বিশ্ব রাজনীতিতে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন পুরোনো ভরসাগুলো নতুন করে যাচাই করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সামনে এখন ঠিক সেই সময় এসে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশ তাদের জাতীয় নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দুতে যুক্তরাষ্ট্রকে রেখেছিল। তাদের ধারণা ছিল, বড় সংকট এলেই ওয়াশিংটন পাশে দাঁড়াবে, সামরিক ছাতা দেবে এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভার আগের মতো বহন করবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নীতি-ভাষ্য সেই নিশ্চয়তার জায়গাটিকে নড়িয়ে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের এখন নিজেদের নিরাপত্তা ভাবনায় বড় পরিবর্তন আনতে হবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র আগের মতো এককভাবে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভার বহন করতে চাইছে না। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রশাসন শুরু থেকেই স্পষ্ট করেছে, ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতি নতুনভাবে সাজানো হবে। এই পরিবর্তনের অর্থ শুধু কূটনৈতিক ভাষার বদল নয়; বরং মিত্রদের জন্য এটি একটি কৌশলগত সতর্কবার্তা।
গত নভেম্বর প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র আর পুরো বিশ্বব্যবস্থাকে আগের মতো কাঁধে নিয়ে চলবে না। এই বার্তা মিত্রদেশগুলোর জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতদিন তাদের অনেকেই নিরাপত্তা ব্যয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক বা ধীর ছিল, আংশিকভাবে এই ধারণা থেকে যে যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত তাদের রক্ষা করবে। কিন্তু এখন ওয়াশিংটনের বক্তব্য অনেক বেশি সরাসরি: মিত্র চাই, নির্ভরশীল রাষ্ট্র নয়।
সিঙ্গাপুরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের এক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ একই ধরনের বার্তা দেন। তার বক্তব্যের মূল কথা ছিল—জোট হবে ভাগ করা দায়িত্বের ভিত্তিতে, একতরফা নির্ভরতার ভিত্তিতে নয়। এই বক্তব্যকে শুধু রাজনৈতিক মন্তব্য হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-দর্শনের একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ওয়াশিংটন এখন মিত্রদের কাছ থেকে বেশি দায়িত্ব, বেশি ব্যয় এবং বেশি সামরিক প্রস্তুতি প্রত্যাশা করছে।
এই প্রত্যাশার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রেরও যুক্তি আছে। বহু বছর ধরে অভিযোগ ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্র অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম হলেও প্রতিরক্ষায় পর্যাপ্ত ব্যয় করে না। তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, জনমত এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সামরিক প্রস্তুতিকে সীমিত রেখেছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় ওয়াশিংটন আর সেই পুরোনো ব্যবস্থা সহজে মেনে নিতে রাজি নয়।
আরেকটি বড় বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রতিশ্রুতি ও সামর্থ্যের মধ্যে ব্যবধান। ইউরোপে রাশিয়া, এশিয়ায় চীন ও উত্তর কোরিয়া, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং পশ্চিম গোলার্ধের নানা নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে একাধিক অঞ্চলে একসঙ্গে মনোযোগ দিতে হয়। যদি একই সময়ে একাধিক বড় সংকট তৈরি হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপর চাপ ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে। এই আশঙ্কা এখন আর কেবল তাত্ত্বিক নয়; আন্তর্জাতিক অস্থিরতা সেটিকে বাস্তব সম্ভাবনায় পরিণত করেছে।
ইরান যুদ্ধ এই সীমাবদ্ধতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে সব সময় প্রয়োজনীয় সামরিক ব্যবস্থা নেই; একই সঙ্গে দ্রুত, সস্তায় এবং বড় পরিসরে সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের শিল্পভিত্তিও সীমাবদ্ধ। এই জায়গায় ইউক্রেন একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের বাস্তবতায় ইউক্রেন ড্রোন উৎপাদন ও ব্যবহারে অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছে। ফলে আধুনিক যুদ্ধের ক্ষেত্রে শুধু বড় বাজেট নয়, দ্রুত উদ্ভাবন, উৎপাদনক্ষমতা এবং মাঠপর্যায়ের অভিযোজনও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত মিত্ররা নিজেদের নিরাপত্তা কৌশল নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেছে। তাদের এ কাজ করা উচিতও। তবে শুধু প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রশ্ন হলো, সেই ব্যয় কীভাবে করা হচ্ছে। মোট দেশজ উৎপাদনের বড় অংশ প্রতিরক্ষায় দেওয়া দরকার হতে পারে, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। ইউরোপ সামরিক সরঞ্জামে অনেক অর্থ ব্যয় করে, তবু সমন্বয়ের অভাবে সামগ্রিক শক্তি প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায় না। আলাদা আলাদা রাষ্ট্রের বিচ্ছিন্ন প্রস্তুতি সবসময় কার্যকর জোটশক্তি তৈরি করতে পারে না।
