যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ আপাতত থেমে আছে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখনো ভারী। ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর বড় ধরনের সামরিক সংঘাত বন্ধ থাকলেও এই বিরতি শান্তির নিশ্চয়তা দেয়নি। বরং পরিস্থিতি এমন এক অনিশ্চিত জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে একটি ভুল সিদ্ধান্ত, একটি ভুল সংকেত বা একটি সীমিত হামলাও আবার পুরো অঞ্চলকে আগুনের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
পাকিস্তান, কাতারসহ কয়েকটি দেশ এখন দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালাচ্ছে। আলোচনার দরজা খোলা থাকলেও যুদ্ধক্ষেত্র পুরোপুরি নীরব নয়। ছোটখাটো পাল্টাপাল্টি হামলা, সামরিক অবস্থান বদল, সতর্কবার্তা এবং কূটনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে যুদ্ধবিরতির সময়টিও এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধের মতো হয়ে উঠেছে।
ইরানের কাছাকাছি এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌ ও বিমান বাহিনীর উপস্থিতি এখনো বজায় আছে। এর অর্থ স্পষ্ট—ওয়াশিংটন আলোচনায় ফিরলেও সামরিক চাপের ভাষা ছাড়েনি। অন্যদিকে তেহরানও নিশ্চয়ই তার বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রেখেছে। যুদ্ধবিরতির এই সময়কে ইরান শুধু বিশ্রামের সুযোগ হিসেবে দেখছে না; বরং ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সক্ষমতা মেরামত, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠন এবং সম্ভাব্য নতুন হামলার প্রস্তুতির সময় হিসেবেও ব্যবহার করছে।
আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির উঠে আসা দেশটির রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নেতৃত্বের এই পরিবর্তন এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, সামরিক নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রভাব—তিনটি বিষয়ই একসঙ্গে চাপে রয়েছে। ফলে নতুন নেতৃত্বের সামনে আপসের পথ যতটা কঠিন, কঠোর অবস্থান ধরে রাখার চাপও ততটাই প্রবল।
এই বাস্তবতায় উপসাগরীয় অঞ্চল এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে সামরিক শক্তির প্রদর্শনের মাধ্যমে ইরানের ওপর চাপ ধরে রাখতে, যাতে তেহরান আলোচনায় কিছু ছাড় দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু ইরান বারবার বুঝিয়ে দিচ্ছে, তাদের প্রতিরোধের অবস্থান দুর্বল হয়নি। প্রয়োজন হলে তারা মার্কিন ঘাঁটি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে আবার হামলা চালাতে প্রস্তুত।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যুদ্ধবিরতি টিকবে কি না। শুধু যুদ্ধ থামানো যথেষ্ট নয়; ভবিষ্যৎ আলোচনার কাঠামো, পক্ষগুলোর দায়বদ্ধতা এবং সীমারেখা নিয়ে একটি কার্যকর সমঝোতা প্রয়োজন। কিন্তু সেই পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসরায়েলের অবস্থান।
ইসরায়েল ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তারা আবারও লেবাননে বিমান হামলা চালাবে। এতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কূটনৈতিক হিসাব আরও জটিল হয়ে পড়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে চাইছে, অন্যদিকে তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েল সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে আগ্রহী। এই দুই অবস্থান একসঙ্গে ধরে রাখা ট্রাম্পের জন্য সহজ নয়।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য সমঝোতার বিরোধী। তার দৃষ্টিতে ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তিই নিরাপদ নয়। তিনি মনে করেন, তেহরান এখনো লেবাননের হিজবুল্লাহকে সমর্থন দিচ্ছে এবং ইরানের সামরিক প্রভাব ভাঙতে হলে চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। কিন্তু ইরান স্পষ্ট করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় কোনো সমঝোতায় যেতে হলে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানও বন্ধ করতে হবে। ফলে ট্রাম্প এখন একসঙ্গে দুই দিক সামলানোর চাপে আছেন—ইরানকে আলোচনায় রাখা এবং ইসরায়েলকে সংযত রাখা।
