একসময় ইরানের প্রযুক্তি খাত ছিল আশা, উদ্ভাবন আর তরুণ উদ্যোক্তাদের সাহসী স্বপ্নের জায়গা। বাইরের বিশ্বের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানে কাজ করতে পারত না। উবার, অ্যামাজনসহ বহু বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মের অনুপস্থিতি ইরানের তরুণদের সামনে এক বিরল সুযোগ খুলে দিয়েছিল। তারা বুঝেছিল, বিদেশি কোম্পানি না এলে নিজেদের বাজার নিজেদেরই তৈরি করতে হবে। সেই শূন্যতা থেকেই জন্ম নিয়েছিল ইরানের নিজস্ব অনলাইন বাজার, যাতায়াত সেবা, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম, পেমেন্ট ব্যবস্থা, ভ্রমণ সেবা ও বিজ্ঞাপনভিত্তিক ডিজিটাল ব্যবসা।
এই গল্পটি হতে পারত ইরানের বেসরকারি খাতের এক বড় সাফল্যের গল্প। এটি হতে পারত এমন এক প্রজন্মের গল্প, যারা রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে চেয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গল্পটি শুধু উদ্ভাবনের থাকেনি। এটি পরিণত হয়েছে নিয়ন্ত্রণ, ভয়, রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ এবং উদ্যোক্তাদের হাতে গড়া সম্পদের ওপর ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর দখলদারির গল্পে।
এই ইতিহাস জানার জন্য ৭০ জনের বেশি মানুষের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে এবং হাজার হাজার পৃষ্ঠার গোপন সরকারি ও করপোরেট নথি, ইমেইল ও রেকর্ড পরীক্ষা করা হয়েছে। পাঁচ বছরের অনুসন্ধানে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা শুধু ইরানের প্রযুক্তি খাতের সংকট নয়; বরং পুরো অর্থনীতি কীভাবে জবাবদিহিহীন ক্ষমতার প্রভাবের নিচে চলে গেছে, তারও একটি প্রতীকী উদাহরণ।
এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রদের একজন সাঈদ রহমানি। তিনি ইরানে বড় হয়েছেন ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগের দেড় দশকে। পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান, বিদেশে পড়াশোনা করেন, আইবিএমে কাজ পান এবং পরবর্তী সময়ে তথ্য সংরক্ষণ খাতে একটি আধুনিক প্রযুক্তি উদ্যোগ গড়ে তোলেন। ২০১১ সালে তিনি আবার তেহরানে ফিরে আসেন। প্রথমে তিনি একটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের হয়ে সম্ভাব্য বিনিয়োগ খুঁজছিলেন। পরে সেই প্রতিষ্ঠান পিছিয়ে গেলে তিনি নিজেই একটি ঝুঁকি বিনিয়োগ তহবিল গড়ে তোলেন। তার সেই প্রতিষ্ঠান ছিল সারাভা।
সারাভার লক্ষ্য ছিল শুধু কয়েকটি কোম্পানিতে টাকা ঢালা নয়। রহমানি চেয়েছিলেন ইরানে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা পরিবেশ তৈরি করতে। তার নজরে আসে অনলাইন কেনাকাটা, ভিডিও শেয়ারিং, পেমেন্ট, ভ্রমণ, শ্রেণিবদ্ধ বিজ্ঞাপনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করা সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোগ। এসব উদ্যোগকে তিনি শুধু অর্থ নয়, পরামর্শ, ব্যবসায়িক দিকনির্দেশনা এবং আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থাপনা শেখাতে চেয়েছিলেন।
সারাভার সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল ডিজিকালা। এটি শুরু করেছিলেন হামিদ মোহাম্মাদি ও সাঈদ মোহাম্মাদি নামের দুই যমজ ভাই। তারা ছিলেন একজন রুটি বিক্রেতার সন্তান। ২০০৬ সালে ডিজিকালা শুরু করতে একজন ভাই নিজের গাড়ি বিক্রি করেছিলেন, অন্যজন নিজের বিয়ের জন্য রাখা টাকা ব্যবহার করেছিলেন। শুরুতে তারা বড় অফিস বা বিশাল পুঁজি নিয়ে নামেননি। বড় ভাইয়ের দেওয়া একটি অফিস থেকে কাজ চলত, আর তেহরানের মধ্যে পণ্য পৌঁছে দেওয়া হতো মোটরচালিত স্কুটারে।
