মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইসরায়েল বহুদিন ধরেই সামরিক শক্তি, নিরাপত্তা ভাবনা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের কেন্দ্রীয় চরিত্র। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর সেই অবস্থান আরও কঠোর, আরও আক্রমণাত্মক এবং অনেক বেশি অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। হামাসের আকস্মিক হামলার পর ইসরায়েল যে যুদ্ধপর্বে প্রবেশ করেছে, তা এখন আর শুধু গাজা বা হামাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরান এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোতে।
তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সইয়ের মাধ্যমে তিন মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধ আপাতত থেমেছে। কিন্তু যুদ্ধ থেমে যাওয়ার এক সপ্তাহও পেরোয়নি, এর মধ্যেই ইসরায়েলের ভেতরে নতুন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এই থামা কি সত্যিই শান্তির শুরু, নাকি আরেক যুদ্ধের আগে সাময়িক বিরতি?
ইসরায়েলের জনগণের একটি বড় অংশের মনোভাব বলছে, তারা যুদ্ধের সমাপ্তিকে বিজয় হিসেবে দেখছে না। বরং অনেকের চোখে এটি অসমাপ্ত কাজ, এমনকি পরাজয়ের মতোও মনে হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৯২ শতাংশ ইসরায়েলি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশকের পুরোনো শত্রু ইরানের বিরুদ্ধে তাদের অর্জিত বিজয়কে বিসর্জন দিয়েছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক মানুষ মনে করেন, ওয়াশিংটনের আহ্বান উপেক্ষা করেও ইসরায়েলের উচিত লেবানন ও ইরানপন্থী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে যাওয়া।
এই জনমত শুধু ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়। এটি ইসরায়েলি সমাজের গভীরে চলতে থাকা একটি বড় মানসিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েলের নিরাপত্তা ভাবনায় যে ধাক্কা লাগে, তা দেশটির সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সামরিক নীতিনির্ধারক এবং গণমাধ্যম—সব জায়গায় গভীর প্রভাব ফেলেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আকস্মিক হামলায় ইসরায়েলে ১ হাজার ১৩৯ জন নিহত হন। সেই ঘটনার পর ইসরায়েল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং অঞ্চলটির বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এত বড় সামরিক ধ্বংসযজ্ঞের পরও ইসরায়েলের ভেতরে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি কমেনি।
বরং যুদ্ধ যেন আরও বিস্তৃত হয়েছে। ইসরায়েল দুই দফায় ইরানে হামলা চালিয়েছে। লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘাতে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন। সিরিয়ায় ইসরায়েল একাধিক স্থল অভিযান চালিয়েছে। ইয়েমেনে ইরানপন্থী হুতি বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করেও বিচ্ছিন্ন হামলা অব্যাহত রেখেছে। সব মিলিয়ে ইসরায়েল এখন এমন এক যুদ্ধবাস্তবতায় দাঁড়িয়ে, যেখানে একটি সংঘাত শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।
ইসরায়েলের রাজনীতিতে সাধারণত নানা বিষয়ে তীব্র বিভাজন দেখা যায়। সরকার, বিরোধী দল, ধর্মীয় ডানপন্থী, মধ্যপন্থী, সামরিক নেতৃত্ব—সব পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ নতুন কিছু নয়। কিন্তু যুদ্ধনীতি এমন এক ক্ষেত্র, যেখানে বিরল হলেও বিস্তৃত ঐকমত্য দেখা যায়। যুদ্ধ কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে মতভেদ আছে; কিন্তু যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থান প্রায় একই দিকে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার আগে ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের একজন গাদি আইজেনকোট তেহরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। মার্চের শুরুতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি তেহরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলাকে সাম্প্রতিক কয়েক দশকের সবচেয়ে ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ বলে বর্ণনা করেন। বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদও ইরানের বিরুদ্ধে হামলার পক্ষে জোরালো অবস্থান জানান।
