ইউরোপের অর্থনীতি কি সত্যিই দুর্বল হয়ে পড়ছে, নাকি এই ধারণার মধ্যে কিছুটা অতিরঞ্জন আছে? সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রশ্ন ঘিরে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান ইউরোপের পতন নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর যুক্তি হলো, উৎপাদনশীলতা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় পিছিয়ে থাকলেও সাধারণ মানুষের জীবনমান এখনো ততটা পিছিয়ে যায়নি। অর্থাৎ ইউরোপকে শুধু দুর্বল প্রবৃদ্ধির চোখে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যায় না।
এই বিতর্কের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট আছে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং ইতালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মারিও দ্রাগি ২০২৪ সালের ইউরোপীয় প্রতিযোগিতা–সংক্রান্ত প্রতিবেদনে সতর্ক করেছিলেন যে ইউরোপ প্রযুক্তি, শিল্প ও উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদে ইউরোপ যদি প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকে, তাহলে তার অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
কিন্তু পল ক্রুগম্যান বিষয়টিকে কিছুটা ভিন্নভাবে দেখেছেন। তাঁর মতে, ইউরোপের জীবনমান বিচার করতে হলে শুধু স্থির মূল্যে মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন দেখলেই হবে না। বরং মানুষের আয় দিয়ে তারা কত পণ্য ও সেবা কিনতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এই জায়গায় ক্রয়ক্ষমতা সমতার ভিত্তিতে হিসাব করলে দেখা যায়, ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় একেবারে দুর্বল অবস্থানে নেই। ইউরোপীয় নাগরিকদের জীবনমান অনেক ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছে।
এখানেই মূল প্রশ্নটি সামনে আসে। যদি ইউরোপের উৎপাদনশীলতা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কম হয়, তাহলে ইউরোপীয়রা কীভাবে প্রায় একই ধরনের জীবনমান ধরে রাখতে পারছে? যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশীলতার বড় অংশ এসেছে সিলিকন ভ্যালি–কেন্দ্রিক প্রযুক্তি খাত থেকে। বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ডিজিটাল পণ্য, সফটওয়্যার, অনলাইন সেবা ও প্রযুক্তি কোম্পানির বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হয়েছে। ইউরোপ এসব পণ্যের বড় উৎপাদক না হলেও বড় ভোক্তা। অর্থাৎ ইউরোপ প্রযুক্তি আবিষ্কার না করেও সেই প্রযুক্তির সুবিধা পাচ্ছে।
এই বাস্তবতা ইউরোপের জন্য এক ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি করেছে। প্রযুক্তিপণ্য সময়ের সঙ্গে সস্তা হয়েছে, কারণ বাজারে প্রতিযোগিতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি প্রযুক্তি শুধু মার্কিন ভোক্তারাই ব্যবহার করছে না, ইউরোপীয়রাও তা ব্যবহার করছে। ফলে প্রযুক্তিগত উন্নতির সুফল ইউরোপীয় ভোক্তারাও পাচ্ছে। তারা হয়তো সেই উদ্ভাবনের মূল কেন্দ্র নয়, কিন্তু বিশ্ববাণিজ্য ও প্রতিযোগিতামূলক বাজারের মাধ্যমে সেই উদ্ভাবনের লাভ তাদের জীবনেও পৌঁছে যাচ্ছে।
এই কারণে ক্রুগম্যানের যুক্তিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। উৎপাদনশীলতা কম হওয়া মানেই সরাসরি জীবনমান কমে যাওয়া নয়। একটি দেশ নিজে কম উদ্ভাবন করলেও যদি সে বিশ্ববাজার থেকে উন্নত প্রযুক্তি ও সস্তা পণ্য পেতে পারে, তাহলে তার ভোক্তারা উপকৃত হতে পারে। ইউরোপের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত সেটিই ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ইউরোপের ভোক্তাদেরও ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়েছে।
তবে এই যুক্তির বিপরীত দিকও আছে। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ লুইস গারিকানো এবং অন্য কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করেন, ক্রুগম্যানের বিশ্লেষণে একটি বড় বিষয় উপেক্ষিত হয়েছে। সিলিকন ভ্যালির উদ্ভাবন শুধু সস্তা প্রযুক্তিপণ্য তৈরি করেনি; এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক মজুরি, দক্ষতা ও অর্থনৈতিক গতিশীলতাও বাড়িয়েছে। ফলে একই ধরনের কর্মীরাও যুক্তরাষ্ট্রে ইউরোপের তুলনায় বেশি আয় করতে পারে। তাই প্রযুক্তিগত নেতৃত্বকে শুধু পণ্যের দামের দিক থেকে দেখা যথেষ্ট নয়।
তবুও ইউরোপের বর্তমান অবস্থান বুঝতে হলে প্রবৃদ্ধি ও কল্যাণের পার্থক্য বুঝতে হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বলতে বোঝায় একটি দেশ সময়ের সঙ্গে কত বেশি পণ্য ও সেবা উৎপাদন করছে। আর অর্থনৈতিক কল্যাণ বলতে বোঝায় মানুষ তাদের আয়ে কতটা ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারছে। ইউরোপ হয়তো প্রবৃদ্ধিতে দুর্বল, কিন্তু বিশ্বায়ন, বাণিজ্য এবং প্রযুক্তি আমদানির কারণে জীবনমান এখনো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।