সারাভা তার প্রাথমিক তহবিলের অর্ধেকের কিছু বেশি ডিজিকালায় বিনিয়োগ করে এবং কোম্পানির ৫১ শতাংশ শেয়ার নেয়। সেই বিনিয়োগ ডিজিকালাকে বদলে দেয়। এটি শুধু প্রযুক্তিপ্রেমী তরুণদের জন্য ইলেকট্রনিকস পণ্যের ওয়েবসাইট হিসেবে থাকেনি; ধীরে ধীরে ইরানের বড় অনলাইন খুচরা বাজারে পরিণত হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিতরণকেন্দ্র তৈরি হয়, পরদিন পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সেবা চালু হয়। যারা আগে কখনও অনলাইনে কেনাকাটা করেনি, তারাও ডিজিকালা থেকে পণ্য অর্ডার করতে শুরু করে। ২০১৪ সালের শেষ নাগাদ ডিজিকালা দিনে ৩ হাজার অর্ডার পাচ্ছিল এবং এর মূল্য দাঁড়িয়েছিল ১৫ কোটি ডলার।
সারাভা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগেও বিনিয়োগ করেছিল। সেটি ছিল আভাটেক নামের একটি সহায়ক কেন্দ্র, যেখানে নতুন উদ্যোক্তাদের জায়গা, পরামর্শ, তহবিল ও দিকনির্দেশনা দেওয়া হতো। শত শত দল এতে আবেদন করেছিল। নির্বাচিত উদ্যোক্তাদের মধ্যে কেউ ছিলেন রাষ্ট্রীয় ভাবধারার কাছাকাছি, আবার কেউ ছিলেন এমন পরিবার বা বন্ধুপরিসর থেকে আসা, যাদের কেউ বিরোধী আন্দোলনের সময় কারাগারে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ ইরানের প্রযুক্তি খাত এক অদ্ভুত মিশ্র জায়গা হয়ে উঠেছিল—যেখানে রাজনৈতিক ভিন্নতা থাকলেও সবাই একই স্বপ্ন দেখছিল: নিজের দক্ষতায় সফল হওয়া।
ইরানের প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের চ্যালেঞ্জ ছিল অন্য দেশের উদ্যোক্তাদের চেয়ে কঠিন। ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা সরাসরি আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করতে পারত না। বিদেশি সফটওয়্যার, সার্ভার, কোড সংরক্ষণ ব্যবস্থা বা প্রযুক্তি সেবা কিনতে সমস্যা হতো। অনেক ক্ষেত্রে তারা বাধ্য হয়ে নিজেদের বিকল্প তৈরি করত। কিন্তু এই বাধাই তাদের সৃজনশীল করে তোলে। অনলাইন দোকান, যাতায়াত সেবা, দেশীয় ডিজিটাল পেমেন্ট ও বিভিন্ন প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসা দ্রুত এগোতে থাকে।
এই সময়ে ইরানে প্রযুক্তি খাত এক নতুন সামাজিক সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে ওঠে। যে সমাজে পরিবারের পরিচয়, রাজনৈতিক সম্পর্ক বা ক্ষমতার কাছে থাকা অনেক সময় সাফল্যের পথ খুলে দেয়, সেখানে প্রযুক্তি খাত তুলনামূলকভাবে নতুন এক মেধাভিত্তিক জায়গা তৈরি করেছিল। একজন রুটি বিক্রেতার সন্তানও বড় প্রযুক্তি উদ্যোক্তা হতে পারে—এই বিশ্বাস তরুণদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছিল। মোহাম্মাদি ভাইয়েরা এমনকি ইরানের বাইরে ব্যবসা সম্প্রসারণের স্বপ্ন দেখছিলেন।
কিন্তু এই দ্রুত উত্থানই শেষ পর্যন্ত বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইরানের অর্থনীতির বড় অংশ প্রকৃত অর্থে স্বাধীন বেসরকারি খাত নয়। অনেক বড় শিল্প ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন কোম্পানি অথবা ধর্মীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত বড় অর্থনৈতিক ফাউন্ডেশনের অধীনে পরিচালিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতা পছন্দ করে না। তারা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাজারে প্রভাব বিস্তার করে। ফলে প্রযুক্তি খাত যত বড় হচ্ছিল, ততই সেটি ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর চোখে পড়ছিল।
