ভারত তার প্রতিরক্ষা উৎপাদনের অন্যতম সংবেদনশীল ক্ষেত্র ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে আরও বড় ভূমিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মাধ্যমে দেশটি একদিকে যেমন নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে চাইছে, অন্যদিকে বিদেশি অস্ত্রের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমিয়ে সামরিকভাবে আরও স্বনির্ভর হওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে।
ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার তৈরি সব প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রযুক্তি দেশীয় বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের অনুমোদন দিয়েছেন। এখন যোগ্যতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সনদ ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের অধিকার পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করতে পারবে।
এটি ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য বড় ধরনের পরিবর্তন। এতদিন ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়ন ও ব্যাপক উৎপাদনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সরকারি গবেষণাগারের প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। সরকারি মালিকানাধীন ভারত ডায়নামিকস দীর্ঘদিন ধরে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে প্রায় একচেটিয়া অবস্থানে ছিল। নতুন সিদ্ধান্ত সেই কাঠামোকে বদলে দিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বড় পরিসরে যুক্ত করার পথ খুলে দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন ব্যবস্থায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সরবরাহ করবে না, বরং পুরো অস্ত্রব্যবস্থা তৈরি ও সংযোজনের দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ পাবে। ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, শত্রুর রাডার ধ্বংসে ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র, ট্যাংকবিধ্বংসী ব্যবস্থা এবং স্থলভাগে হামলার জন্য ব্যবহৃত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও এর আওতায় আসতে পারে।
ভারতের এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ সামরিক স্বনির্ভরতার আকাঙ্ক্ষা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার দীর্ঘদিন ধরে দেশীয়ভাবে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে আসছে। ভারতীয় নীতিতে এই উদ্যোগকে আত্মনির্ভর ভারত হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদেশি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ভারতে উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
ভারত নিজস্বভাবে তৈরি অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করলেও দেশটি এখনো বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করে। বিশেষ করে রাশিয়া ও ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র সরবরাহকারী। তবে গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়িয়ে পুরোনো নির্ভরতার কাঠামোও বদলানোর চেষ্টা করছে নয়াদিল্লি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চীন ও পাকিস্তানকে ঘিরে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ। ২০২৫ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে চার দিনের সংঘাতের পর ভারতের সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে গুরুত্ব তৈরি হয়। চলতি অর্থবছরে দেশটির প্রতিরক্ষা বাজেট আগের বছরের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৪ সালে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ভারতের প্রতিরক্ষা বাজেট বর্তমানে ৮৬ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন যুদ্ধ থেকে ভারত একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে দেখেছে—আধুনিক যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র দ্রুত ব্যবহার হয়ে যায়। ফলে শুধু উন্নত অস্ত্র থাকা যথেষ্ট নয়, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের জন্য বড় মজুতও প্রয়োজন। শত্রুর নির্ভুল হামলায় অস্ত্রের মজুত ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
চীনের বিষয়টি এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সামরিক পরিকল্পনায় চীনকে সবচেয়ে সক্ষম প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে এমন সংঘাতে ক্ষয়ক্ষতি সামলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো বিপুল অস্ত্রভাণ্ডার তৈরি করতে চাইছে ভারত। এই লক্ষ্য পূরণে শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে চাহিদা মেটানো কঠিন বলে মনে করছে দেশটির নীতিনির্ধারকরা।
ভারতের বেসরকারি প্রতিরক্ষা শিল্প অবশ্য গত কয়েক বছরে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। বিশেষ করে চালকবিহীন বিমান, গোলাবারুদ, মহাকাশ প্রযুক্তি ও সামরিক ইলেকট্রনিকস তৈরিতে বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী বিনিয়োগ করছে। দেশটির চালকবিহীন বিমান শিল্পে ৬০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে। আদানি, টাটা ও লারসেন অ্যান্ড টুব্রোর মতো বড় শিল্পগোষ্ঠীর পাশাপাশি নতুন উদ্যোগও এই খাতে কাজ করছে।