সংকটের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক কেন্দ্র এখন হরমুজ প্রণালি। ইরান যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রেখেছে, সেটি আবার খুলে দেওয়া আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য জরুরি। কিন্তু তেহরান বিনা শর্তে এই পথ খুলে দেবে—এমন আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। তারা নিশ্চয়ই বিনিময়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল, জব্দ করা সম্পদ ফেরত অথবা অন্য কোনো বড় ছাড় চাইবে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকে সেখানে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এই অচলাবস্থা শুধু একটি সামরিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতির ওপর সরাসরি চাপ তৈরির কৌশল। কারণ হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ।
সৌদি আরব কিছু তেল লোহিত সাগরের বন্দর দিয়ে রপ্তানি করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও বিকল্প পাইপলাইন ব্যবহার করছে। কিন্তু এসব বিকল্প ব্যবস্থা পরিস্থিতির পুরো ক্ষতি সামাল দিতে পারছে না। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়া কোনো ছোট ঘটনা নয়। এই অচলাবস্থা দীর্ঘ হলে জ্বালানির দাম বাড়বে, পরিবহন ব্যয় বাড়বে, শিল্প উৎপাদনে চাপ পড়বে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচও বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র এখন আগের মতো উপসাগরীয় তেলের ওপর নির্ভরশীল নয়—এ কথা সত্য। কিন্তু বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে তার অভিঘাত যুক্তরাষ্ট্রকেও এড়াবে না। জ্বালানি বাজার আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত। তাই হরমুজে অচলাবস্থা মানে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর সরাসরি চাপ।
এই জায়গাতেই ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠিন এক রাজনৈতিক ফাঁদে পড়েছেন। তিনি সম্ভবত ভেবেছিলেন, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করলে দ্রুত ফল পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি, বরং আঘাত সামলে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু দুজনেরই ধারণা ছিল, বিমান হামলা ও সামরিক চাপ ইরানের ইসলামিক শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করে ফেলবে। কিন্তু সেই হিসাব ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
ইরান বহু বছর ধরে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ও অভ্যন্তরীণ চাপের মধ্য দিয়ে টিকে আছে। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে এই রাষ্ট্রব্যবস্থা সংকটের সঙ্গে লড়াই করে নিজেদের টিকিয়ে রাখার একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করেছে। সেই অভিজ্ঞতাকে অবমূল্যায়ন করাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বড় ভুল ছিল।
এখন ট্রাম্পের সবচেয়ে জরুরি লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া। কারণ ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ভালোভাবে নেয়নি। যুদ্ধ আবার বড় আকারে শুরু হলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জনমত আরও শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু হরমুজ খুলতে হলে ইরানের সঙ্গে কোনো না কোনো সমঝোতায় যেতে হবে। আর সেখানেই রাজনৈতিক জটিলতা।
ইরান যে ছাড় চাইছে, তার অনেকগুলো ট্রাম্পের নিজ দলের কট্টরপন্থী রিপাবলিকানদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে ট্রাম্প এমন কোনো চুক্তি করতে চান না, যেটিকে তার বিরোধীরা দুর্বলতা হিসেবে তুলে ধরতে পারে। বিশেষ করে তিনি চান না, ইরানের সঙ্গে তার কোনো সমঝোতার তুলনা ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির সঙ্গে করা হোক। বারাক ওবামার আমলে হওয়া সেই চুক্তির তীব্র সমালোচক ছিলেন ট্রাম্প। প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় এসে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সেই চুক্তি থেকে বের করে নিয়েছিলেন।