শুরুর দিকে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এমন এক আইনি ফাঁকা জায়গায় কাজ করছিল, যেখানে পুরোনো বাণিজ্য আইন তাদের পুরোপুরি বুঝতে বা সুরক্ষা দিতে পারেনি। এই অস্পষ্টতা উদ্যোক্তাদের জন্য যেমন সুযোগ তৈরি করেছিল, তেমনি রাষ্ট্রের জন্যও হস্তক্ষেপের দরজা খুলে দিয়েছিল। যখন আইন স্পষ্ট নয়, তখন ক্ষমতাবান সংস্থা যেকোনো সময় নানা অভিযোগে চাপ তৈরি করতে পারে। ইরানের প্রযুক্তি খাতও ধীরে ধীরে সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়।
২০১৫ সালের দিকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। তখন হাসান রুহানির সরকার পশ্চিমের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তির দিকে এগোচ্ছিল। নিষেধাজ্ঞা শিথিল হবে—এমন আশায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও বাড়ছিল। রুহানির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সহকারী সোরেনা সাত্তারি প্রযুক্তি খাতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছিলেন। তিনি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে দেখা করতেন এবং খাতটির অগ্রগতিকে উৎসাহিত করতেন। সারাভা তখন ইরানের সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। রহমানি ডিজিকালাকে আরও বড় করতে ১০ কোটি ডলার প্রয়োজন মনে করেছিলেন; শেষ পর্যন্ত তিনি এর দ্বিগুণের বেশি অর্থ সংগ্রহ করেন।
কিন্তু একই বছর পরিস্থিতি মোড় নেয়। ২০১৫ সালের গ্রীষ্মের শেষ দিকে, পারমাণবিক চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর, সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর শত শত কর্মকর্তার সামনে ভাষণ দেন। সেখানে তিনি সতর্ক করেন, শত্রুরা ইরানে অনুপ্রবেশ করতে চাইছে। সেই অনুপ্রবেশ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক হতে পারে। কয়েক সপ্তাহ পর আরেক ভাষণে তিনি অনুপ্রবেশ অর্থবোধক শব্দটি ৫৪ বার ব্যবহার করেন এবং দেশের ভেতরে আমেরিকাসংযুক্ত অর্থনৈতিক প্রভাবের নেটওয়ার্কের কথা বলেন।
এই ভাষণগুলোর পর প্রযুক্তি খাতের ওপর সন্দেহ বাড়তে থাকে। স্টার্টআপ সম্মেলন, বিদেশি উপদেষ্টা, বিনিয়োগকারী, সিলিকন ভ্যালির মতো কর্মসংস্কৃতি—এসবকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। তরুণ উদ্যোক্তাদের কাছে এগুলো ছিল আধুনিক ব্যবসার ভাষা; কিন্তু ক্ষমতাকেন্দ্রের কাছে এগুলো হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অনুপ্রবেশের লক্ষণ।
২০১৬ সালের দিকে সামাজিক মাধ্যমে শবনামেহ নামে একটি রহস্যময় অ্যাকাউন্ট দেখা দেয়। এটি নিজেকে যেন গোপন সত্য প্রকাশকারী সাহসী মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরত। কিন্তু প্রতিবেদনে বলা হয়, এর পেছনে নিরাপত্তা রাষ্ট্রের গভীর অংশের প্রভাব ছিল বলে ধারণা করা হয়। এই অ্যাকাউন্ট প্রযুক্তি খাতকে পশ্চিমা সমর্থিত সরকার পরিবর্তনের নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে দেখাতে থাকে। সাঈদ রহমানি ও সারাভাকে লক্ষ্য করে অভিযোগ তোলা হয় যে তারা পরিবর্তনের প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
