মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন এক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে ইরানের প্রভাবকে পাশ কাটিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে নীরবে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত তিন সপ্তাহে প্রায় ৭০টি বাণিজ্যিক জাহাজকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমে সহায়তা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড। যদিও এসব যাত্রার অধিকাংশই হয়েছে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এবং জাহাজগুলো তাদের অবস্থান শনাক্তকারী যন্ত্র বন্ধ রেখেই চলাচল করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু সামুদ্রিক নিরাপত্তার বিষয় নয়; বরং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব নিয়ে চলমান কৌশলগত প্রতিযোগিতার নতুন অধ্যায়।
বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ এই সংকীর্ণ জলপথের ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। ফলে হরমুজে কোনো অস্থিরতা দেখা দিলে তার প্রভাব সরাসরি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে পড়ে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের পর ইরান এই প্রণালিকে নিজেদের কৌশলগত চাপ প্রয়োগের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তেহরান দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে হরমুজ প্রণালির আশপাশের জলসীমায় তাদের বিশেষ প্রভাব রয়েছে এবং সেখানে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর তাদের নজরদারি অব্যাহত থাকবে।
এই পরিস্থিতিতে অনেক জাহাজমালিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়েছেন। কেউ কেউ ইরানকে বিভিন্ন ধরনের অনুমতি ফি বা টোল দিতে বাধ্য হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান সংঘাতের আশঙ্কায় পারস্য উপসাগরে যাতায়াতই সীমিত করে দেয়।
এমন প্রেক্ষাপটে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে সামনে আসে যুক্তরাষ্ট্র-সমন্বিত নৌপথ। জানা গেছে, বেশ কয়েকটি জাহাজ ওমানের কাছাকাছি রুট ব্যবহার করে ইরানের উপকূল থেকে দূরে অবস্থান বজায় রেখে যাতায়াত করছে। এর ফলে সরাসরি সংঘাত বা হামলার ঝুঁকি কিছুটা কমছে।
তবে এই ব্যবস্থাও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। কারণ ইরান এখনো হরমুজ অঞ্চলে শক্তিশালী উপস্থিতি বজায় রেখেছে। ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং নৌ টহল ব্যবস্থার মাধ্যমে তারা প্রণালিটির ওপর নজর রাখছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় চলাচলকারী জাহাজগুলোকেও সম্ভাব্য ঝুঁকির বাইরে বলা যাচ্ছে না।
মজার বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কোনো নৌবহর দিয়ে জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে না। বরং তারা তথ্য আদান-প্রদান, যোগাযোগ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে জাহাজগুলোকে নিরাপদ পথ বেছে নিতে সহায়তা করছে। অর্থাৎ এটি একটি সামরিক এসকর্ট অভিযান নয়, বরং কৌশলগত সহায়তা কার্যক্রম।
অন্যদিকে, ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর লক্ষ্যেও সমান্তরাল পদক্ষেপ নিয়েছে ওয়াশিংটন। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের বন্দর ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অবরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে দেশটির তেল রপ্তানিও কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে বাস্তবতা হলো, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব এখনো পুরোপুরি কমেনি। সামুদ্রিক তথ্য বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রণালি দিয়ে হওয়া যাত্রার অর্ধেকেরও বেশি এখনো ইরান-নিয়ন্ত্রিত রুট ব্যবহার করেছে। আবার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জাহাজ এমন রুটে চলেছে, যেগুলোর তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এ থেকে স্পষ্ট যে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে প্রভাব বিস্তারের লড়াই এখনো শেষ হয়নি। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে বিকল্প পথ তৈরি করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ইরান এই কৌশলগত জলপথে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে মরিয়া।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনগুলোতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার অগ্রগতি, সম্ভাব্য সমঝোতা চুক্তি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নির্ধারণ করবে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ। তবে আপাতত এটুকু স্পষ্ট, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে কেন্দ্র করে নীরব কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা চলমান রয়েছে।

