দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা উত্তেজনা, নিষেধাজ্ঞা, সামরিক সংঘাত এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুন মোড়ে দাঁড়িয়েছে। দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য একটি সমঝোতা চুক্তিকে ঘিরে এমন একটি পরিকল্পনার কথা সামনে এসেছে, যার আওতায় ইরান প্রায় ৩০ হাজার কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ পেতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যদি ভবিষ্যতে কখনও পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথে না যাওয়ার নিশ্চয়তা দেয় এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক শর্ত মেনে নেয়, তাহলে দেশটির জন্য একটি বিশাল অর্থনৈতিক পুনর্গঠন কর্মসূচি চালু করা হতে পারে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, একটি আন্তর্জাতিক তহবিল গঠন করা হবে, যেখানে ৩০ হাজার কোটি ডলারের অর্থ সংরক্ষিত থাকবে। এই অর্থের যোগান আসবে যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক দেশ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারের কাছ থেকে। যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, অবকাঠামো সংস্কার এবং শিল্প খাত পুনর্গঠনে এই অর্থ ব্যয় করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের অর্থনীতি ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছে। দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সীমাবদ্ধতা, মুদ্রাস্ফীতি এবং সামরিক সংঘাত দেশটির অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিয়েছে। ফলে সম্ভাব্য এই অর্থনৈতিক প্যাকেজ বাস্তবায়িত হলে তা ইরানের জন্য একটি বড় স্বস্তি হয়ে উঠতে পারে।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের বিরোধ নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে অভিযোগ করে আসছে, শান্তিপূর্ণ গবেষণার আড়ালে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে। যদিও ইরান সবসময় এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং দাবি করেছে যে তাদের কর্মসূচি সম্পূর্ণ বেসামরিক ও জ্বালানি উৎপাদনকেন্দ্রিক।
এই বিরোধের জেরে গত দুই দশকে একের পর এক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। পরবর্তীতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে সামরিক সংঘাতের কারণে। সাম্প্রতিক সংঘর্ষে ইরানের বিভিন্ন অবকাঠামো, শিল্প এলাকা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং পরিবহন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমানে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি এবং একটি স্থায়ী সমঝোতা কাঠামো তৈরির বিষয়ে আলোচনা চলছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আলোচনার অগ্রগতি সন্তোষজনক হলে পরবর্তী ধাপে ক্ষতিপূরণ তহবিল এবং অর্থ ছাড়ের কাঠামো নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হতে পারে।
তবে এই অর্থ পাওয়ার পথ মোটেও সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভবিষ্যতে পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি, আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কেন্দ্রে থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত বিষয়ে সমঝোতা এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে আরোপিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ অনেক বেশি। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সেখানে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলে। এই কারণে আলোচনায় হরমুজ প্রণালির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবিত ৩০ হাজার কোটি ডলারের প্যাকেজ কেবল অর্থনৈতিক সহায়তা নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্যও একটি বড় পরীক্ষা। চুক্তি সফল হলে বহু বছরের বৈরিতার পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারে। অন্যদিকে আলোচনা ভেঙে গেলে অঞ্চলটি আবারও অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনার দিকে ধাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ মুহূর্তে সবকিছুই নির্ভর করছে চলমান আলোচনার ফলাফলের ওপর। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—পরমাণু কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে কূটনৈতিক সমাধান শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

