ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও। সেই ঢেউয়ের ধাক্কা এসে লেগেছে বাংলাদেশেও। জ্বালানি তেলের বাজার অস্থিতিশীল হওয়া, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে চাপ—সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে নতুন এক সংকট পরিস্থিতি।
এই অবস্থায় বাংলাদেশ নতুন করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সহায়তা কর্মসূচির দিকে এগোচ্ছে। সংস্থাটির বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনার জানিয়েছেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং সংস্কার পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে আলোচনা চলছে। তিনি বলেন, টেকসই অর্থনৈতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশকে সহায়তা দিতে সংস্থাটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তেলের দাম এক পর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় একশ ডলারে পৌঁছে যায়, যা যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল প্রায় ছেষট্টি ডলার। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা এবং নৌপথে বাধার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে জ্বালানি খাতে। দেশটির মোট তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় অংশই আমদানি নির্ভর হওয়ায় ব্যয় বেড়ে গেছে। এর ফলে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় চাপ সামলাতে সরকার কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে বাধ্য হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানির দামও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে।
শুধু জ্বালানি নয়, এই সংকটের প্রভাব পড়েছে শিল্প ও রপ্তানি খাতেও। দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হওয়ার কারণে চাপে পড়েছে। কাঁচামাল আনা ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ফলে আগামী মৌসুমে অর্ডার কমে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে প্লাস্টিক ও রাসায়নিক শিল্পেও কাঁচামালের দাম বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে রেজিনসহ বিভিন্ন কাঁচামালের দাম অনেক বেশি হয়ে গেছে, যা উৎপাদন খরচকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিস্থিতিও এই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় এসেছে। অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাজেট ভারসাম্য রক্ষায় গত কয়েক বছরে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। নতুন করে সহায়তা চাওয়ার আলোচনা সেই চাপ আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু সাময়িক জ্বালানি সংকট নয়, বরং একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক অস্থিরতার অংশ। ফলে বাংলাদেশকে এখন একদিকে বৈদেশিক অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় আরও দক্ষতা আনতে হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরান যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশে সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতেই তার চাপ অনুভূত হচ্ছে। সামনে এই পরিস্থিতি কতটা স্থিতিশীল হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
—

