সবার ওপর পড়ে, কিন্তু তার আঘাত সবার ওপর সমান নয়। ধনী মানুষ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর থেকে গাড়িতে ওঠেন, গাড়ি থেকে অফিসে যান, অফিস থেকে বিপণিবিতানে যান। তাদের দৈনন্দিন জীবনে গরমের প্রভাব অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু গরিব মানুষ, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, হকার, কৃষক, গৃহহীন মানুষ, নারী শ্রমিক ও বস্তিবাসীদের কোনো নিরাপদ আশ্রয় নেই। তাদের কাজ থামলে আয় বন্ধ, আর কাজ চালালে শরীর ভেঙে পড়ে। তাই তাপপ্রবাহ শুধু আবহাওয়ার সমস্যা নয়; এটি শ্রেণি, পেশা, লিঙ্গ ও সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক নির্মম বাস্তবতা।
হার্ভার্ডের দক্ষিণ এশিয়া ইনস্টিটিউটের এক বিশ্লেষণে প্রশ্ন তোলা হয়েছে—মানুষের শরীর আসলে কতটা গরম সহ্য করতে পারে? গবেষকদের মতে, মানুষের শরীরের একটি সীমা আছে। ভেজা-বাল্ব তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে গেলে সুস্থ তরুণ মানুষও ছায়ায় বসে, পর্যাপ্ত পানি পান করেও দীর্ঘ সময় নিরাপদ থাকতে পারেন না। কারণ তখন ঘাম শরীরকে কার্যকরভাবে ঠান্ডা করতে পারে না। শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হিটস্ট্রোকে মৃত্যু হতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৩৮০ মিলিয়ন ভারতীয় এমন পরিবেশে বাস করছেন, যা মানবদেহের স্বাভাবিক সহনক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
এত বড় ঝুঁকির পরও তাপজনিত মৃত্যুর সঠিক ও স্বচ্ছ হিসাব রাখা হচ্ছে না—এমন সমালোচনা বাড়ছে। বিজ্ঞানী, সাংবাদিক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, ভারতের তাপসংক্রান্ত তথ্যব্যবস্থা খণ্ডিত, ধীর, অসংগতিপূর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রেই অস্বচ্ছ। ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরও তাপমাত্রা মাপার স্বচ্ছতা নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে। ২০২৪ সালের ২৯ মে ৫২.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হওয়ার পর সেটিকে তাপমাত্রা মাপার যন্ত্রের ত্রুটি বলা হয়েছিল। এমন ঘটনা মানুষের আস্থা কমায় এবং সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতিকে দুর্বল করে।
এ বছরের তাপপ্রবাহের পুরো প্রভাব এখনো বিশ্লেষণাধীন। তবে যারা এই গরমের ভেতর দিয়ে গেছেন, তাদের কাছে এটি ছিল প্রায় দুই মাসব্যাপী একটানা জরুরি অবস্থা। ৪০ দিনের বেশি সময় ধরে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকার পর সরকারের তাপপ্রবাহ মোকাবিলা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা সামনে আসে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পরিকল্পনা কি যথাসময়ে এসেছে? মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য কি যথেষ্ট আশ্রয়কেন্দ্র, পানি, চিকিৎসা, ছায়া, কাজের সময় পরিবর্তন, শ্রমিক সুরক্ষা এবং জনসচেতনতা নিশ্চিত করা হয়েছে?