তবে তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সমঝোতায় পৌঁছানোর সিদ্ধান্তে লাপিদ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তার মতে, এটি ইসরায়েলের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতির সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যর্থতাগুলোর একটি, যার সম্পূর্ণ দায় নেতানিয়াহুর। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ইসরায়েলের বিরোধী রাজনীতিও যুদ্ধনীতির বিরোধিতা করছে না; বরং তাদের অভিযোগ হলো, যুদ্ধকে যথেষ্ট দূর পর্যন্ত নেওয়া হয়নি অথবা কৌশলগতভাবে ঠিকভাবে পরিচালিত হয়নি।
এই জায়গাটিই ইসরায়েলি রাজনীতির বর্তমান সংকটকে স্পষ্ট করে। নেতানিয়াহুর সমালোচকেরা তাকে ব্যর্থ বলছেন, কিন্তু সেই ব্যর্থতার কারণ হিসেবে শান্তির পথে না যাওয়াকে নয়, বরং শত্রুকে পুরোপুরি দমন করতে না পারাকে সামনে আনছেন। ফলে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয় শিবিরেই নিরাপত্তার ভাষা ক্রমে আরও সামরিক হয়ে উঠছে।
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল বার-তাল মনে করেন, ইসরায়েলের এই প্রতিক্রিয়া অপ্রত্যাশিত নয়। তার বিশ্লেষণে, দেশটির রাজনীতি, গণমাধ্যম ও সমাজে এমন এক বয়ান তৈরি হয়েছে, যেখানে ২০২৩ সালের হামাস হামলাকে ইসরায়েলি পরিচয়ের কেন্দ্রীয় স্মৃতি—হলোকাস্টের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ হামলাটিকে কেবল একটি ভয়াবহ নিরাপত্তা ব্যর্থতা হিসেবে নয়, বরং ইহুদি জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির সর্বশেষ অধ্যায় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এই বয়ানের রাজনৈতিক প্রভাব গভীর। যখন কোনো হামলাকে কেবল সামরিক আঘাত নয়, অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখা হয়, তখন প্রতিক্রিয়াও সীমিত থাকে না। তখন প্রতিপক্ষকে শুধু দুর্বল করা নয়, সম্পূর্ণ অকার্যকর করে দেওয়াই লক্ষ্য হয়ে ওঠে। বার-তালের মতে, জাতীয় লক্ষ্য অর্জনের নৈতিক বৈধতা, ইহুদি জাতির মহিমাকীর্তন, সামষ্টিক ভুক্তভোগিতার অনুভূতি এবং ফিলিস্তিনিদের বৈধতা অস্বীকার—এসব ধারণা অধিকাংশ ইসরায়েলির চেতনায় গভীরভাবে প্রোথিত। ফলে যুদ্ধসমর্থনের পেছনে শুধু নিরাপত্তা নয়, পরিচয়, ইতিহাস ও ভয়ের রাজনীতিও কাজ করছে।
প্রশ্ন হলো, এত যুদ্ধের পর ইসরায়েল আসলে কী অর্জন করেছে?
প্রায় তিন বছর ধরে টানা যুদ্ধ চললেও খুব কম ইসরায়েলিই বিশ্বাস করেন, ৭ অক্টোবরের আগের তুলনায় দেশটি এখন উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি নিরাপদ। গাজায় হামাস এখনও বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। নেতানিয়াহু যে ইরানি সরকারের দ্রুত পতনের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, সেটিও বাস্তবে ঘটেনি। ইরান এখনও টিকে আছে, হিজবুল্লাহও পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়নি, আর গাজার যুদ্ধও স্থায়ী সমাধানে পৌঁছায়নি।
ইসরায়েলি বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ শায়েল বেন-এফ্রাইম মনে করেন, এই চিরস্থায়ী যুদ্ধ থামিয়ে দিতে পারে—এমন কোনো বিশেষ অর্জন এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। তার মতে, ইসরায়েলের যুদ্ধচক্রকে চালিত করছে দুটি প্রধান শক্তি। প্রথমটি হলো দেশটির তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক বাস্তবতা। দ্বিতীয়টি হলো ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েলি সমাজের মানসিকতায় ঘটে যাওয়া মৌলিক পরিবর্তন।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এ বছরের শেষ দিকে নির্বাচন সামনে রেখে তাকে একাধিক চাপ সামলাতে হচ্ছে। ৭ অক্টোবরের হামলার দায়, দুর্নীতির একাধিক মামলার বিচার, ইরান ও হিজবুল্লাহকে পুরোপুরি পরাজিত করতে না পারার সমালোচনা—সব মিলিয়ে তার নেতৃত্ব ক্রমাগত প্রশ্নের মুখে। এই অবস্থায় যুদ্ধ তার জন্য রাজনৈতিক ঢাল হিসেবেও কাজ করতে পারে।