২০১৬ সালের শেষ দিকে শবনামেহ একটি নাট্যধর্মী ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে প্রযুক্তি উদ্যোগগুলোর সঙ্গে পশ্চিমা যোগাযোগ দেখানোর চেষ্টা করা হয়। সাঈদ রহমানি, ডিজিকালা ও আভাটেকের নাম সেখানে আসে। আভাটেকের অফিসে তৈরি একটি সংগীত ভিডিওর অংশও ব্যবহার করা হয়। আগে যে ভিডিওটি উদ্যোক্তাদের সংগ্রাম ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক ছিল, সেটিই রাষ্ট্রীয় সন্দেহের চোখে পশ্চিমা সংস্কৃতি প্রচারের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
রহমানি নিরাপত্তা বাহিনীর সন্দেহ কমাতে রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিনিয়োগ আলোচনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেগুলোও এগোয়নি। প্রতিবেদনের একটি সূত্রের দাবি, নিরাপত্তা বাহিনী এসব প্রতিষ্ঠানকে সারাভা থেকে দূরে থাকতে বলেছিল, কারণ রহমানিকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য বা বিশ্বাসযোগ্য মনে করা হচ্ছিল না। এরপর রহমানিকে প্রায় প্রতি সপ্তাহে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়, যা এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে। এতে তার মানসিক চাপ বাড়ে, ঘুম নষ্ট হয় এবং তিনি বুঝতে পারছিলেন না, আশপাশের কার ওপর ভরসা করবেন।
প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো রাষ্ট্রের কাছে আরেক কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—তাদের হাতে ছিল সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের তথ্য। মানুষ কী কিনছে, কোথায় যাচ্ছে, কী ব্যবহার করছে, কী অর্ডার করছে—এসব তথ্য প্রযুক্তি কোম্পানির কাছে জমা হচ্ছিল। কখনও আদালতের চিঠিতে নির্দিষ্ট অপরাধ তদন্তের জন্য তথ্য চাওয়া হতো। আবার কখনও অজ্ঞাত কর্তৃপক্ষ ফোন করে বিস্তৃত সময়ের ব্যবহারকারীর তথ্য চাইত।
অনেক নির্বাহী এসব দাবিতে সাড়া দেওয়ার পক্ষে যুক্তি খুঁজতেন। তারা ভাবতেন, অস্বীকার করলে কোম্পানি ঝুঁকিতে পড়বে এবং হাজারো তরুণের চাকরি বিপন্ন হবে। কিন্তু এই আপস তাদের ভেতরে নৈতিক দ্বন্দ্ব তৈরি করছিল। যারা নিজেদের আধুনিক, উদার ও ব্যবহারকারীকেন্দ্রিক প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ভাবতেন, তারা ধীরে ধীরে এমন এক ব্যবস্থার অংশ হয়ে যাচ্ছিলেন, যেখানে ব্যবহারকারীর তথ্য রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হতে পারে।
এখানেই ইরানের প্রযুক্তি খাতের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য দেখা যায়। উদ্যোক্তারা অনুপ্রাণিত ছিলেন সিলিকন ভ্যালির প্রতিযোগিতা, উদ্ভাবন ও ব্যবহারকারী-কেন্দ্রিক ধারণা থেকে। কিন্তু সিলিকন ভ্যালি তৈরি হয়েছিল তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত অবকাঠামো ও মুক্ত ইন্টারনেটের পরিবেশে। ইরানে ছিল সেন্সরশিপ, সীমিত প্রবেশাধিকার, নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিযোগিতাবিরোধী অর্থনৈতিক সংস্কৃতি। শুরুতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও টিকে ছিল, কিন্তু পরে দেখা গেল, সেই সীমাবদ্ধতাই তাদের ভেতর থেকে ক্ষয় করছে।
আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো কার্যত ঠিক করতে পারত কোন অ্যাপ ডাউনলোড করা যাবে, কোন পণ্য বিক্রি হবে, কোন ওয়েবসাইট দেখা যাবে, এমনকি কোন কোম্পানি বাঁচবে আর কোনটি বন্ধ হবে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতার পথ নেয়। তাপসি নামে একটি যাতায়াত সেবা ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর অর্থদাতাদের বিনিয়োগ নিয়ে চালু হয়। স্ন্যাপ নামের আরেক যাতায়াত সেবা রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ একটি টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানের কাছে কিছু শেয়ার বিক্রি করে। কিছু প্রযুক্তি নির্বাহী সেন্সরশিপ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে সহায়তা করেছিল বলেও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সারাভার ভেতরেও রাষ্ট্রের সঙ্গে আপসের চাপ বাড়ে। এক বিনিয়োগকারী রহমানিকে এমন একজনকে বোর্ডে নিতে বলেন, যিনি ক্ষমতাকেন্দ্রের ভাষা বোঝেন এবং সমস্যা কমাতে পারেন। রহমানি ভাবলেন, সাত সদস্যের বোর্ডে একজনকে জায়গা দেওয়া হয়তো বড় ত্যাগ নয়। কিন্তু পরে সেই ব্যক্তি রহমানির কাছে প্রস্তাব আনেন—সমস্যা মেটাতে চাইলে রহমানিকে নিজের শেয়ারের ১৫ শতাংশ ছেড়ে দিতে হবে। কে এই প্রস্তাব দিচ্ছে, কার হয়ে তিনি কথা বলছেন—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মেলেনি। রহমানি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু বার্তাটি পরিষ্কার ছিল: নিরাপদ থাকতে চাইলে কোম্পানির অংশ ছাড়তে হবে।
ডিসেম্বর ২০১৭ সালে রহমানি তার কয়েকজন নির্বাহীকে নিয়ে ইরানের কেশম দ্বীপে করপোরেট ভ্রমণে যান। সঙ্গে ছিলেন এমাদ শার্গি, একজন ইরানি-আমেরিকান ব্যবসায়ী, যিনি সারাভার আনুষ্ঠানিক নির্বাহী না হলেও অনানুষ্ঠানিক পরামর্শ দিতেন। ভ্রমণের শেষ দিনে তারা জানতে পারেন, তাদের মিনিবাসে ভাঙচুর হয়েছে। শার্গির ব্যাগসহ কয়েকটি ব্যাগ চুরি যায়, যেখানে তার আমেরিকান ও ইরানি পাসপোর্ট ছিল। ঘটনাটি নিরাপত্তা সংস্থার সাজানো সতর্কবার্তা ছিল বলে ধারণা করা হয়।
২০১৮ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে রহমানি ইরানে ফেরার পর বিমানবন্দরে তার পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। কর্তৃপক্ষ অভিযোগ তোলে, সারাভা অর্থ পাচারে জড়িত এবং বিদেশি বিনিয়োগ ভুয়া। কোম্পানির কাছ থেকে বিপুল নথি চাওয়া হয়। রহমানি শার্গিকে ইরানে না ফিরতে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু ১৮ মার্চ শার্গি ইরানি নববর্ষ উদযাপনের জন্য ফিরে আসেন।
২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল রাত প্রায় ২টায় উত্তর তেহরানের একটি ব্যস্ত ব্যবসায়িক এলাকায় সারাভার সদর দপ্তরে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। ভবনের নিরাপত্তাকর্মীরা দেখেন, কয়েকজন লোক অফিসে ঢুকে পড়েছে। প্রথমে মনে হয়েছিল ডাকাতি হচ্ছে। কিন্তু তারা ছিল ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সদস্য। এর আগে তারা শার্গির থাকার জায়গায় অভিযান চালিয়ে তাকে গাড়িতে তুলে সারাভার অফিসে নিয়ে আসে। অফিসের দরজা ভেঙে ঢোকা হয়, ব্যাগ ও বাক্সে করে বহু জিনিস নিয়ে যাওয়া হয়, এমনকি কনফারেন্স রুমের বড় পর্দাও তুলে নেওয়া হয়। অফিসের দরজায় বিচারিক আদেশে বন্ধের সিল লাগানো হয়। শার্গির আঙুলে কালি লাগিয়ে তাকে জব্দ করা জিনিসের নথিতে স্বাক্ষর ও আঙুলের ছাপ দিতে বাধ্য করা হয়। এরপর তাকে কারাগারে নেওয়া হয়।
পরবর্তী আট মাসে শার্গিকে শত শত ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাকে সারাভার বিনিয়োগকারীদের বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। তিনি অনেক তথ্য জানতেন না। কিন্তু তিনি রহমানির কাজ সম্পর্কে নিজের ইতিবাচক মত জানান। তার বক্তব্যের সারমর্ম ছিল, ইরানে যদি রহমানির মতো আরও বহু মানুষ থাকত, দেশটি অন্যরকম হতে পারত।
