মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে। দুই দেশের চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এগোচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। একই সঙ্গে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও কাঠামোগত সংলাপ শুরু হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, আলোচনার সঙ্গে জড়িত কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ও তেহরান এখন এমন একটি সমঝোতার রূপরেখা তৈরির চেষ্টা করছে, যা একদিকে যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করবে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ শান্তি চুক্তির ভিত্তিও তৈরি করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সংঘাত যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে নড়িয়ে দিয়েছে, তাতে উভয় পক্ষই এখন সরাসরি যুদ্ধের পরিবর্তে নিয়ন্ত্রিত আলোচনার পথ খুঁজছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক উদ্বেগ এই আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্ভাব্য সমঝোতার অংশ হিসেবে ধাপে ধাপে হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি সচল করার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দীর্ঘদিন অস্থিতিশীল থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও সামুদ্রিক বাণিজ্যে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে প্রণালিটি নিরাপদ ও স্বাভাবিক রাখতে আন্তর্জাতিক চাপও বাড়ছে।
এদিকে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ নিয়েও আলোচনায় অগ্রগতি হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সূত্রগুলো বলছে, তেহরানের কাছে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি অংশ কমিয়ে আনা অথবা তৃতীয় কোনো দেশে স্থানান্তরের বিষয় বিবেচনায় রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে এটিকে দুই দেশের আলোচনায় একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দ্য ইসরায়েল টাইমস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রও কিছু ক্ষেত্রে নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। ওয়াশিংটন ইরানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরের ওপর আরোপিত অবরোধ শিথিল করা এবং কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে পুরো প্রক্রিয়াটি এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। নিরাপত্তা, আঞ্চলিক প্রভাব, পারমাণবিক কার্যক্রমের সীমা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাসহ একাধিক জটিল ইস্যুতে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। ফলে যেকোনো চুক্তির আগে আরও দীর্ঘ কূটনৈতিক দরকষাকষি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছিলেন, যুদ্ধবিরতিকে কেন্দ্র করে একটি সমঝোতা স্মারক তৈরির বিষয়ে আলোচনা চলছে। তিনি বলেন, সম্ভাব্য আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পারমাণবিক কর্মসূচির নিরস্ত্রীকরণ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়টি।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই আলোচনা সফল হলে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কেই নতুন মোড় আনবে না, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে চলা এই উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
তবে একই সঙ্গে সতর্কতাও রয়েছে। কারণ অতীতেও একাধিকবার দুই দেশ আলোচনার টেবিলে বসে শেষ মুহূর্তে সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক অগ্রগতি দেখা গেলেও পুরো সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনো অনেকটাই অনিশ্চিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

