রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখন শুধু ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র, কামান বা যুদ্ধবিমানের সংঘাত নয়। এই যুদ্ধ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের এক কঠিন পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে। ২০২২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আগ্রাসন শুরু করার পর পেরিয়ে গেছে চার বছর তিন মাস।
এই দীর্ঘ সময়ে বিশ্বের অন্য প্রান্তে গাজা, লেবানন, সিরিয়া, আফগানিস্তান ও ইরানে নতুন সংঘাতের আগুন জ্বলেছে, কিন্তু মস্কো ও কিয়েভের যুদ্ধ থামেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের ধরন আরও জটিল হয়েছে।
ইউক্রেন এখনো রাশিয়ার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়ছে মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্রদের সহায়তায়। কিন্তু এই লড়াইয়ের ময়দানে রাশিয়া এমন এক অস্ত্রকে বারবার ব্যবহার করছে, যা দামের দিক থেকে তুলনামূলক কম, কিন্তু কৌশলগত প্রভাবের দিক থেকে অত্যন্ত বড়। সেই অস্ত্রের নাম গেরান-২।
এই ড্রোন ইউক্রেনের জন্য শুধু সামরিক চ্যালেঞ্জ নয়, সাধারণ মানুষের মানসিক আতঙ্কেরও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাতের আকাশে মোটরসাইকেলের মতো গুঞ্জনধ্বনি শুনলেই ইউক্রেনের বহু শহরের মানুষ বুঝতে পারে, হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই বিস্ফোরণ হতে পারে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি কিংবা আবাসিক এলাকার কাছাকাছি অবকাঠামো—সবকিছুই তখন ঝুঁকির মুখে পড়ে।
রাশিয়া ইতোমধ্যে ইউক্রেনের উল্লেখযোগ্য ভূখণ্ড দখলে নিয়েছে। আগে থেকেই দখলে থাকা ক্রিমিয়ার পাশাপাশি বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই অগ্রগতির পেছনে শুধু প্রচলিত সামরিক শক্তি নয়, সস্তা কিন্তু ব্যাপকভাবে ব্যবহারযোগ্য ড্রোন কৌশলও বড় ভূমিকা রাখছে।
গেরান-২ মূলত এমন এক ধরনের আক্রমণকারী ড্রোন, যা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার পর নিজেও ধ্বংস হয়ে যায়। তাই একে আত্মঘাতী ড্রোন বলা যায়। এটি আকাশে উড়ে নির্দিষ্ট পথে এগোয়, লক্ষ্যবস্তুর কাছে পৌঁছে আঘাত হানে এবং বিস্ফোরিত হয়। প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় এর গতি কম হলেও এর ভয়ংকর দিক হলো সংখ্যা, খরচ এবং ব্যবহারের কৌশল।
গেরান-২ সম্পর্কে বুঝতে হলে আগে বুঝতে হবে এই ধরনের অস্ত্রের কাজের ধরন। এটি এমন এক আকাশভিত্তিক বিস্ফোরক ব্যবস্থা, যা লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি গিয়ে কিছুক্ষণ ঘুরে থাকতে পারে অথবা নির্ধারিত লক্ষ্য অনুসরণ করে আঘাত করতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে এর সুবিধা হলো, এটি তুলনামূলক কম খরচে তৈরি করা যায়, কিন্তু প্রতিপক্ষকে প্রতিরক্ষায় অনেক বেশি ব্যয় করতে বাধ্য করে। ফলে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ভারসাম্য বদলে যায়।
গেরান-২ আসলে ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের রুশ সংস্করণ। তেহরান থেকে পাওয়া প্রযুক্তি ও নকশার ভিত্তিতে মস্কো নিজস্বভাবে এই ড্রোন উৎপাদন শুরু করে। রুশ ভাষায় জেরানিয়াম ফুলকে গেরান বলা হয়। সেই ফুলের নাম থেকেই এই ড্রোনের নামকরণ। নামটি কোমল হলেও অস্ত্রটির কার্যকারিতা অত্যন্ত কঠোর ও বিধ্বংসী।