এরপর একে একে অনেক প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় চলে যান। তবে ডিজিকালার মোহাম্মাদি ভাইয়েরা দেশে থেকে যান, যদিও তাদের ভেতরে হতাশা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। সাঈদ মোহাম্মাদি পরে প্রকাশ্যে বলেন, নিজের দেশে সফল হওয়ার যে আত্মবিশ্বাস ইলন মাস্ক বা মার্ক জাকারবার্গের মতো উদ্যোক্তাদের মধ্যে দেখা যায়, তারা সেই অনুভূতি কখনও পাননি।
মে ২০১৯ সালে রহমানি যুক্তরাজ্যে যান, ফিরে আসার উদ্দেশ্য নিয়েই। কিন্তু বিদেশে থাকতেই তিনি জানতে পারেন, একটি সরকারি মন্ত্রণালয় সারাভার একটি পোর্টফোলিও কোম্পানিকে চিঠি দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, রহমানিকে বোর্ড থেকে না সরালে কোম্পানিটি নির্দিষ্ট সরকারি সেবা ব্যবহার করতে পারবে না। তেহরান পৌর সরকারের একটি গোয়েন্দা কর্মকর্তাও পৌরসভার অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে সারাভা ও তার পোর্টফোলিও কোম্পানি থেকে দূরে থাকতে নির্দেশ দেন।
পরবর্তী শেয়ারহোল্ডার বৈঠকে, জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে, রহমানি সারাভার প্রধান নির্বাহী ও বোর্ড সদস্য পদ থেকে সরে দাঁড়ান। তার আশা ছিল, তিনি সরে গেলে অন্তত কোম্পানিগুলো কাজ চালিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু এর মাধ্যমে কার্যত রাষ্ট্রীয় চাপই জয়ী হয়। নতুন বোর্ড ও প্রধান নির্বাহী নির্বাচন করা হয় এমন তালিকা থেকে, যা আগে থেকেই গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে ভাগ করা হয়েছিল। তিন দিন পরে সারাভার এক জ্যেষ্ঠ নির্বাহী একই গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে লিখে জানান, পোর্টফোলিও কোম্পানির বোর্ড সদস্যরাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে যাচাই করা হবে।
আগস্টের মাঝামাঝি রহমানি হাসান রুহানির গোয়েন্দামন্ত্রী মাহমুদ আলাভি, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর গোয়েন্দা শাখার প্রধান হোসেইন তাইয়েব এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সহকারী সোরেনা সাত্তারিকে চিঠি লেখেন। তার মূল প্রশ্ন ছিল, সারাভা বা তিনি এমন কী করেছিলেন যে এত চাপ ও শাস্তির মুখে পড়তে হলো? তিনি দাবি করেন, সারাভা তার পোর্টফোলিও কোম্পানিগুলোকে কর পরিশোধ, স্বচ্ছ হিসাব ও পরিষ্কার নথিপত্র রাখতে উৎসাহিত করেছিল।
কিন্তু ২১ আগস্ট তাইয়েব এক শক্তিশালী রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ ফাউন্ডেশনের প্রধানকে চিঠি লিখে সারাভা ও তার কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তি না করতে বলেন। এতে ডিজিকালাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। চিঠিটি রহমানির হাতে পৌঁছায়। এতে তার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়, তার সব ব্যাখ্যা, আবেদন ও যুক্তি কোনো ফল আনেনি।
২০২০ সালে ডিজিকালার নতুন অর্থের প্রয়োজন হয়। তখন খামেনির নিয়ন্ত্রিত একটি রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ ফাউন্ডেশনের সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত একটি বড় টেলিযোগাযোগ কোম্পানি বিনিয়োগে আগ্রহ দেখায়। ডিজিকালা ও সারাভা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। তারা তেহরান শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার বা অন্য বিনিয়োগকারী আনার চেষ্টা করে। কিন্তু পথ একে একে বন্ধ হতে থাকে। নিয়ন্ত্রক কমিটির বৈঠক কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই বাতিল হয়। যেসব ক্রেতা আগ্রহ দেখায়, এমনকি যাদের নিজেদেরও সরকারি সংযোগ ছিল, তাদেরও নিরাপত্তা বাহিনী সতর্ক করে দূরে সরিয়ে দেয়।
