আজ পবিত্র হজের দিন। সৌদি আরবের পবিত্র আরাফাতের বিস্তীর্ণ প্রান্তর ভরে উঠেছে লাখো মুসলমানের কণ্ঠে উচ্চারিত সেই চিরচেনা ধ্বনিতে— ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা একসঙ্গে দাঁড়িয়ে মহান আল্লাহর দরবারে নিজেদের সমর্পণ করছেন। সাদা ইহরামের পোশাকে সব ভেদাভেদ ভুলে যেন এক অনন্য মানবিক ও আধ্যাত্মিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে আরাফার ময়দান।
মঙ্গলবার ৯ জিলহজ ভোর থেকেই হাজিরারা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান নিতে শুরু করেন। এ বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ২০ লাখের বেশি মুসলমান হজ পালন করছেন। তাদের মধ্যে বাংলাদেশ থেকেও অংশ নিয়েছেন ৭৮ হাজারের বেশি হজযাত্রী।
হজ ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি। সামর্থ্যবান মুসলমানদের জীবনে অন্তত একবার এই পবিত্র ইবাদত পালন করা ফরজ। সেই হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে আরাফাতের ময়দানে অবস্থান। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, আরাফায় অবস্থান ছাড়া হজ পূর্ণতা পায় না। তাই সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত হাজিরারা এখানে দোয়া, জিকির, তওবা ও ইবাদতে সময় কাটান।
চার বর্গমাইল বিস্তৃত আরাফাতের এই বিশাল প্রান্তর প্রতি বছরই মুসলিম বিশ্বের ঐক্য, সমতা ও আত্মশুদ্ধির প্রতীক হয়ে ওঠে। ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা, বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ একই পোশাকে একই উদ্দেশ্যে এখানে সমবেত হন। এই দৃশ্য মুসলিম উম্মাহর ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্যের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।
এ বছর পবিত্র হজের খুতবা প্রদান করছেন মদিনার মসজিদে নববির ইমাম ও খতিব শায়খ আলী বিন আবদুর রহমান আল-হুজাইফি। মসজিদে নামিরায় জোহরের নামাজের আগে তিনি খুতবা দেবেন। এরপর হাজিরারা একসঙ্গে জোহর ও আসরের নামাজ আদায় করবেন।
সূর্যাস্তের পর হাজিরারা আরাফাত থেকে মুযদালিফার উদ্দেশে রওনা হবেন। সেখানে তারা মাগরিব ও এশার নামাজ একসঙ্গে আদায় করবেন এবং খোলা আকাশের নিচে রাতযাপন করবেন। একই সঙ্গে মিনায় জামরাতে নিক্ষেপের জন্য কংকর সংগ্রহ করবেন।
পরদিন ১০ জিলহজ মিনায় ফিরে হাজিরারা শয়তানকে প্রতীকীভাবে পাথর নিক্ষেপ করবেন। ইসলামী ইতিহাস অনুযায়ী, মহান আল্লাহর নির্দেশ পালন করতে গিয়ে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে শয়তান বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল। তখন তিনি শয়তানকে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করেন। সেই স্মৃতির প্রতীক হিসেবেই আজও হাজিরারা জামরাতে কংকর নিক্ষেপ করেন।
এরপর পর্যায়ক্রমে কোরবানি, মাথা মুণ্ডন এবং কাবা শরিফ তাওয়াফের মাধ্যমে হজের গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। বিদায়ী তাওয়াফের মাধ্যমে শেষ হয় পবিত্র হজব্রত।
হজ উপলক্ষে সৌদি সরকার এবারও ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। মক্কা, মিনা, আরাফাত ও মুযদালিফাসহ আশপাশের এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে এক লাখের বেশি নিরাপত্তাকর্মী। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা, ড্রোন ক্যামেরা ও তথ্য বিশ্লেষণ প্রযুক্তি দিয়ে হাজিদের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা তদারকি করা হচ্ছে।
এদিকে সৌদিতে তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ায় হাজিদের জন্য বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। গত বছরের ভয়াবহ গরমে বহু মানুষের মৃত্যুর অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে এবার ৪০টির বেশি সরকারি সংস্থা ও প্রায় আড়াই লাখ কর্মকর্তা হজ ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব পালন করছেন। হাজিদের বিশ্রাম, চিকিৎসা ও যাতায়াতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে এবারের হজ আয়োজন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও সুসংগঠিত ও নিরাপদ হয়েছে। তবে হজের প্রকৃত সৌন্দর্য প্রযুক্তি বা ব্যবস্থাপনায় নয়, বরং লাখো মানুষের একসঙ্গে মহান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের মধ্যেই নিহিত।
প্রতি বছর হজ শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি মুসলিম বিশ্বের ঐক্য, ধৈর্য, ত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির এক গভীর বার্তা বহন করে। আরাফার ময়দানে দাঁড়িয়ে লাখো মানুষের একই কণ্ঠে উচ্চারিত ‘লাব্বাইক’ যেন সেই চিরন্তন আহ্বানেরই প্রতিধ্বনি।

