একটি শহর, যা কখনও থেমে থাকবে না। থাকবে না কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা। আজ হয়তো প্রশান্ত মহাসাগরে, কয়েক মাস পর আটলান্টিকের বুকে। সেখানে মানুষ বাস করবে, সন্তানদের স্কুলে পাঠাবে, অফিস করবে, হাসপাতালে চিকিৎসা নেবে, খেলাধুলা করবে—সবকিছুই সমুদ্রের ওপর ভাসতে ভাসতে।
শুনতে যেন বিজ্ঞান কল্পকাহিনির গল্প মনে হলেও, এমনই এক বিশাল প্রকল্প নিয়ে আবারও আলোচনায় এসেছে ‘ফ্রিডম শিপ’ বা স্বাধীনতা জাহাজ প্রকল্প। প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা করা এই প্রকল্পকে বিশ্বের প্রথম প্রকৃত ভাসমান শহর হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তিন দশকের পুরোনো স্বপ্ন
এই ধারণার জন্ম নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে। প্রকৌশলী নরম্যান নিক্সন প্রথম এমন একটি ভাসমান নগরীর স্বপ্ন তুলে ধরেন, যেখানে মানুষ স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারবে। পরে প্রকল্পটি নানা কারণে থেমে গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে এটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বর্তমানে প্রকল্পটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন রজার গুচ। তার বিশ্বাস, পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব।
তার মতে, প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ থাকলেও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো অর্থায়ন। প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ পাওয়া গেলে নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব।

একটি জাহাজ নয়, পুরো একটি শহর
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এটি হবে পৃথিবীর ইতিহাসে নির্মিত সবচেয়ে বড় সমুদ্রযানগুলোর একটি।
জাহাজটির দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ১ দশমিক ৮ কিলোমিটার, যা বর্তমান বিশ্বের বৃহত্তম প্রমোদতরীগুলোর তুলনায় কয়েক গুণ বড়। প্রস্থ হবে প্রায় ২৫০ মিটার এবং উচ্চতা হবে ২৫ তলা ভবনের সমান।
এর ধারণক্ষমতাও বিস্ময়কর।
প্রায় ৫০ হাজার মানুষ সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারবেন। তাদের সেবা দিতে থাকবে ২০ হাজার কর্মী। পাশাপাশি আরও ১০ হাজার অতিথির থাকার ব্যবস্থাও থাকবে।
অর্থাৎ ছোট একটি শহরের সমপরিমাণ মানুষ একসঙ্গে বসবাস করতে পারবে এই ভাসমান নগরীতে।
থাকবে স্কুল, হাসপাতাল ও কর্মসংস্থানের সুযোগ
এই শহরকে শুধু বসবাসের জায়গা হিসেবে নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এখানে থাকবে—
- আবাসিক এলাকা
- স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
- ব্যাংক
- অফিস ও ব্যবসা কেন্দ্র
- আধুনিক গবেষণা হাসপাতাল
- শপিং এলাকা
- জাদুঘর
- সাংস্কৃতিক কেন্দ্র
পরিকল্পনাকারীদের লক্ষ্য এমন একটি স্বনির্ভর পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মানুষ বছরের পর বছর স্থলভাগে না ফিরেও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে।
জাহাজের ওপরই বিমানবন্দর
এই প্রকল্পের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো এর নিজস্ব বিমান চলাচল ব্যবস্থা।
জাহাজের ছাদে থাকবে একটি রানওয়ে, যেখানে ছোট আকারের উড়োজাহাজ ওঠানামা করতে পারবে। পাশাপাশি থাকবে আটটি হেলিকপ্টার অবতরণ কেন্দ্র।
অর্থাৎ সমুদ্রের মাঝখানে থেকেও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা সম্ভব হবে।
স্টেডিয়াম, পার্ক ও বিনোদনের বিশাল আয়োজন
শুধু বাসস্থান নয়, বিনোদনের জন্যও থাকছে বিশাল আয়োজন।
পরিকল্পনায় রয়েছে ১৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার একটি স্টেডিয়াম, সম্মেলন কেন্দ্র, বিশাল কেনাকাটার এলাকা, সাংস্কৃতিক মিলনায়তন, বহু রেস্তোরাঁ এবং কয়েক একরজুড়ে পরিবেশবান্ধব পার্ক।
এছাড়া জাহাজের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দ্রুত যাতায়াতের জন্য অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থাও থাকবে।

পুরো পৃথিবী ঘুরে বেড়াবে শহরটি
সাধারণ প্রমোদতরীর মতো নির্দিষ্ট রুটে চলবে না এই ভাসমান নগরী।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এটি অবিরাম সমুদ্রযাত্রা করবে এবং প্রতি দুই থেকে তিন বছরে একবার পুরো পৃথিবী প্রদক্ষিণ সম্পন্ন করবে।
বেশিরভাগ সময়ই এটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থান করবে। ফলে কোনো একক দেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকেই পরিচালিত হবে শহরটি।
সামনে যেসব বড় চ্যালেঞ্জ
তবে স্বপ্ন যত বড়, চ্যালেঞ্জও তত বিশাল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় একটি জাহাজ চালাতে বিপুল পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হবে। দীর্ঘমেয়াদে সেই শক্তি সরবরাহের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উপায় হতে পারে পারমাণবিক প্রযুক্তিনির্ভর চালিকাশক্তি।
এ ছাড়া আরেকটি বড় সমস্যা হলো এর বিশাল আকার।
পৃথিবীর বর্তমান কোনো সমুদ্রবন্দরই এত বড় জাহাজকে গ্রহণ করতে পারবে না। ফলে এটিকে উপকূল থেকে দূরে নোঙর করে রাখতে হবে। যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের জন্য আলাদা দ্রুতগতির নৌযান ব্যবহার করতে হবে।
স্বপ্ন নাকি ভবিষ্যতের বাস্তবতা?
গত কয়েক দশক ধরে ‘ফ্রিডম শিপ’ প্রকল্প মানুষের কল্পনাকে নাড়া দিয়ে আসছে। কেউ একে ভবিষ্যতের নগরায়ণের নতুন দিগন্ত হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ বলে মনে করছেন।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—যদি প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি শুধু একটি জাহাজ নির্মাণ নয়; বরং মানুষের বসবাস, কর্মসংস্থান ও নগরজীবনের ধারণাকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে।
সমুদ্রের বুকে ভাসমান এই শহর হয়তো আগামী দিনের পৃথিবীকে দেখাবে, নগর সভ্যতার পরবর্তী অধ্যায় কেমন হতে পারে।