২০২৪ সালের শুরুতে সেই টেলিযোগাযোগ কোম্পানি আবার ডিজিকালার কাছে আসে, এবার সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ার কেনার প্রস্তাব নিয়ে। প্রায় একই সময়ে তেহরানের প্রসিকিউটর ডিজিকালার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ করেন। অভিযোগ ছিল, তারা এমন কিছু মগ বিক্রি করেছে, যা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের অপমান করে। মগগুলোতে ফাতেমেহ ও মরিয়মসহ সাধারণ ইরানি নামসহ কার্টুন আঁকা ছিল, যেগুলো কিছু ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের নামের সঙ্গেও মিলে যায়। অভিযোগটি দুর্বল হলেও একজন ডিজিকালা নির্বাহীকে অল্প সময়ের জন্য কারাগারে নেওয়া হয় এবং অন্যদের পুলিশি বৈঠকে ডাকা হয়।
শেষ পর্যন্ত মোহাম্মাদি ভাইয়েরা বুঝতে পারেন, শেয়ার বিক্রি ছাড়া তাদের সামনে পথ খোলা নেই। সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির ভাষ্যমতে, তারা মনে করেছিলেন বিক্রি না করলে একসময় না একসময়—বড় বিপদ নেমে আসবে। চুক্তিতে ডিজিকালার মূল্য ধরা হয় প্রায় ৫৫ কোটি ডলার। রহমানি ও আলোচনার সঙ্গে পরিচিত আরেক ব্যক্তি মনে করেন, এই মূল্য প্রকৃত মূল্যের তুলনায় অনেক কম ছিল। সব অর্থ পরিশোধের সময়ের মধ্যে ইরানের মুদ্রার মূল্য প্রায় ৩০ শতাংশ পড়ে যায়, ফলে ক্রেতার জন্য চুক্তিটি আরও লাভজনক হয়ে ওঠে।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ ইরানের প্রযুক্তি খাতের একটি বড় শিক্ষা দেয়। নিষেধাজ্ঞা ইরানের উদ্যোক্তাদের জন্য এক ধরনের বাজার সুযোগ তৈরি করেছিল, কারণ বিদেশি প্রতিযোগীরা সেখানে ছিল না। তরুণ উদ্যোক্তারা সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশীয় প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্র সেই উদ্ভাবনকে স্বাধীনভাবে বড় হতে দেয়নি। যখন প্রযুক্তি খাত অর্থ, তথ্য, প্রভাব ও সামাজিক পরিবর্তনের শক্তি হয়ে উঠতে শুরু করল, তখন সেটিকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শুরু হয়।
ইরানের অভিজ্ঞতা দেখায়, প্রযুক্তি খাত শুধু সফটওয়্যার, অনলাইন বাজার বা যাতায়াত সেবা নয়। এটি স্বাধীনতা, তথ্যপ্রবাহ, তরুণদের সামাজিক গতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের কাছে এই শক্তি সুযোগের পাশাপাশি হুমকিও। তাই ইরানে প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়; বরং নিজের রাষ্ট্রের অনিশ্চিত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।
শেষ পর্যন্ত ইরানের প্রযুক্তি গল্প একটি অসমাপ্ত সম্ভাবনার গল্প। এটি দেখায়, সৃজনশীল তরুণ, মেধাবী প্রকৌশলী, ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত বিনিয়োগকারী এবং বড় বাজার থাকলে একটি দেশ নিজের প্রযুক্তি ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখতে দরকার আইনের সুরক্ষা, স্বাধীন ব্যবসা পরিবেশ, ব্যবহারকারীর তথ্যের নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে বেসরকারি উদ্যোগের দূরত্ব। ইরানে সেই জায়গাগুলো দুর্বল ছিল। তাই যে প্রযুক্তি খাত একসময় দেশের নতুন প্রজন্মের আশার প্রতীক ছিল, সেটিই ধীরে ধীরে ভয়, নজরদারি ও দখলের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

