ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা নিরসনে কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতির ইঙ্গিত মিললেও নতুন করে দুটি বড় ইস্যু সামনে চলে এসেছে। বিশেষ করে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে বিরোধ এবং হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থান এখনো অনেক দূরে অবস্থান করছে। ফলে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্ত্রিসভার বৈঠকে স্পষ্ট ভাষায় জানান, আলোচনার অংশ হিসেবে ইরানকে কোনো নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে না। একই দিনে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানকে তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ত্যাগ করতেই হবে এবং এর বিনিময়ে ওয়াশিংটন কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়।
তবে তেহরানের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরান ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, তাদের হাতে থাকা প্রায় ৪৪০ কেজি সমৃদ্ধ পারমাণবিক উপাদান তারা হস্তান্তর করবে না। এই বিষয়টিই বর্তমানে আলোচনার সবচেয়ে বড় অচলাবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক কর্মসূচি শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক প্রশ্ন নয়, বরং এটি ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রভাবের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে সহজে এ বিষয়ে ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা কম।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালী নিয়েও বিরোধ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রীয় আলোচনায় পরিণত হয়েছে। ইরান জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর আরোপ করা অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চললেও প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই থাকবে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে সম্প্রতি একটি সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারকের তথ্য প্রকাশ করা হয়। সেখানে দাবি করা হয়, মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা হলে ৩০ দিনের মধ্যে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করা হবে। তবে সামরিক জাহাজ এই সুবিধার বাইরে থাকবে।
কিন্তু হোয়াইট হাউস দ্রুত এই তথ্যকে “মনগড়া” বলে প্রত্যাখ্যান করে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, আলোচনার বিষয়ে ইরানি গণমাধ্যম বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করছে। যদিও কোন অংশটি ভুল, তা স্পষ্ট করে জানানো হয়নি।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর ওপর এককভাবে ইরানের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়া হবে না। ট্রাম্প বলেন, এই জলপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং এর নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র ছাড় দিতে রাজি নয়।
গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর পুরো মধ্যপ্রাচ্য অস্থির হয়ে ওঠে। ইরান ও ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যায়। বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তে শুরু করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকট শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের ২০ শতাংশের বেশি পরিবাহিত হওয়ায় এই অঞ্চল অস্থিতিশীল থাকলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
যদিও গত ৮ এপ্রিল অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, তবুও মূল সমস্যাগুলোর সমাধান এখনো হয়নি। বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের কড়াকড়ি অবস্থান পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী কয়েক সপ্তাহই নির্ধারণ করবে আলোচনার ভবিষ্যৎ। উভয় পক্ষ সমঝোতার পথে এগোবে, নাকি আবারও সামরিক উত্তেজনা বাড়বে— এখন বিশ্ব সেই দিকেই নজর রাখছে।