আদানি প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ বিভাগ ২০২৪ সালে উত্তর প্রদেশে গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনে ৩০ বিলিয়ন রুপির বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল। এসব কেন্দ্রে ক্ষেপণাস্ত্র ও নির্ভুল আঘাতকারী অস্ত্রে ব্যবহৃত বিস্ফোরক নিয়েও কাজ করার সক্ষমতা তৈরি করার কথা রয়েছে।
তবে পরিকল্পনা করলেই ভারতের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো রাতারাতি বড় পরিসরে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারবে না। ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল। এর জন্য বিপুল অবকাঠামো, দক্ষ জনবল, উন্নত প্রযুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার প্রয়োজন। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে বড় ক্রয়াদেশ না এলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ভারত একই সঙ্গে নৌবাহিনীকেও দ্রুত আধুনিক করার চেষ্টা করছে। চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে আগামী কয়েক বছরে অন্তত ৭৫টি জাহাজ ও ডুবোজাহাজ সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে নয়াদিল্লি। এর বেশির ভাগই দেশেই নির্মাণের লক্ষ্য রয়েছে।
ক্ষেত্রটি শুধু দেশের প্রতিরক্ষা চাহিদা পূরণেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। ভারত ধীরে ধীরে অস্ত্র রপ্তানির বাজারেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে যেখানে ভারতের সামরিক রপ্তানি ছিল মাত্র ৭২ মিলিয়ন ডলার, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
ভারতের তৈরি ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রও আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিয়েছে। ২০২২ সালে ফিলিপাইন ভারত থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্রের তিনটি ব্যবস্থা কিনেছে। পরে ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়াও ভারতের সঙ্গে এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র কেনার চুক্তি করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতকেও ব্রহ্মোস সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে ভারত।
দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মে মাসে ভারত অগ্নি-৫ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম এই আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার। অন্যদিকে পৃথ্বী-১-এর পাল্লা ১৫০ কিলোমিটার থেকে শুরু করে অগ্নি-৪-এর পাল্লা প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার। রাশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত।
তবে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা ঝুঁকিও রয়েছে। অত্যন্ত সংবেদনশীল সামরিক প্রযুক্তি কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ফাঁস হয়ে গেলে তা প্রতিপক্ষের হাতে পৌঁছানোর আশঙ্কা থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেসরকারি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাইবার হামলা ও তথ্য চুরির ঘটনাও এই ঝুঁকিকে সামনে এনেছে।
ভারত অবশ্য মনে করছে, যেসব প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বড় ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের চুক্তি পাবে, তারা প্রতিরক্ষা খাতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে এবং গোপনীয়তা রক্ষার অভিজ্ঞতাও তাদের রয়েছে। পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি যাতে শত্রু দেশের হাতে না যায়, সে জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক অস্ত্র রপ্তানি নীতিও মেনে চলতে হবে।
তবে ভারতের সামনে আরেকটি বড় বাস্তবতা রয়েছে। দেশটি নিজস্ব প্রতিরক্ষা উৎপাদন বাড়ালেও এখনো বিশ্বের অন্যতম বড় অস্ত্র আমদানিকারক। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ভারত ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক। ওই সময়ে ভারতের আমদানি করা অস্ত্রের ৪০ শতাংশই এসেছে রাশিয়া থেকে।
ফলে বেসরকারি খাতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি হস্তান্তরকে শুধু একটি শিল্পনীতি হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক কৌশল, চীন ও পাকিস্তানকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিকল্পনা, অস্ত্র আমদানি কমানোর চেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্রবাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরির বিষয়গুলো সরাসরি যুক্ত।
সব মিলিয়ে, ভারতের লক্ষ্য শুধু আরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা নয়। বরং সরকারি গবেষণা, বেসরকারি শিল্প, সামরিক চাহিদা এবং রপ্তানি বাজারকে একই কাঠামোর মধ্যে এনে একটি শক্তিশালী দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলা। তবে সেই লক্ষ্য কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে সরকারের ক্রয়াদেশ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে সংবেদনশীল সামরিক প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর।