ড্রোনটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩.৫ মিটার এবং ডানার বিস্তার প্রায় ২.৫ মিটার। সাধারণত এটি ৪০ থেকে ৫০ কেজি পর্যন্ত বিস্ফোরক বহন করতে পারে। এর গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ১৮০ কিলোমিটার এবং একবার উড্ডয়নের পর প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে বলে বিভিন্ন সামরিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। এই দূরপাল্লার সক্ষমতা রাশিয়াকে ইউক্রেনের ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে বারবার লক্ষ্যবস্তু করার সুযোগ দেয়।
গেরান-২ সবচেয়ে ভয়ংকর তার বিস্ফোরক ক্ষমতার কারণে নয়, বরং এর কম খরচের কারণে। একটি আধুনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে লাখো ডলার খরচ হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির খরচ প্রায় ২০ লাখ ডলার। অন্যদিকে একটি গেরান-২ ড্রোন তৈরি করতে ১০ থেকে ২০ হাজার ডলার খরচ হয় বলে বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন। রাশিয়ার মতো বড় সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাসম্পন্ন দেশের জন্য এই খরচ তুলনামূলকভাবে কম। ফলে মস্কো একসঙ্গে বহু ড্রোন ব্যবহার করে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলতে পারে।
এই কৌশলটির বড় দিক হলো ব্যয়ের অসমতা। একটি কম দামের ড্রোন ভূপাতিত করতে অনেক সময় ইউক্রেনকে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়। অর্থাৎ রাশিয়া অল্প খরচে হামলা চালায়, আর ইউক্রেনকে সেই হামলা ঠেকাতে অনেক বেশি সম্পদ ব্যয় করতে হয়। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে এই ধরনের চাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার ব্যবস্থা ও গোলাবারুদের মজুত রাতারাতি পূরণ করা যায় না।
রাশিয়া সাধারণত গেরান-২ দিয়ে ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি অবকাঠামো, সামরিক অবস্থান ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে। অনেক সময় রাতের অন্ধকারে শতাধিক ড্রোন একসঙ্গে পাঠানো হয়। এর ফলে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একসঙ্গে বহু লক্ষ্যবস্তু মোকাবিলায় বাধ্য হয়। কিছু ড্রোন ধ্বংস করা গেলেও কিছু ড্রোন প্রতিরক্ষা বলয় ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে যায়।
এই ড্রোন হামলার প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হলে হাসপাতাল, পানি সরবরাহ, যোগাযোগব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। শীতের সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা হলে তা মানবিক সংকট আরও গভীর করে। তাই গেরান-২ একদিকে সামরিক অস্ত্র, অন্যদিকে সামাজিক চাপ তৈরির হাতিয়ার।
গেরান-২ ড্রোন ইউক্রেনে অনেকের কাছে মোপেড নামে পরিচিত। এর কারণ এর শব্দ। আকাশে ওড়ার সময় ড্রোনটি এমন গুঞ্জন সৃষ্টি করে, যা অনেকটা পুরনো মোটরসাইকেল বা ছোট ইঞ্জিনচালিত বাহনের শব্দের মতো। এই শব্দ এখন ইউক্রেনীয়দের কাছে আতঙ্কের সংকেত। শব্দটি শোনা মানে সম্ভাব্য হামলা, আশ্রয় নেওয়ার প্রস্তুতি এবং অনিশ্চয়তার রাত।
সম্প্রতি একটি পথভ্রষ্ট রুশ ড্রোন রোমানিয়ার গালাতি শহরের একটি আবাসিক এলাকায় আঘাত হানে। এতে আগুন ধরে যায় এবং দুই ব্যক্তি আহত হন। বুখারেস্ট জানিয়েছে, ড্রোনটি গেরান-২ ধরনের ছিল। ধারণা করা হয়, ড্রোনটির প্রকৃত লক্ষ্য ছিল ইউক্রেন। কিন্তু এমন ঘটনা দেখিয়ে দেয়, ড্রোনযুদ্ধ শুধু যুদ্ধরত দেশের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না; পাশের দেশগুলোর নিরাপত্তাকেও অস্থির করে তুলতে পারে।