সরকারি উদ্যোগ হিসেবে রাজধানীতে শীতলকরণ কেন্দ্র চালু করা হয়েছে, যেখানে পানি, খাবার স্যালাইন, টুপি, পাখা, বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা ও বসার জায়গা রাখা হয়েছে। এগুলো অবশ্যই দরকারি। কিন্তু যখন এমন উদ্যোগ রাজনৈতিক প্রচারের অংশ হয়ে যায়, তখন মানবিক সহায়তার গুরুত্ব কমে যায়। দুর্যোগের সময় মানুষের প্রয়োজন নিরাপত্তা, পানি, চিকিৎসা ও স্বচ্ছ তথ্য; কোনো নেতার ছবি নয়। জনগণের করের টাকায় নেওয়া উদ্যোগ যদি দলীয় কৃতিত্ব প্রদর্শনের জায়গা হয়ে ওঠে, তবে তা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে শিক্ষার্থীদের বলেছিলেন, জলবায়ু বদলায়নি, মানুষের অভ্যাস বদলেছে। সেই বক্তব্য অনেক বিজ্ঞানী ও গবেষককে উদ্বিগ্ন করেছিল। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের তত্ত্ব নয়; এটি বর্তমানের অভিজ্ঞতা। গ্রীষ্ম দীর্ঘ হচ্ছে, তাপপ্রবাহ তীব্র হচ্ছে, বৃষ্টি অনিয়মিত হচ্ছে, কৃষি ঝুঁকিতে পড়ছে, শহর বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় জলবায়ু পরিবর্তনকে অস্বীকার করা মানে প্রস্তুতিকে দুর্বল করা।
ভারতের মানুষ এর আগেও বড় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ও দুর্যোগের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছে—নোটবন্দি, ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল, করোনা লকডাউন। এসব ঘটনার পর অনেকের মনে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে: সংকট এলে সাধারণ মানুষকে প্রায়ই নিজেরাই লড়তে হয়। তাপপ্রবাহের ক্ষেত্রেও সেই অনুভূতি জোরদার হচ্ছে। যারা গাছ কাটেন, শহরকে আরও গরম করেন, তথ্য গোপন করেন, মৃত্যুকে সংখ্যা হিসেবে দেখেন—তাদের সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
ভারতের এই তাপপ্রবাহ শুধু ভারতের সমস্যা নয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো একই জলবায়ু অঞ্চলের অংশ। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা—সব দেশেই গরম, নগরায়ণ, গাছ কাটার প্রবণতা, শ্রমজীবী মানুষের ঝুঁকি এবং জনস্বাস্থ্য দুর্বলতার সমস্যা আছে। তাই ভারতের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্যও সতর্কবার্তা। শহরকে শুধু রাস্তা, উড়ালসড়ক ও ভবনের সমষ্টি হিসেবে দেখলে চলবে না। শহরকে মানুষের শরীরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়তে হবে। ছায়া, পানি, খোলা জায়গা, গাছ, জরুরি চিকিৎসা, শ্রমিক সুরক্ষা এবং নির্ভরযোগ্য আবহাওয়া তথ্য—এসব এখন বিলাসিতা নয়, জীবনরক্ষাকারী অবকাঠামো।
তাপপ্রবাহকে আর সাধারণ গরম বলে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। এটি নীরব ঘাতক। এটি গরিবকে আগে মারে, শ্রমিককে আগে মারে, বৃদ্ধ ও অসুস্থকে আগে মারে, গৃহহীনকে আগে মারে। রাষ্ট্র যদি এখনো এটিকে প্রকৃত দুর্যোগ হিসেবে না দেখে, তবে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়বে, কিন্তু বহু মৃত্যু কখনো সরকারি কাগজে আসবে না।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সরল: মানুষ বাঁচানো কি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার, নাকি দুর্যোগকেও প্রচারের মঞ্চ বানানোই বড় লক্ষ্য? ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নের উত্তর এড়ানো যায় না। গরম শুধু আকাশ থেকে নামে না; অনেক সময় তা নীতির ভুল, গাছ কাটার সিদ্ধান্ত, অস্বচ্ছ তথ্যব্যবস্থা এবং দরিদ্র মানুষের জীবনের প্রতি উদাসীনতা থেকেও জন্ম নেয়। ভারতের বর্তমান তাপপ্রবাহ সেই কঠিন সত্যই সামনে আনছে।

