প্রবল কালবৈশাখী ঝড় ও বজ্রপাতের আঘাতে পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত আটজন। ঝড়ের দাপটে উপড়ে গেছে অসংখ্য গাছ, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি, ব্যাহত হয়েছে সড়ক, রেল ও বিমান যোগাযোগ। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
শুক্রবার (২৯ মে) বিকেলে কলকাতাসহ আশপাশের কয়েকটি জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যায় শক্তিশালী কালবৈশাখী। আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কলকাতায় ঝড়ের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৮৮ কিলোমিটার। ঝড়ের সঙ্গে ভারী বৃষ্টি এবং বজ্রপাত পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় বড় বড় গাছ ভেঙে পড়ে, রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যায় এবং বহু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়।
কলকাতার রাসবিহারী, রবীন্দ্র সরোবর, টালিগঞ্জ, পার্ক স্ট্রিট, মল্লিক বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ঝড়ের পরপরই পৌর কর্তৃপক্ষ, দমকল বাহিনী ও পুলিশ উদ্ধার ও পরিষ্কার কার্যক্রম শুরু করলেও স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে বেশ সময় লেগেছে।
দুর্যোগে কলকাতায় দুজনের মৃত্যু হয়েছে। একজন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এবং অন্যজন দেয়াল ধসে প্রাণ হারান। একই সময়ে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় বজ্রপাত ও ঝড়ের কারণে আরও কয়েকজনের মৃত্যু হয়। পুরুলিয়া জেলায় বজ্রাঘাতে তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। তারা কেউ মাঠে কাজ করছিলেন, কেউ আবার বাড়ি ফেরার পথে ছিলেন। ঝাড়গ্রামেও বজ্রপাতের শিকার হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
পশ্চিম মেদিনীপুরে ঝড়ের সময় প্রাণ হারিয়েছে নবম শ্রেণির দুই শিক্ষার্থী। এই ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে এলাকাজুড়ে।
ঝড়ের কারণে পরিবহন ব্যবস্থাও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে গাছ ও ডালপালা ভেঙে বৈদ্যুতিক তারের ওপর পড়ায় রেল চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। বিশেষ করে শিয়ালদহ ও হাওড়া শাখায় ট্রেন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েন হাজারো যাত্রী। একই সঙ্গে কলকাতা বিমানবন্দরেও কিছু সময়ের জন্য উড়োজাহাজ ওঠানামা বাধাগ্রস্ত হয়।
এই দুর্যোগের পর নিহতদের পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে চার লাখ রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে দ্রুত পুনর্বাসন ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, গ্রীষ্মের শেষভাগে তীব্র তাপপ্রবাহ ও বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র বাতাসের প্রভাবে কালবৈশাখী ঝড়ের সৃষ্টি হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব ঝড়ের তীব্রতা বৃদ্ধি এবং বজ্রপাতের সংখ্যা বাড়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের এই সাম্প্রতিক দুর্যোগ আবারও দেখিয়ে দিল, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু তাৎক্ষণিক উদ্ধার কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নিরাপদ অবকাঠামো, কার্যকর পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি। কয়েক ঘণ্টার ঝড়েই যে পরিমাণ প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হয়ে থাকবে।