বেন-এফ্রাইমের মতে, নেতানিয়াহু মনে করেন, যুদ্ধ চলতে থাকলে তিনি দুর্নীতির অভিযোগ এবং ৭ অক্টোবরের ঘটনার দায় থেকে নিজেকে আড়াল করতে পারবেন। যুদ্ধের সময় জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু সামনে চলে আসে, বিরোধীদের সমালোচনা অনেক সময় দুর্বল হয়ে যায়, আর নেতৃত্বের ব্যর্থতা সামরিক প্রয়োজনীয়তার আড়ালে চাপা পড়ে। নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সংকটকে ক্ষমতা ধরে রাখার উপায় হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ নতুন নয়।
তবে সমস্যাটি শুধু নেতানিয়াহুকে ঘিরে নয়। তার প্রতিদ্বন্দ্বীরাও সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে ভিন্ন কোনো কার্যকর বিকল্প কৌশল তুলে ধরতে পারেননি। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এবং প্রধানমন্ত্রী পদপ্রত্যাশী প্রধান নেতাদের নিরাপত্তা দর্শন প্রায় একই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেই দর্শন হলো, যেকোনো হুমকি বড় হওয়ার আগেই তা গুঁড়িয়ে দিতে হবে; কূটনৈতিক সমঝোতা বা প্রতিরোধমূলক ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করা যাবে না।
৭ অক্টোবরের অভিজ্ঞতার পর ইসরায়েলের অনেক নীতিনির্ধারক মনে করছেন, পুরোনো নিরাপত্তা ধারণা ব্যর্থ হয়েছে। সীমান্ত নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা, প্রতিরোধনীতি—এসব ব্যবস্থা হামাসের হামলা ঠেকাতে পারেনি। ফলে এখন তাদের চোখে সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো আগাম আঘাত, দীর্ঘমেয়াদি সামরিক চাপ এবং সম্ভাব্য হুমকিকে জন্মের আগেই নির্মূল করার চেষ্টা।
এই ধারণা শুধু গাজা বা দক্ষিণ লেবাননের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। ইরান, তুরস্ক কিংবা ভবিষ্যতে সম্ভাব্য যেকোনো শক্তিকেও একই নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে দেখা হচ্ছে। ফলে ইসরায়েলের সামনে শত্রুর তালিকা ছোট হচ্ছে না, বরং বড় হচ্ছে। প্রতিটি যুদ্ধ নতুন নিরাপত্তা যুক্তি তৈরি করছে, আর প্রতিটি নিরাপত্তা যুক্তি নতুন যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে।
লেবাননের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। ইসরায়েল হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে নানা সাফল্যের দাবি করতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যতে নতুন হুমকির আশঙ্কা থেকেই যায়। হিজবুল্লাহ দুর্বল হলেও পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায় না। দক্ষিণ লেবাননের ধ্বংসস্তূপ নতুন ক্ষোভ তৈরি করে। সেই ক্ষোভ আবার নতুন প্রতিরোধ, নতুন সংঘাত এবং নতুন যুদ্ধের সম্ভাবনা জন্ম দেয়। এভাবেই সামরিক সাফল্য অনেক সময় রাজনৈতিক সমাধানের বদলে আরও গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
গাজার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা স্পষ্ট। ইসরায়েল গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংস করেছে, হাজারো মানুষকে হত্যা করেছে, অবকাঠামো ভেঙে দিয়েছে। কিন্তু হামাসের রাজনৈতিক ও সামরিক উপস্থিতি পুরোপুরি শেষ হয়নি। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ক্ষোভ, বেদনা ও বাস্তুচ্যুতির অভিজ্ঞতা আরও গভীর হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধ হয়তো সাময়িক নিয়ন্ত্রণ এনে দিতে পারে, কিন্তু স্থায়ী নিরাপত্তা এনে দিতে পারে কি না—সেটিই বড় প্রশ্ন।