কিন্তু এই সুবিধা চিরস্থায়ী হবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে জার্মানির অর্থনীতি ইউরোপের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে। ২০১৯ সালের পর থেকে স্থির মূল্যে মোট দেশজ উৎপাদনের হিসাবে জার্মান অর্থনীতি স্থবিরতার মুখে রয়েছে। এই দুর্বলতার জন্য অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি বা ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতিকে দায়ী করতে পারেন, কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে জার্মানির বড় চাপ এসেছে চীন থেকে।
চীন দ্রুত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং উচ্চমূল্যের রপ্তানি পণ্যে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। সবুজ প্রযুক্তি, ডিজিটাল প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, যন্ত্রপাতি ও উন্নত উৎপাদন খাতে চীনের উত্থান জার্মানির জন্য সরাসরি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কারণ জার্মান অর্থনীতির শক্তি দীর্ঘদিন ধরে গাড়ি, যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক শিল্পের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। এখন সেই খাতগুলোতেই চীন প্রতিযোগী হয়ে উঠছে।
এটি শুধু বাজার হারানোর সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িত উদ্ভাবনী সক্ষমতা, শিল্পভিত্তি এবং ভবিষ্যৎ আয়ের প্রশ্ন। যদি জার্মানি তার ঐতিহ্যগত শক্তিশালী শিল্পগুলোতেই পিছিয়ে পড়ে, তাহলে ইউরোপের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হতে পারে। সস্তা চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি বা যন্ত্রপাতি ইউরোপীয় ভোক্তার জন্য স্বল্পমেয়াদে লাভজনক হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে যদি ইউরোপ নিজের উৎপাদনক্ষমতা ও উদ্ভাবনী শক্তি হারায়, তাহলে আয়, কর্মসংস্থান ও জীবনমান—সবই চাপে পড়বে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শ্রমঘণ্টা। যুক্তরাষ্ট্রের মাথাপিছু উৎপাদন বেশি হওয়ার একটি কারণ হলো, মার্কিনরা তুলনামূলকভাবে বেশি সময় কাজ করে। জার্মানিতে একজন কর্মী বছরে গড়ে প্রায় ১,৩৫০ ঘণ্টা কাজ করেন। ফ্রান্সে এই সংখ্যা প্রায় ১,৫০০ ঘণ্টা, আর যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১,৮০০ ঘণ্টা। ফলে উৎপাদনে শ্রমের অবদান যুক্তরাষ্ট্রে বেশি।
জার্মানি এখন শ্রমঘণ্টা বাড়ানোর পথ নিয়ে ভাবছে। বিশেষ করে নারীদের শ্রমবাজারে আরও বেশি অংশগ্রহণে উৎসাহ দিতে কিছু কর সুবিধা পুনর্বিবেচনার কথা বলা হচ্ছে, যেগুলো অনেক ক্ষেত্রে মায়েদের ঘরে থাকতে উৎসাহিত করে। জার্মানিতে নারীদের কর্মসংস্থান বেড়েছে, কিন্তু অনেকেই খণ্ডকালীন কাজে যুক্ত হওয়ায় গড় কাজের সময় কম। ফলে শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হার বেশি হলেও মোট শ্রমঘণ্টা তুলনামূলকভাবে কম।
তবে শুধু বেশি সময় কাজ করলেই জার্মানি বা ইউরোপের অর্থনৈতিক সমস্যা মিটবে না। দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক শক্তির সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো নতুন ধারণা, নতুন প্রযুক্তি এবং নতুন শিল্প তৈরি করার ক্ষমতা। ইউরোপ যদি প্রযুক্তির সীমান্তে ফিরে যেতে না পারে, তাহলে শুধু শ্রমঘণ্টা বাড়িয়ে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হবে।
এই আলোচনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, ইউরোপ এখনো দরিদ্র হয়ে যায়নি, কিন্তু নিশ্চিন্ত থাকারও সুযোগ নেই। ইউরোপ এখন পর্যন্ত বিশ্বায়নের সুবিধা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ইউরোপের জীবনমান বাড়িয়েছে। চীনের সস্তা পণ্যও ইউরোপীয় ভোক্তাদের কিছু সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু অন্যের উদ্ভাবনের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে সমৃদ্ধি ধরে রাখা যায় কি না, সেটি অনিশ্চিত।
ইউরোপের সামনে তাই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে তাকে বর্তমান জীবনমান ধরে রাখতে হবে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের শিল্প ও প্রযুক্তিতে নিজের অবস্থান শক্ত করতে হবে। শুধু সস্তা পণ্য কেনার ক্ষমতা থাকলেই অর্থনীতি শক্তিশালী হয় না; শক্তিশালী অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন নিজস্ব উদ্ভাবন, দক্ষ জনশক্তি, প্রতিযোগিতামূলক শিল্প এবং নতুন প্রযুক্তি তৈরির সক্ষমতা।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, ইউরোপ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ততটা দরিদ্র নয়, কারণ তার নাগরিকরা বিশ্ববাজার ও প্রযুক্তি বাণিজ্যের সুফল পাচ্ছে। কিন্তু প্রবৃদ্ধি ও উদ্ভাবনে দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা যদি চলতে থাকে, তাহলে এই ভারসাম্য ভেঙে যেতে পারে। ইউরোপের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সে কত দ্রুত নিজের শিল্পশক্তি, প্রযুক্তি সক্ষমতা এবং উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতা পুনর্গঠন করতে পারে তার ওপর। জীবনমান ধরে রাখতে হলে শুধু বেশি কাজ করাই যথেষ্ট নয়; নতুন ধারণা, নতুন শিল্প এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির দৌড়ে আবারও শক্ত অবস্থান নিতে হবে।

