রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছরেরও বেশি সময় পরও সংঘাত থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় হামলা চালিয়ে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরকে আবারও রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে রাশিয়া। মঙ্গলবার (২ জুন) রাতভর চালানো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত ২৩ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও কয়েক ডজন মানুষ।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর ও অবকাঠামো। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আবাসিক এলাকা, যেখানে বহু সাধারণ মানুষ হতাহত হয়েছেন। হামলার ফলে বেশ কয়েকটি ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং বহু পরিবার রাতারাতি আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে।
ইউক্রেনের বিমান বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত রাশিয়া একযোগে ৭৩টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৬৫৬টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। চলমান যুদ্ধে এক রাতে এত বিপুলসংখ্যক ড্রোন ব্যবহারের ঘটনা বিরল।
ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা বাহিনী দাবি করেছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অধিকাংশ হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। তবুও ৫৪টি ড্রোন এবং ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র বিভিন্ন স্থানে আঘাত হানে, যা ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া ক্রমেই বৃহৎ আকারের সমন্বিত হামলার কৌশল ব্যবহার করছে। বিপুলসংখ্যক ড্রোনের সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা যুক্ত করে তারা ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে।
হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর দনিপ্রো। সেখানে একটি চারতলা আবাসিক ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে ভবনটির বড় অংশ ধসে পড়ে।
স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুই শিশুও রয়েছে। এছাড়া আহত হয়েছেন আরও ৪২ জন।
উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রাজধানী কিয়েভও রাশিয়ার হামলা থেকে রেহাই পায়নি। শহরের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো জানিয়েছেন, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া প্রায় ৫০ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।
কিয়েভজুড়ে রাতভর বিমান হামলার সতর্কসংকেত বাজতে থাকে। বিস্ফোরণের শব্দে আতঙ্কিত হয়ে হাজার হাজার মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মেট্রো স্টেশন এবং ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, অনেক পরিবার শিশুদের নিয়ে কম্বল, পানি ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ মেট্রো স্টেশনে আশ্রয় নেয়। রাতের অন্ধকারে একের পর এক বিস্ফোরণ নগরবাসীর মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।
ইউক্রেনের সামরিক কর্মকর্তারা কয়েক দিন ধরেই সতর্ক করে আসছিলেন যে রাশিয়া বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সাম্প্রতিক এই আক্রমণ সেই আশঙ্কাকেই বাস্তবে পরিণত করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে সাম্প্রতিক কিছু চাপের মুখে রাশিয়া আবারও শক্তি প্রদর্শনের কৌশল নিয়েছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনের মনোবল দুর্বল করা এবং অবকাঠামোগত ক্ষতি বাড়ানোও এই হামলার অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে।
অন্যদিকে এই হামলা চলমান শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক মহলের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ বন্ধের যে ক্ষীণ আশা তৈরি হয়েছিল, তা এখন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউক্রেনের লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং অসংখ্য শহর ও গ্রাম ধ্বংস হয়ে গেছে।
সাম্প্রতিক হামলা দেখিয়ে দিয়েছে যে যুদ্ধ এখনো শেষ হওয়ার অনেক দূরে। বরং প্রতিটি নতুন হামলার সঙ্গে বাড়ছে মানবিক বিপর্যয়, ধ্বংস হচ্ছে আরও অবকাঠামো এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবন।
মঙ্গলবার রাতের হামলাও সেই কঠিন বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। যখন কূটনৈতিক অঙ্গনে শান্তির আলোচনা চলছে, তখন যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের গর্জন প্রমাণ করছে যে সংঘাতের সমাধান এখনো অনেক দূরের পথ।