ইসরায়েলের যুদ্ধনীতির সবচেয়ে বড় সংকট এখানেই। দেশটি প্রতিটি হুমকির জবাবে সামরিক শক্তি ব্যবহার করছে, কিন্তু সেই শক্তির রাজনৈতিক পরিণতি কী হবে, তার স্পষ্ট উত্তর নেই। হামাসকে দুর্বল করা, হিজবুল্লাহকে চাপে রাখা, ইরানকে আঘাত করা—এসব সামরিক লক্ষ্য হতে পারে। কিন্তু তারপর কী? গাজা কে শাসন করবে? লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে স্থিতিশীলতা কীভাবে ফিরবে? ইরানের সঙ্গে সংঘাত কোথায় থামবে? এসব প্রশ্নের উত্তর অস্পষ্ট।
নিরাপত্তা শুধু অস্ত্র, বিমান হামলা বা সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়। নিরাপত্তা রাজনৈতিক সমঝোতা, আঞ্চলিক ভারসাম্য, নাগরিক সুরক্ষা এবং ভবিষ্যৎ সংঘাতের কারণ কমিয়ে আনার সঙ্গেও জড়িত। কিন্তু ইসরায়েলের বর্তমান নীতি ক্রমে এমন এক পথে হাঁটছে, যেখানে প্রতিটি সমস্যার প্রথম উত্তর হচ্ছে সামরিক আঘাত। এর ফলে সামরিক অভিযান বাড়ছে, কিন্তু নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি কমছে না।
এই অবস্থাকে শুধু কৌশলগত সংকট বলা যথেষ্ট নয়। এটি একই সঙ্গে মানসিক ও রাজনৈতিক সংকট। ৭ অক্টোবরের ট্রমা ইসরায়েলি সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। সেই ট্রমা থেকে জন্ম নেওয়া ভয়, প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা এবং অস্তিত্বগত হুমকির অনুভূতি রাজনীতিকে আরও কঠোর করেছে। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর মতো নেতাদের জন্য যুদ্ধ ক্ষমতা ধরে রাখার সুযোগও তৈরি করছে। ফলে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থ এবং জাতীয় নিরাপত্তার ভাষা একে অন্যের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।
এই যুদ্ধচক্র থামানোর জন্য শুধু একটি সামরিক বিজয় যথেষ্ট নয়। কারণ প্রতিটি বিজয়ের পরও নতুন হুমকির কথা বলা যায়, নতুন আঘাতের যুক্তি তৈরি করা যায়, নতুন শত্রুকে সামনে আনা যায়। বেন-এফ্রাইমের ভাষায়, কোনো অর্জনই এই প্রক্রিয়াকে থামাতে পারবে না। এটি ট্রমা ও রাজনৈতিক প্রয়োজন থেকে জন্ম নেওয়া এক ধরনের মানসিক ও রাজনৈতিক সংকট। ভবিষ্যতে কেবল ইসরায়েলের কৌশলগত অবস্থানের আমূল পরিবর্তনই হয়তো এ পরিস্থিতি বদলাতে পারে।
অর্থাৎ ইসরায়েলের সামনে আসল প্রশ্ন হলো, দেশটি কি নিরাপত্তাকে কেবল সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে মাপবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হবে? যদি প্রতিটি সম্ভাব্য হুমকিকে আগাম যুদ্ধের কারণ হিসেবে দেখা হয়, তবে যুদ্ধ কখনো শেষ হবে না। একটি যুদ্ধ থামবে, আরেকটি শুরু হবে। একটি সীমান্ত শান্ত হবে, অন্য সীমান্ত জ্বলবে। একটি শত্রু দুর্বল হবে, আরেক শত্রু সামনে আসবে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান বাস্তবতায় ইসরায়েল সামরিকভাবে শক্তিশালী—এ নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু শক্তিশালী হওয়া আর নিরাপদ হওয়া এক কথা নয়। গাজা, লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন ও ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত দেখিয়ে দিচ্ছে, সামরিক শক্তি দিয়ে যুদ্ধ শুরু করা যায়, কিন্তু যুদ্ধের শেষ নির্ধারণ করা অনেক কঠিন।
তাই ইসরায়েলের যুদ্ধচক্রের শেষ কোথায়—এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। শেষ হতে পারে তখনই, যখন দেশটির নেতৃত্ব যুদ্ধকে রাজনৈতিক টিকে থাকার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করবে। শেষ হতে পারে তখনই, যখন নিরাপত্তার অর্থ শুধু প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করা নয়, বরং সংঘাতের কারণ কমিয়ে আনা হিসেবে দেখা হবে। আর শেষ হতে পারে তখনই, যখন ৭ অক্টোবরের ট্রমাকে নতুন যুদ্ধের জ্বালানি না বানিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা নির্মাণের কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
তার আগে পর্যন্ত ইসরায়েলের সামনে পথটি বিপজ্জনকভাবে পরিচিত: যুদ্ধ, সাময়িক বিরতি, নতুন হুমকি, আবার যুদ্ধ। আর এই চক্র যত দীর্ঘ হবে, ততই প্রশ্নটি আরও ভারী হয়ে উঠবে—ইসরায়েল কি সত্যিই নিরাপত্তা খুঁজছে, নাকি নিরাপত্তার নামে এক অন্তহীন যুদ্ধের ভেতর নিজেকেই আটকে ফেলছে?