গেরান-২ তৈরির নকশা এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে দ্রুত ও কম খরচে উৎপাদন করা যায়। এতে ফাইবারগ্লাস, কম্পোজিট উপাদান ও হালকা নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়। ফলে ড্রোনের ওজন কম থাকে, উৎপাদন সহজ হয় এবং একে বৃহৎ সংখ্যায় তৈরি করা সম্ভব হয়। ইউক্রেনীয় গোয়েন্দাদের দাবি, ভূপাতিত গেরান-২ ড্রোনের ধ্বংসাবশেষে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, চীনসহ বিভিন্ন দেশের তৈরি মাইক্রোচিপ, রিসিভার, ট্রানজিস্টর ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ পাওয়া গেছে।
২০২৩ সাল থেকে রাশিয়ার তাতারস্তান অঞ্চলের আলাবুগা শিল্পাঞ্চলে গেরান ধরনের ড্রোনের বড় আকারে উৎপাদন শুরু হয়। বর্তমানে এই অঞ্চলকে রাশিয়ার প্রধান গেরান উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে দেখা হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলাবুগার কারখানাটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় সশস্ত্র ড্রোন উৎপাদনকেন্দ্রগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে গেরান সিরিজে আরও পরিবর্তনের কথাও জানা যাচ্ছে। এগুলোকে বেশি উচ্চতায় উড়তে সক্ষম করা, বৈদ্যুতিক বাধা মোকাবিলার ক্ষমতা বাড়ানো এবং আরও শক্তিশালী বিস্ফোরক বহনের উপযোগী করার চেষ্টা চলছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। গেরান-৩, গেরান-৪ এবং গেরান-৫ নামের নতুন সংস্করণ নিয়েও আলোচনা রয়েছে। কিছু সংস্করণে জেট ইঞ্জিন ব্যবহারের কথাও সামনে এসেছে, যা এগুলোকে আগের তুলনায় দ্রুতগতির করতে পারে।
তবে গেরান-২ বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক ড্রোন নয়। এটি তুলনামূলক ধীর, শব্দ বেশি করে এবং অনেক সময় মেশিনগান, বিমান বিধ্বংসী কামান বা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করা যায়। কিন্তু এর মূল শক্তি প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ নয়, বরং ব্যাপক ব্যবহার। যুদ্ধক্ষেত্রে অনেক সময় সবচেয়ে উন্নত অস্ত্র নয়, সবচেয়ে বেশি ব্যবহারযোগ্য অস্ত্রই বড় পার্থক্য তৈরি করে। গেরান-২ সেই বাস্তবতারই উদাহরণ।
রাশিয়ার কৌশল এখানে পরিষ্কার। অল্প খরচে বহু ড্রোন পাঠিয়ে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাকে ক্লান্ত করে ফেলা, ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা সম্পদ খরচ করানো, অবকাঠামোতে আঘাত করা এবং সাধারণ মানুষের মনে স্থায়ী আতঙ্ক তৈরি করা—এই চারটি লক্ষ্য একসঙ্গে পূরণ করছে গেরান-২।
যুদ্ধের চতুর্থ বছরে এসে গেরান-২ দেখিয়ে দিয়েছে, ভবিষ্যতের যুদ্ধ শুধু বড় ক্ষেপণাস্ত্র বা আধুনিক যুদ্ধবিমান দিয়ে নির্ধারিত হবে না। সস্তা, দ্রুত উৎপাদনযোগ্য এবং সংখ্যায় বিপুল ড্রোনও যুদ্ধের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। ইউক্রেনের জন্য গেরান-২ তাই কেবল একটি ড্রোন নয়; এটি দীর্ঘ যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ, প্রতিরক্ষা দুর্বলতা এবং জনমানসের আতঙ্কের প্রতীক।
এই কারণেই গেরান-২ এখন ইউক্রেনের জন্য বড় উদ্বেগের নাম। এটি আকারে ছোট, দামে কম এবং গতিতে খুব বেশি দ্রুত নয়। কিন্তু কৌশলগত দিক থেকে এটি রাশিয়ার হাতে এমন এক অস্ত্র, যা প্রতিপক্ষকে প্রতিবারই কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—কতক্ষণ, কত খরচে এবং কতবার এই আকাশ-আতঙ্ক ঠেকানো সম্ভব?