মধ্যপ্রাচ্যের ইরান-উদ্বিগ্ন আরব রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়। এশিয়ায়ও পুরোনো কাঠামো বদলানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এতদিন যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে এক ধরনের কেন্দ্র-প্রান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল, যেখানে প্রতিটি মিত্র আলাদাভাবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখত। কিন্তু এখন প্রয়োজন আরও জালভিত্তিক পদ্ধতি—যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা নিজেদের মধ্যেও গভীর সহযোগিতা গড়ে তুলবে, একে অন্যের সামরিক সক্ষমতাকে সম্পূরক করবে এবং আগ্রাসন ঠেকাতে সমন্বিত প্রস্তুতি নেবে।
কার্যকর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কোনো সাধারণ স্লোগান নয়। এর জন্য প্রয়োজন অঞ্চলভিত্তিক বাস্তবতা বোঝা। একটি দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, জনবল, সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের সামরিক কৌশল, বাহ্যিক সহায়তার সম্ভাবনা এবং সামরিক প্রযুক্তির ধরন—সব বিবেচনায় নিয়ে নিরাপত্তা কাঠামো সাজাতে হয়। একই ধরনের অস্ত্র কিনলেই জোট শক্তিশালী হয় না। বরং কে কোন দায়িত্ব নেবে, কোন বাহিনী কোথায় ব্যবহৃত হবে, কার প্রযুক্তি কার ঘাটতি পূরণ করবে—এসব প্রশ্নের বাস্তব উত্তর দরকার।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা জরুরি: আত্মনির্ভরতা প্রয়োজন, কিন্তু সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অধিকাংশ দেশের জন্য বাস্তবসম্মত নয়। কোনো একক রাষ্ট্র আজকের জটিল নিরাপত্তা পরিবেশে সব ধরনের সামরিক, প্রযুক্তিগত ও গোয়েন্দা সক্ষমতা একা তৈরি করতে পারে না। তাই নতুন ও গভীর অংশীদারিত্বই বাস্তব পথ। এই অংশীদারিত্ব শুধু অস্ত্র কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এতে থাকতে পারে গোলাবারুদ উৎপাদন, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ সামরিক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনে সমন্বিত অভিযান।
আঞ্চলিক অংশীদারিত্বের উদাহরণও স্পষ্ট। পূর্ব এশিয়ায় জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ইউরোপে রাশিয়াকে ঘিরে উদ্বিগ্ন দেশগুলো নিজেদের মধ্যে প্রতিরক্ষা সমন্বয় বাড়াতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ভীত দেশগুলো সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতাকে আরও কার্যকর করতে পারে। তবে অংশীদারিত্ব শুধু প্রতিবেশী দেশের মধ্যেই সীমিত থাকবে এমন নয়। সৌদি আরব ইউক্রেনের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক তৈরি করছে, বিশেষত ড্রোন উৎপাদন ও ব্যবহারের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে। দক্ষিণ কোরিয়া পোল্যান্ডে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে বিনিয়োগ করছে। এগুলো দেখায়, আধুনিক নিরাপত্তা সহযোগিতা ক্রমেই অঞ্চলসীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার প্রশ্ন এখানে নেই। বরং প্রয়োজন সম্পর্ককে নতুনভাবে সাজানো। মিত্রদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক, প্রযুক্তিগত ও কূটনৈতিক শক্তি। কিন্তু সেই সম্পর্ক আগের মতো একতরফা নির্ভরতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। কাজের ভাগাভাগি, দায়িত্বের পুনর্বিন্যাস এবং কমান্ড কাঠামোয় অংশীদারদের বেশি মতামত—এসব বিষয় এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
কূটনৈতিক দিকটিও উপেক্ষা করা যাবে না। সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা অবশ্যই দরকার। এশিয়ায় চীন বা উত্তর কোরিয়া, ইউরোপে রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান—প্রতিটি ক্ষেত্রেই কূটনীতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুর্বল অবস্থান থেকে আপস করার চেষ্টা বিপজ্জনক হতে পারে। কার্যকর কূটনীতি তখনই বেশি ফলপ্রসূ হয়, যখন তার পেছনে থাকে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধক্ষমতা। সামরিক ভারসাম্য ছাড়া কেবল সমঝোতার আশা অনেক সময় প্রতিপক্ষকে আরও সাহসী করে তুলতে পারে।
এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সামনে মূল প্রশ্ন হলো—তারা কি পুরোনো নিরাপত্তা ধারণা আঁকড়ে থাকবে, নাকি নতুন বিশ্ব বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেবে? যুক্তরাষ্ট্রকে আগের মতো নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা-অভিভাবক হিসেবে ধরে নেওয়া এখন ঝুঁকিপূর্ণ। তাই মিত্রদেশগুলোর উচিত নিজেদের সামরিক প্রস্তুতি বাড়ানো, আঞ্চলিক ও আন্তঃআঞ্চলিক অংশীদারিত্ব গভীর করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন ভিত্তিতে দাঁড় করানো।
শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত যেকোনো মূল্যে স্থিতিশীলতা নয়; বরং এমন স্থিতিশীলতা, যা জাতীয় স্বার্থ ও পশ্চিমা নিরাপত্তা-স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব নয়। কিন্তু তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুদের নতুন বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে। শুধু ওয়াশিংটনের দিকে তাকিয়ে থাকা যথেষ্ট নয়। এখন সময় নিজেদের দায়িত্ব নেওয়ার, একে অন্যের সঙ্গে জোট গড়ার এবং নিরাপত্তাকে যৌথ সক্ষমতার ওপর দাঁড় করানোর।