এ কারণে ট্রাম্প এখন এমন এক অবস্থায় আছেন, যেখানে যুদ্ধ চালানো ঝুঁকিপূর্ণ, আবার সমঝোতা করাও রাজনৈতিকভাবে কঠিন। অন্যদিকে ইরানও চাইছে না, ট্রাম্প সহজে এই সংকট থেকে বের হওয়ার রাস্তা খুঁজে পান। তেহরানের শাসকগোষ্ঠী এখন বিষয়টিকে শুধু কূটনৈতিক দর-কষাকষি হিসেবে দেখছে না; তারা এটিকে রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা রক্ষার লড়াই হিসেবে দেখছে।
ইরানের নেতৃত্ব মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের আরও হামলা তাদের অবস্থান বদলাতে পারবে না। বরং অতিরিক্ত চাপ তাদের অভ্যন্তরীণ ঐক্য আরও শক্ত করতে পারে। এই মনস্তত্ত্ব বোঝা জরুরি। কারণ কোনো রাষ্ট্র যখন নিজেকে অস্তিত্বের সংকটে মনে করে, তখন সে সাধারণ কূটনৈতিক ছাড়ের পথে সহজে হাঁটে না।
উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর অবস্থাও জটিল। ধনী আরব রাষ্ট্রগুলো এই সংঘাতের অর্থনৈতিক ক্ষতি সরাসরি অনুভব করছে। তারা আর যুদ্ধ চায় না। কাতার পাকিস্তানের সঙ্গে মধ্যস্থতায় সক্রিয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব ভিন্ন ভিন্ন কৌশল নিয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করেছে। ইসরায়েল সেখানে আয়রন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সেনা মোতায়েন করেছে। অন্যদিকে সৌদি আরব বলছে, ইরানের হামলার জবাবে তারা কিছু সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে রিয়াদ তেহরানকে জানিয়ে দিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের অংশ হিসেবে নয়, নিজেদের সিদ্ধান্তে এসব পদক্ষেপ নিচ্ছে।
এই বার্তাটি গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব বুঝতে পারছে, সরাসরি বড় সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে তার অর্থনীতি, তেল রপ্তানি, বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই তারা একদিকে নিরাপত্তা রক্ষার ভাষা ব্যবহার করছে, অন্যদিকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এড়াতে চাইছে।
পুরো পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুদ্ধবিরতি থাকলেও প্রকৃত শান্তি এখনো অনেক দূরে। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ দিয়ে কূটনৈতিক সুবিধা নিতে চায়। ইরান চাপের মুখে ছাড় দিতে নারাজ। ইসরায়েল সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে চায়। আরব রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতি কমাতে চায়। বিশ্ববাজার হরমুজ প্রণালির দিকে তাকিয়ে আছে। এই বহুস্তরীয় সংকটে কোনো একক সিদ্ধান্ত দ্রুত সমাধান আনবে না।
যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ভেবেছিলেন, বিমান শক্তিই ইরানের ইসলামিক শাসনব্যবস্থাকে সরিয়ে দিতে যথেষ্ট হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, সামরিক শক্তি দিয়ে সব রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হয় না। ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থা দুর্বল হলেও তা ভেঙে পড়েনি। বরং চাপের মুখে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
এখন ভুল হিসাবের মূল্য শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দিচ্ছে না; পুরো বিশ্ব দিচ্ছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ, জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত, উপসাগরীয় অর্থনীতিতে চাপ, লেবাননে নতুন হামলার আশঙ্কা এবং ইরানের কঠোর অবস্থান—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য আবারও এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে যুদ্ধ থামলেও শান্তির পথ এখনো অনিশ্চিত।
এই সংকটের মূল শিক্ষা হলো, শক্তি প্রদর্শন দিয়ে আলোচনার দরজা খোলা যায়, কিন্তু স্থায়ী সমাধান তৈরি করা যায় না। ট্রাম্প যুদ্ধ থামাতে চান, কিন্তু এমন কোনো ছাড় দিতে চান না যা রাজনৈতিকভাবে তাকে দুর্বল দেখাবে। ইরান আলোচনায় থাকতে পারে, কিন্তু আত্মসমর্পণের ভাষা মেনে নেবে না। তাই সামনে যে পথ, তা দীর্ঘ, কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ।

