ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও তা তার রাজনৈতিক অবস্থানকে খুব বেশি শক্তিশালী করতে পারেনি। বরং যুদ্ধ, কূটনৈতিক সমঝোতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের কারণে তার ভবিষ্যৎ এখন আগের চেয়ে আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সহজ হবে না। অর্থাৎ যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব তাকে সাময়িক জনসমর্থন দিলেও তা রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হলে নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয়েই এটিকে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেন। সে সময় নেতানিয়াহু দাবি করেছিলেন, দুই দেশের সম্পর্ক অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ঘনিষ্ঠ।
কিন্তু কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। সামরিক অভিযান থেকে বিষয়টি এখন কূটনৈতিক আলোচনার দিকে মোড় নিয়েছে, আর সেখানেই নেতানিয়াহুর প্রভাব সীমিত হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
ইসরাইলি সূত্রগুলোর দাবি, যুদ্ধবিরতির পর নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল, অব্যাহত সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ ইরানের ক্ষমতাকাঠামোকে দুর্বল করে দিতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমাধানের পথেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
এখানেই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ইসরাইলি নেতৃত্বের মধ্যে। নেতানিয়াহুর আশঙ্কা, সম্ভাব্য কোনো নতুন সমঝোতা ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রমের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে যথেষ্ট গুরুত্ব নাও দিতে পারে।
তার ঘনিষ্ঠ মহলের মতে, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে ইরান নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করার সুযোগ পাবে। বিশেষ করে তেল রপ্তানি ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ছাড় দেওয়া হলে তেহরানের অর্থনৈতিক অবস্থান আরও মজবুত হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়াবে।
একই সময়ে লেবানন সীমান্তও নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সেখানে হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলা বৃদ্ধি এবং পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর ফলে নেতানিয়াহু একদিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলা করছেন, অন্যদিকে নিজ দেশের রাজনৈতিক চাপও সামলাতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর বর্তমান সংকট শুধু নির্বাচনী রাজনীতির বিষয় নয়। এটি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গেও জড়িত। তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি নিজেকে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া নেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু যদি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক সমঝোতার পথে এগিয়ে যায় এবং সেখানে ইসরাইলের উদ্বেগগুলো পুরোপুরি প্রতিফলিত না হয়, তাহলে তার রাজনৈতিক অবস্থান বড় ধাক্কার মুখে পড়তে পারে।
এছাড়া ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। সরকারবিরোধীরা প্রশ্ন তুলছেন, দীর্ঘ সংঘাত ও নিরাপত্তা সংকটের পরও দেশটি কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছে কি না। একই সঙ্গে জোট সরকারের ভেতরেও মতপার্থক্যের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি নেতানিয়াহুর জন্য এক জটিল বাস্তবতা তৈরি করেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক সাফল্যের দাবি থাকলেও কূটনৈতিক অঙ্গন এবং রাজনৈতিক সমীকরণে তিনি আগের মতো স্বস্তিতে নেই। ফলে আগামী কয়েক মাসই নির্ধারণ করে দিতে পারে ইসরাইলের এই দীর্ঘমেয়াদি নেতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে।

